উপাচার্যের দ্বিতীয় মেয়াদে নিয়োগ কি অনিবার্য

বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা রকম অস্থিরতা চলছে, যেগুলোতে উপাচার্যরা দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছেন। এই প্রেক্ষাপটে সেই পুরোনো প্রশ্নই ফিরে আসে—একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন উপাচার্যকে দ্বিতীয় মেয়াদে নিয়োগ দিতে হবে কেন?

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য একটি সম্মানজনক পদ। স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন এমনভাবে তৈরি যে উপাচার্যই হয়ে ওঠেন সর্বেসর্বা। আইন বা বিধিতে উপাচার্যের ক্ষমতা ভারসাম্যপূর্ণ রাখা হলেও গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত উপাচার্য নিজের দিকে টেনে নিতে পারেন। এমন অনেক উপাচার্যকে আমরা চিনি, যাঁরা ডিন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, বিভিন্ন কমিটির প্রধানসহ ১৫ থেকে ২০টি দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। এমন ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে যখন দ্বিতীয় দফায় নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন তাঁকে ঠেকায় কে? অবশ্য তখন তাঁর নিজ দলের শিক্ষকেরাই হয়ে ওঠেন প্রতিপক্ষ।

বিজ্ঞাপন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আবদুস সোবহান দ্বিতীয় মেয়াদে নিয়োগ পেয়ে যাচ্ছেতাই শুরু করলেন। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি উপাচার্য ছিলেন। ২০১৭ সালে এসে সরকার আবার তাঁকে উপাচার্য পদে নিয়োগ দেয়। তারপর স্বজনপ্রীতিসহ তিনি যা করছেন, তাতে কান বন্ধ রাখতে হয়। সেখানে উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছেন মমতাজউদদীন আহমদ, এম শামস-উল-হক, খান সারওয়ার মুরশিদ, মযহারুল ইসলাম, সৈয়দ আলী আহসান, মুহাম্মদ আবদুল বারীর মতো শিক্ষাবিদেরা। তাঁদেরও কিন্তু দ্বিতীয় দফায় উপাচার্য করা হয়নি বা তাঁরা তা চাননি। প্রশ্ন হচ্ছে অভিযোগ নিয়ে প্রথম মেয়াদ পার করা একজন উপাচার্যকে দ্বিতীয় দফায় নিয়োগ করা হলো কেন? ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে শত শত অধ্যাপকের মধ্যে উপাচার্য হওয়ার মতো যোগ্য কেউ কি ছিলেন না?

এবার দেখা যাক খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা, সেখানেও আছেন দ্বিতীয় মেয়াদের উপাচার্য। তাঁর বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ অনেক দিনের, শিক্ষকদের হয়রানি করাসহ নানা রকম অভিযোগ রয়েছে। তিনি ২০১০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে সহ–উপাচার্য হিসেবে যোগ দেন, তারপর উপাচার্য হন, এই পদে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদও শেষ হওয়ার পথে। ইতিমধ্যে তাঁর বিপক্ষে শিক্ষক-ছাত্রদের বড় অংশ অবস্থান নিয়েছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন উপাচার্য হওয়ার মতো অধ্যাপক পাওয়া যায়নি, আবার খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে উপাচার্য হওয়ার মতো অধ্যাপক নেই। যদিও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এখনকার উপাচার্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েরই একজন অধ্যাপক। গত ৩০ বছরে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় কি উপাচার্য হওয়ার যোগ্য অধ্যাপক তৈরি করতে পারেনি?

রাজশাহী ও খুলনা ছাড়াও জাহাঙ্গীরনগর, জাতীয়, উন্মুক্ত, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তিসহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যরা দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রশ্ন ওঠে, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হওয়ার মতো অধ্যাপক ওই বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কি নেই?

দ্বিতীয় মেয়াদে উপাচার্য হওয়ার যোগ্যতা কী? এই প্রশ্নের দুটি জবাব হতে পারে। এক. উপাচার্য পদের জন্য তাঁর চেয়ে যোগ্য অধ্যাপক আর নেই; দুই. জোর তদবির করে টিকে থাকার ক্ষমতা আছে। এখানে দ্বিতীয় বিষয়টি সত্য; সরকারের প্রতি আনুগত্য ও যোগাযোগটাই এমন নিয়োগে মুখ্য।

