করোনাকালে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার অর্থনীতিকে সচল রাখবে

বিজ্ঞাপন
default-image

৪ আগস্ট ‘কোভিড-১৯ মোকাবিলায় প্রযুক্তি ও ডিজিটাল বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটি অনলাইনে একটি সেমিনার (ওয়েবিনার) অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেমিনারের লক্ষ্য ছিল করোনাকালে উন্নততর তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ও অনলাইন সেবা বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতিকে সচল রাখা। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রথম আলোর যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এই ওয়েবিনারে অংশ নেন শিক্ষক, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও দেশের তরুণ উদ্যোক্তারা। আলোচনা অনুষ্ঠানটিনর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রথম আলোর ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান ড. রেজাউল বারীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সেন্টার ফর ইনফ্রাস্ট্রাকচার রিসার্চ অ্যান্ড সার্ভিসেসের পরিচালক অধ্যাপক মো. সিরাজুল ইসলাম, এসবিকে টেক ভেঞ্চারস অ্যান্ড এসবিকে ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সোনিয়া বশির কবীর, চালডাল ডটকমের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও)জিয়া আশরাফ, ইন্সপায়ারিং বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ইমরান ফাহাদ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসের (বেসিস) সহসভাপতি মুশফিকুর রহমান, দি সিটি ব্যাংক লিমিটেডের হেড অব আইটি মো. আনিসুর রহমান এবং প্রথম আলোর যুব কার্যক্রম ও ইভেন্ট প্রধান মুনির হাসান।

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আতিকুল ইসলাম, ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান এম এ কাশেম। বিশ্ববিদ্যালয়টির স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ফিজিক্যাল সায়েন্সের ডিন ড. জাভেদ বারীর সমাপনী বক্তব্যের মাধ্যমে সেমিনারটি শেষ হয়। এই ওয়েবিনারে বক্তাদের দেওয়া বক্তব্যের নির্বাচিত অংশ  তুলে ধরা হলো।

প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ঘরে বসে অনেক কাজ করা সম্ভব

অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলাম

পরিচালক, সেন্টার ফর

ইনফ্রাস্ট্রাকচার রিসার্চ অ্যান্ড সার্ভিসেস

স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জার পরই করোনাভাইরাস একটি বড় বৈশ্বিক মহামারি। সেই সময় ঘরে বসে হয়তো সব কাজ করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু আমরা যখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছি, তখন প্রযুক্তির কল্যাণে ঘরে বসেই অনেক কাজ করা সম্ভব—শিক্ষা, সরকারি কাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য, কেনাকাটা, ব্যাংকিং। প্রযুক্তির এই ব্যবহার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে, সময় সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। বর্তমান সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ধারণাটিও তাই বলে।  তবে প্রযুক্তির নতুন এই ধারণাগুলোকে আরও টেকসই ও সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। যেমন অনলাইন পাঠদানকে আরও সহজলভ্য এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করতে হবে।  সরকারের প্রতি আহ্বান থাকবে, এই তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে যেন এখনই প্রণোদনার আওতায় নিয়ে আসা হয়। ফলে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও প্রসারিত হবে এবং দুর্যোগের এই সময়েও আমাদের অর্থনীতি চাঙা থাকবে।

