default-image

২০১৬ সালের মার্চের বিকেল। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) অনিকেত প্রান্তরে বসে আছি আমরা কয়েকজন। অনিকেত প্রান্তর হলো খুবির বিস্তর এক প্রান্তর। যে মাঠে বিকেল নামে আর জমে উঠতে শুরু করে গল্প, গান আর আড্ডা। তো এ রকমই এক মার্চের বিকেলে চায়ের কাপের ঝড় মৃদু থেকে তখন ক্রমে গাঢ় হচ্ছে। হঠাৎ মাঠের ভেতরে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কালো রঙের স্তম্ভটা দেখিয়ে এক বড় ভাই বললেন, ‘জানিস, এগুলো কত বড় ইতিহাসের সাক্ষী!’ 

সেদিন প্রথম জেনেছিলাম, আমরা যে অনিকেত প্রান্তরের স্তম্ভগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিই, সেটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বড় এক ইতিহাসের সাক্ষী। আর যে ক্যাম্পাসে আমরা পড়াশোনা করি, তার পুরোটাই ঘিরে আছে এক বধ্যভূমির স্মৃতি। বর্তমানে ক্যাম্পাসের দ্বিতল শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভবন, যেটি পুরোনো প্রশাসনিক ভবন নামে পরিচিত, এই ভবনটি থেকে চালানো হতো তৎকালীন বেতার কার্যক্রম। যুদ্ধকালীন এই রেডিও স্টেশন ছিল একটি নির্যাতন ও গণহত্যা কেন্দ্র। সেই বিকেলের পর থেকে যখনই প্রশাসনিক ভবনটির দিকে তাকাই, যখন অনিকেত প্রান্তরে বসি আড্ডা দিতে, তখনই ক্যাম্পাসের ইতিহাস আরও গভীরভাবে জানার ইচ্ছাটা তীব্র হয়।

ইতিহাসের খোঁজে
বেশ কয়েক দিন পর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বইয়ের পাতা ওলটাতে গিয়ে খুঁজে পাই সেই রেডিও স্টেশনের গল্প। সেখান থেকে জানতে পারি, এই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো প্রশাসনিক ভবনটি ছিল তখন ১৮ কক্ষবিশিষ্ট একটি একতলা ভবন এবং অনিকেত প্রান্তরজুড়ে ছিল বিশাল এক রেডিও টাওয়ার। 

এটুকু জেনে মন শান্তি পাচ্ছিল না। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক পুরোনো একজন মানুষ, সবার প্রিয় তপনদা। তাঁর সাহায্য নিয়ে খুঁজে বের করলাম অজেদা বেগমকে। যিনি প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা আবদুল সাত্তার সিকদারের স্ত্রী। এই বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল সাত্তার ছিলেন সাহসী সেই মুক্তিবাহিনীর একজন, যাঁদের একটি দলের সহায়তায় হানাদার বাহিনীমুক্ত হয়েছিল এই রেডিও স্টেশনটি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার তিন মাস আগে অজেদা বেগমের সঙ্গে বিয়ে হয় আবদুল সাত্তারের। অজেদা বেগম বলেন, তাঁর স্বামী যখন তাঁকে বিয়ে করে আনেন, তখন এই গল্লামারী ছিল এক বিরানভূমি। আজ যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক, ঠিক তার সামনে দিয়ে ছিল একটি বড় খাল। সেই খাল দিয়ে প্রতিনিয়ত যাতায়াত করত হানাদার বাহিনীর গানবোটগুলো। অজেদা বেগমই জানালেন, যুদ্ধের সময় এই খালে ভেসে ছিল অজস্র লাশ। রেডিও স্টেশনটি ছিল পুরোপুরি একটি নির্যাতন কেন্দ্র। যেখানে দিনের বেলায় অনেক নিরীহ মানুষ নিয়ে আসা হতো। আর রাত হলে তাঁদের নির্মমভাবে হত্যা করা হতো। এই নিরীহ মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছিল। সংখ্যাটি একসময়ে এতই বেড়ে গিয়েছিল যে, তখন আর কাউকে আলাদা করে হত্যার সময় ছিল না। হানাদার বাহিনী তখন সার বেঁধে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করত। 

অজেদা বেগমের কথা শুনে শিউরে উঠছিলাম। তিনিই জানালেন, তাঁর স্বামী আবদুল সাত্তারের বাহিনী যখন রেডিও স্টেশনটি মুক্ত করেন, তখন এর ভেতর থেকে পাঁচজন নারীকে উদ্ধার করা হয়। খুঁজে পাওয়া যায় বহু মৃতদেহ। যাঁদের অবস্থা এতই খারাপ ছিল যে শুধু মাথার চুল দেখে বুঝতে হয়েছিল, কে ছেলে আর কে মেয়ে। 

ভয়াবহতার স্মৃতি
যুদ্ধের সময়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের আরও গভীরে যেতে ছুটে যাই গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা কেন্দ্রে। সেখানে খুঁজে পাই অমল কুমার বাইনের লেখা গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ: খুলনা জেলা শিরোনামের বইটি। বইতে তৎকালীন বেতার কেন্দ্রের ঘোষক হামিদুর রহমানের উক্তিটি ছিল এমন, ‘তখন বেতার কেন্দ্রে চাকরি করতে হতো মিলিটারি বেষ্টনীর ভেতর দিয়ে। দূরদূরান্ত থেকে লোকজন এনে পুলিশ ব্যারাকে রাখা হতো। তারপর সন্ধ্যা হলে সেই নিরীহ লোকগুলোকে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করা হতো। কিছুদিন পরে ফায়ারের পরিবর্তে জবাই করা হতো তাঁদের। সেই সময়ে কিছু বাঙালি রাজাকার এই দায়িত্ব নেয়।’ 

যুদ্ধের শুরুতেও এপ্রিলের দিকে মুক্তিবাহিনী চেষ্টা করেছিল রেডিও সেন্টারটিকে শত্রুমুক্ত করার। মুজিব বাহিনীর প্রধান শেখ কামরুজ্জামান জানান, তাঁরা এপ্রিলের ২ তারিখে একবার রেডিও স্টেশনে হামলা চালিয়েছিলেন। রাতভর যুদ্ধ হয়েছে। নিহতও হয় বেশ কয়েকজন। কিন্তু হানাদার বাহিনীর আরও একটি দল যশোর থেকে এসে যুক্ত হয়। তাই আমাদের পিছু হটতে হয়েছিল তখন। মুক্তিযোদ্ধা আবদুল সাত্তারের স্ত্রী অজেদা বেগমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী নভেম্বরের শুরুর দিকে শত্রুমুক্ত হয় রেডিও স্টেশনটি। 

মুক্তিযুদ্ধের এই করুণ ইতিহাসের সাক্ষী আমাদের এই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থী হিসেবে এসব ইতিহাস জানা তো আমাদেরই দায়িত্ব।

উজ্জ্বল সাহা
শিক্ষার্থী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়  

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0