প্রথম মেয়াদের পর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জনপ্রিয় শিক্ষকদের অন্যভাবে বিদায় নেওয়ার দৃষ্টান্ত আছে। সে ক্ষেত্রে কাজের চেয়ে নিজ দল সমর্থক শিক্ষকদের বিরোধই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এর অন্যতম দৃষ্টান্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। িতনি ২০০৯ থেকে টানা ২০১৭ সাল পর্যন্ত উপাচার্য ছিলেন। প্রথম মেয়াদে তিনি সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করেন, দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার–সমর্থক প্রভাবশালী শিক্ষকদের তোপের মুখে পড়েন এবং সেই জটিল পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন উপাচার্যের বড় কাজ হয়ে পড়ে সরকার–সমর্থক শিক্ষকদের চাপ সামাল দেওয়া। কারণ সরকার–সমর্থকদের প্রত্যাশা থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে নিয়োগ লাভ করা। একজন উপাচার্য নিজের পদ ছাড়াও ওই সব পদে সাধারণত নিজের পছন্দের শিক্ষককে নিয়োগ দেন। ফলে উপাচার্যকে সরাতে পারলেই অন্য পদে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ ও সম্ভাবনা থাকে।

যদিও উপাচার্য কে হবেন, সে সিদ্ধান্ত সাধারণত আসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাইরে থেকে। প্রায় ১৫০টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে তিনজন করে ধরলে উপাচার্য, সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ পদে ৪৫০ জন অধ্যাপক দরকার, যাঁদের নিয়োগ অনুমোদন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য বা রাষ্ট্রপতি। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে এত যোগ্য অধ্যাপক দেশে নেই, আবার এমন কোনো তালিকা মন্ত্রণালয় সংরক্ষণও করে না। মন্ত্রণালয়ের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে উপাচার্য পদে যোগ্য অধ্যাপক খুঁজে পাওয়ার প্রক্রিয়া বা পদ্ধতিও সেই অর্থে নেই। তা ছাড়া এসব পদে নিয়োগ দেওয়ার আগে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা খুঁজতে হয় বলে বিরোধী দলের সমর্থক বা নিরপেক্ষ অধ্যাপকদের মধ্যে যাঁরা যোগ্য, তাঁরা আগেভাগেই বাদ পড়েন।

বিজ্ঞাপন

প্রচলিত নিয়মে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার এখতিয়ার আচার্য তথা রাষ্ট্রপতির। তবে রাষ্ট্রপতি এককভাবে এ নিয়োগ দেন না। বিভিন্ন মাধ্যমে আসা নাম শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রস্তাব আকারে নথি তৈরি করে। এটা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে যায়। উপাচার্য পদে কে নিয়োগ পাচ্ছেন, তা অনেকাংশে নির্ভর করে প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায়ের ওপর। প্রধানমন্ত্রী যে অধ্যাপককে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করছেন, তাঁর উপাচার্য হওয়ার বা একাডেমিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা আছে কি না, এটি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সব সময় জানা সম্ভব হয় না। তাঁকে নির্ভর করতে হয় অন্যদের ওপর।

তবে এটা সত্য যে বিদ্বান লোক অনেক সময় ভালো প্রশাসক না-ও হতে পারেন। তাই মেধাবী হলে বা পিএইচডি থাকলেই একজন ব্যক্তি উপাচার্য হিসেবে ভালো করবেন, এমনটি নয়। আবার উপাচার্য যিনি হবেন, তাঁর একাডেমিক যোগ্যতাও থাকতে হবে। নেতৃত্ব ও একাডেমিক যোগ্যতা—এ দুইয়ের যোগসূত্র সবার আগে দেখা উচিত। কিন্তু এখন সবার আগে দেখা হয় নানা রঙের আড়ালে রাজনৈতিক আনুগত্য এবং সেটি অনেক বেশি থাকলে দ্বিতীয় মেয়াদেও নিয়োগ মেলে।

নব্বইয়ের পর থেকে উপাচার্য নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় দেখার রেওয়াজ ক্রমেই বেড়েছে। এখন সরকারের অন্ধ সমর্থক খোঁজা হয়। ফলে শিক্ষকদের বড় অংশ যতটা না শিক্ষা কার্যক্রম ও গবেষণায় ব্যস্ত, তার চেয়ে বেশি মনোযোগী উপাচার্য থেকে নিচের দিকে হাউস টিউটরের দায়িত্ব পাওয়ার জন্য। অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতায় তাঁরা নিশ্চিত হয়েছেন, সরকারের সঙ্গে না থাকলে এসব পদে নিয়োগ জুটবে না। তাই সবার আগে দলীয় আনুগত্য থাকতেই হবে। এটাই যেহেতু প্রথম শর্ত, সেহেতু মেধা ও নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা কম থাকলেও চলে যায়। আর তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাভ-ক্ষতি কতটা, সেটি দেখার সময় ও সুযোগ মনে হয় কারও নেই।


শরিফুজ্জামান সাংবাদিক

pintu.dhaka@gmail. com

মন্তব্য পড়ুন 0