পাঁচ মাসে প্রায় ৯০০ নতুন কর্মী নিয়োগ দিয়েছি

জিয়া আশরাফ

প্রতিষ্ঠাতা ও সিওও, চালডাল ডটকম

এনএসইউয়ের প্রাক্তন ছাত্র

লকডাউনের শুরুতে অনেকে কর্মহীন হয়ে গ্রামে ফিরে গিয়েছিলেন। আমরা তখনই অনলাইনে তাঁদের প্রশিক্ষণমূলক বিভিন্ন ধরনের ক্লাস নেওয়া শুরু করি। এরপর অনলাইনে সাক্ষাৎকার নিয়ে তাঁদের আবারও কাজে ফিরিয়ে আনি। গত পাঁচ মাসে আমরা প্রায় ৯০০ নতুন কর্মী নিয়োগ দিয়েছি এবং নতুন ৪টি ওয়্যারহাউস (গুদাম) তৈরি করেছি। কেননা, করোনাকালে আমাদের অর্ডার আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। আগে প্রতিদিন আমরা হাজার দুয়েক অর্ডার পেতাম। কিন্তু বর্তমানে আমরা প্রতিদিন পাঁচ হাজারের বেশি অর্ডার পাচ্ছি। দুর্যোগের এই মুহূর্তে দেশের বিভিন্ন খাত স্থবির হয়ে পড়লেও চালডালসহ অনলাইনভিত্তিক নানা উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। কারণ, এখন মানুষের ঘরে বসে সেবা পাওয়ার চাহিদা বাড়ছে।

প্রযুক্তি দিয়ে করোনা-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব
সোনিয়া বশির কবীর, প্রতিষ্ঠাতা, এসবিকে টেক ভেঞ্চারস অ্যান্ড এসবিকে ফাউন্ডেশন

করোনাকালে দেশের প্রতিটি খাতে ডিজিটাল রূপান্তর ঘটছে। আমরা কখনোই ভাবিনি যে আমাদের দেশেও অনলাইনে পাঠদান সম্ভব হবে। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে ঘরে বসেই আমরা চিকিৎসাসেবা নিচ্ছি। সরকারি-বেসরকারি খাতগুলো অনলাইন ব্যাংকিং ব্যবহারের প্রতি জোর দিচ্ছে। ডিজিটাল রূপান্তর মানে শুধু কোনো একটা প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় করে দেওয়া নয়, বরং এর পাশাপাশি প্রযুক্তি ব্যবহার করে সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাও থাকতে হয়। আমাদের দেশ এখন প্রযুক্তির মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো সমাধান করতে সক্ষম বলে আমি মনে করি। করোনা-পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ থাকবেই, তবে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে এখনো প্রযুক্তি ব্যবহারে ঘাটতি রয়েছে
মুশফিকুর রহমান, সহসভাপতি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস

করোনা মহামারির কারণে মাসখানেক আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকটা বন্ধ ছিল। এ সময় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের ছোট ও মাঝারি শিল্প খাত। তবে বর্তমানে আস্তে আস্তে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটেছে। ধারণা করা যাচ্ছে, অক্টোবরের পর থেকে হয়তো বিশ্ববাজার অনেকটা খুলে যাবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের ছোট ও মাঝারি শিল্প খাতগুলো যেন একেবারে বসে না যায়, সে জন্য বেসিস সরকারি-বেসরকারি মহলের সঙ্গে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে আমরা সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছি। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমেও আমরা সংকট থেকে উত্তরণের চেষ্টা করছি। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এখনো প্রযুক্তি ব্যবহারে ঘাটতি রয়েছে। সমস্যা সমাধানে আসলে প্রতিটি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা খাত ও কর্মক্ষেত্রকে একত্র হয়ে কাজ করতে হবে, যেন আমরা ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ জনশক্তি পাই।

বিদেশি তথ্যভান্ডারে আমাদের প্রবেশের সুযোগ নেই
ইমরান ফাহাদ, প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইন্সপায়ারিং বাংলাদেশ লিমিটেড

আমাদের দেশের মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকটা সময় কাটায়। কিন্তু আমাদের সবার ডেটা ও ইনফরমেশন অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে সংরক্ষিত থাকে। এই তথ্যভান্ডারে আমাদের প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। মূলত বিষয়টি সামনে রেখেই ইন্সপায়ারিং বাংলাদেশ নামের একটি সোশ্যাল কনটেন্ট নেটওয়ার্ক তৈরি করি, যেন আমাদের নিজেদের ডেটাগুলো আমাদের দেশে সংরক্ষিত থাকে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে আমাদের জন্য অনুপ্রেরণামূলক প্রচুর ঘটনা রয়েছে। আমরা এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এই ঘটনাগুলোকে সামনে নিয়ে আসতে চাই।

এখন আমাদের ব্যাংকের ডিজিটাল সেবা নিচ্ছেন ৬৮ শতাংশ গ্রাহক
মো. আনিসুর রহমান, হেড অব আইটি, দি সিটি ব্যাংক লিমিটেড

করোনা সংক্রমণের আগে আমাদের মাত্র ১৬ শতাংশ গ্রাহক ডিজিটাল চ্যানেলগুলো ব্যবহার করে ব্যাংকিং সুবিধা গ্রহণ করতেন। কিন্তু বর্তমানে ডিজিটাল চ্যানেল ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়ে ৬৮ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ করোনাকালে মানুষের মধ্যে প্রযুক্তি ব্যবহারের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু এখনো ৩২ শতাংশ মানুষ সরাসরি শাখাকেন্দ্রিক সেবা নিতে ইচ্ছুক। এই ধরনের ব্যবহারকারীদেরও অনলাইনের আওতায় আনতে আমরা প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছি। আমরা ইতিমধ্যেই ক্রেডিট লিমিট বাড়িয়েছি, ন্যানো লোন প্রদান করেছি, রিমোট ওয়ার্কিং সুবিধাসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছি। এ ছাড়া আরও নতুন অনলাইনভিত্তিক সেবা আরম্ভ এবং ব্যাংকগুলোর মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে কাজ করা গেলে বর্তমান সময়ের সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাইয়ে নেওয়া সম্ভব।

অনলাইন ক্লাসে উপস্থিতির হার ৯৩ শতাংশ

অধ্যাপক ড. আতিকুল ইসলাম, উপাচার্য
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

করোনার কারণে আমাদের ক্যাম্পাস বন্ধের সপ্তাহখানেকের মধ্যেই আমরা অনলাইনে ক্লাস নেওয়া শুরু করি। শুরুতে আমাদের এই পদক্ষেপের অনেকেই সমালোচনা করেছেন। অনলাইন পাঠদানে আমরা এখনো প্রস্তুত নই, ছাত্রছাত্রীদের কাছে উন্নত প্রযুক্তিসেবা নেই, ইন্টারনেট ব্যবস্থা সুলভ নয় ইত্যাদি নানা রকম সমস্যার কথা শুনেছি। কিন্তু আমরা এসব কথায় কান দিইনি। বরং খুব কম সময়ের মধ্যে                                                                        আমাদের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান করে অনলাইন ক্লাসের জন্য প্রস্তুত করে তুলেছি। ফলে আমরা বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে তিন হাজারের অধিক অনলাইন কোর্স পরিচালনা করছি। একই সঙ্গে স্বাভাবিক ক্লাসের তুলনায় অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার ৮৮ শতাংশ থেকে ৯৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। করোনা নিশ্চয় আমাদের জন্য বড় একটি সংকট। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমেই আমাদের এই সংকটের সময়ের সঠিক ও সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অন্তত এই মহামারির কারণে আমাদের শিক্ষা খাত নিয়ে গতানুগতিক ধারার বাইরে কিছু চিন্তা করতে পারছি।

দুর্যোগের পর ইতিবাচক কিছু অপেক্ষা করে

এম এ কাশেম, চেয়ারম্যান
ট্রাস্টি বোর্ড, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ট্রাস্ট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলতে হয়, ‘মেঘ দেখে কেউ করিস নে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে’। অর্থাৎ যেকোনো দুর্যোগের পরই আমাদের জন্য ইতিবাচক কিছু অপেক্ষা করছে। আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এই কথা অত্যধিক সত্য। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর ভাষায় বলতে হয়, ‘বাঙালিদের দাবায়া রাখতে পারবা না।’ একের পর এক আমরা বাঙালিরা নানান সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। পরবর্তী সময়ে সেই সমস্যার সমাধানও করেছি। এই দুর্যোগেও কিন্তু আমরা বসে নেই। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ আমাদের অন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইন পাঠদানে সক্রিয় হয়ে উঠছে। এমনকি স্কুল ও কলেজ পর্যায়েও অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দেশের প্রতিটি খাত এভাবে সততার সঙ্গে এগিয়ে এলে দ্রুত চলমান সমস্যা থেকেও আমরা মুক্তি পাব।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন