তিনটি ক্যাম্পাসের তিনজন চেনামুখকে নিয়ে লিখেছেন জিনাত শারমিন
default-image

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কামরুন্নাহার মুন্নী
মানুষ হওয়ার লক্ষ্যে

অভিনয়, নাচ, গান, ফটোগ্রাফি, লেখালেখি, পরিচালনা, শিল্প নির্দেশনা—সবকিছুতেই আছেন কামরুন্নাহার মুন্নী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স বিভাগে স্নাতকোত্তর করছেন। যখন সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজে পড়তেন, তখন শিক্ষক দিবসে কলেজের ১৮ জন শিক্ষককে নিয়ে লিখেছিলেন ১০৮ লাইনের সুদীর্ঘ কবিতা। সেই কবিতাটি এখনো বাঁধাই করে রাখা আছে কলেজের দেয়ালে। বেশ কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবিতে অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনীত মাগনা আন্তর্জাতিক আন্তবিশ্ববিদ্যালয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব, দক্ষিণ এশিয়া স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব, যুক্তরাজ্যের পাইনউড স্টুডিও, সিলেট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ও ঢাকা উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ ফেস্টিভ্যালসহ বেশ কিছু স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে।

সম্প্রতি তিনি নুরুল আলম আতিক পরিচালিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মানুষের বাগান–এর কাজ শেষ করলেন। এ ছাড়া তিনি নিজের সব সঞ্চয় জড়ো করে নিজেই রুটস নামে একটি স্টুডিও গড়েছেন, এখানে একটা সিনেমা বানানোর জন্য যা যা লাগে, তার সবকিছুর জোগাড়ই আছে। কী নিয়ে ব্যস্ততা এখন? নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদীর কূল ঘেঁষে দক্ষিণ ভবানীপুর গ্রামে বেড়ে ওঠা মুন্নী বললেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা আর নারীদের জীবন নিয়ে দুটি প্রামাণ্যচিত্রের কাজ শেষ করেছি। এখন একটার পর একটা ফটোস্টোরি বানাচ্ছি। নাচ, উপস্থাপনা, শিল্প নির্দেশনার কাজ তো আছেই।’ সমাজবিজ্ঞান চত্বরে হাত নেড়ে উঁচু স্পষ্ট গলায় যখন কথা বলছিলেন, আশপাশের সবাই মন দিয়ে শুনছিল।

২০১৫ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ শুদ্ধ অবগাহন প্রকাশিত হয়। নিজের গ্রামের অবহেলিত নারীদের স্বাবলম্বী করতে তাঁদের জন্য সেলাই মেশিনের কাজ করাচ্ছেন, সেই সঙ্গে সেখানে চলছে হাতের কাজও। এর ওপর একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করে রেখেছেন তিনি। মুন্নী জিটিভির আজকের অনন্যা নামে একটি প্রতিযোগিতার চ্যাম্পিয়ন। তা ছাড়া আরটিভির ক্যাম্পাস স্টার অনুষ্ঠানে সেরা দশে ছিলেন।

ছোটবেলায় বাবা তাঁকে বলেছিলেন, ‘তোকে মেয়ে না, মানুষ হতে হবে।’ যখন স্কুল শেষ করে একেবারে একা একটা মেয়ে অজানা অচেনা ঢাকার পথে পাড়ি জমান, তখন মা বলেছিলেন, ‘তোমাকে আমি তোমার কাছে, তোমার দায়িত্বে রেখে দিলাম।’ মুন্নী ঢাকায় এসে অর্থকষ্টে একসময় গার্মেন্টসে কাজ করার কথাও ভেবেছিলেন। একটিমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়েই ফরম তোলার টাকা ছিল বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরম তুলেছিলেন। এভাবেই সব সংগ্রামকে স্বাগত জানিয়ে মানুষ হওয়ার পুরো দায়িত্বটা তিনি নিষ্ঠার সঙ্গেই পালন করে চলছেন।

default-image

ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির কাজী ইসমাইল হোসেন
ক্যাম্পাসের ক্রিকেটার

কাজী ইসমাইল হোসেন ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি) থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অনার্স করেছেন। এই লেখার জন্য ইসমাইলের বিষয়ে যখন খোঁজখবর নিচ্ছি, তখন তাঁর ক্যাম্পাসের এক জুনিয়র মেসেঞ্জারে লিখলেন, ‘ইসমাইল ভাইকে আমাদের ক্যাম্পাসের ৯৫ শতাংশ মানুষ ভালোবাসেন, ভাই সেরা।’ কোনো পরিসংখ্যান আছে কি না, তা আর জিজ্ঞেস করা হয়নি। তবে তাঁকে নিয়ে অনেকের পোস্ট পড়ে বোঝা গেল, ক্যাম্পাসে তিনি জনপ্রিয় বটে।

ইসমাইলের জন্ম ও বেড়ে ওঠা সৈয়দপুরে। ছোটবেলায় বাবা যখন টিভিতে ক্রিকেট খেলা দেখতেন, পাশে গালে হাত দিয়ে বসে যেতেন ছোট্ট ইসমাইল। একসময় নিজেই ব্যাট–বল নিয়ে নেমে পড়লেন মাঠে। সেই শুরু। আইইউটিতে আসার আগে মাতিয়েছেন ক্লাব। জেলা পর্যায়ে ডিএসএ লিগ খেলে নিজের দলকে চ্যাম্পিয়নও করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তবিভাগ ক্রিকেট টুর্নামেন্টে পরপর পাঁচবার ফাইনালে উঠেও হেরে গিয়েছিল ইসমাইলের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ। সবাই বলতে শুরু করেছিল, এটা একটা অভিশাপ। ইসমাইল যখন তৃতীয় বর্ষে, তখন প্রথম রাউন্ডের প্রথম ম্যাচে তাঁর বিভাগ বাজেভাবে হেরে যায়। পরের রাউন্ডে ওঠার জন্য দ্বিতীয় ম্যাচে তাদের ১২.৩ বলেই প্রতিপক্ষের ২০ ওভারে করা ১৩৯ রান টপকাতে হতো। ইসমাইল সেই ম্যাচে ৩৩ বলে ৮১ রান করেন। যখন ৬ বলে ১১ রান দরকার, তখন তিনি আউট হয়ে যান। শেষ পর্যন্ত ম্যাচটা জিততে তাঁদের ১৩ ওভার লেগেছিল। সবাই ভেবেছিল, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের আর পরের রাউন্ডে ওঠা হলো না। কিন্তু পরে হিসাব করে দেখা গেল, রানটা করতে হতো আসলে ১৪ ওভারে। হইহই পড়ে গেল। ইসমাইলের ভাষায়, ‘এটা আমার জীবনের সেরা গল্প। আমি খুব আগ্রহ নিয়ে সবাইকে এই গল্প বলি।’ ‘অভিশাপ’ কাটিয়ে সেবার তাঁরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। ইসমাইলের নেতৃত্বে গত বছরের চ্যাম্পিয়নও এই বিভাগ।

স্কুল-কলেজে নাকি ক্রিকেট খেলা ছাড়া আর কিছু করার কথা ভাবতেই পারতেন না ইসমাইল। বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠে লেখাপড়া আর ক্রিকেট ছাড়াও গবেষণার সঙ্গে তাঁর সখ্য হয়েছে। ইসমাইলের দুটি গবেষণার একটি (নিরাপদ পানিবিষয়ক) ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অব জিওটয়েকনিক (জিওমেট, ২০১৮), মালয়েশিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে। কংক্রিটের পুনর্ব্যবহার নিয়ে তাঁর দ্বিতীয় গবেষণাটিও যুক্তরাজ্যে প্রকাশিত হওয়ার বিষয়ে কথা চলছে।

default-image

ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের জেরিন তাসনিম
সে যে নাচে তা তা থই থই

জেরিন তাসনিম ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশে (ইউল্যাব) মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন। ছোটবেলায় গান ও আঁকাআঁকি শিখতেন, আর টিভিতে গান হলেই নাকি ঘুরে ঘুরে নাচতেন।

জেরিন মূলত শাস্ত্রীয় নৃত্যে পারদর্শী। ক্যাম্পাসে ভর্তি হওয়ার পর কোনো অনুষ্ঠান তাঁর নাচ ‘মিস’ করেনি। বুলবুল ললিতকলা একাডেমি থেকে নাচের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। আর নৃত্যাঞ্চলে শিবলী মহম্মদের কাছে পাঁচ বছর ধরে নাচ শিখছেন। ক্যাম্পাসে ভর্তি হয়ে সবার অনুরোধে একটি নাচের স্কুল খুলেছিলেন। পড়াশোনার চাপে আপাতত সেটা বন্ধ আছে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছেন। নাচের জন্য গেছেন মালয়েশিয়াতেও। প্রতিবছর কয়েকটি কসপ্লে কমিউনিটির কমিকনে অংশ নেন। সেই মহলেও তাঁর একটা বিশেষ পরিচিতি ও নামডাক আছে।

শেষ না এখানেই। জেরিন আরও খবর দিলেন, ‘ক্যাম্পাসের পিআর (পাবলিক রিলেশন) ফর ইউয়ের সঙ্গে আমি শুরু থেকেই যুক্ত আছি। গত সেমিস্টারে সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে “বেস্ট পিআর পারসন অব দ্য সেমিস্টার” পুরস্কার পেয়েছিলাম।’ সম্প্রতি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রদর্শনীর জন্য মুখোশ তৈরি করেছিলেন, যার থিম ছিল ‘আপনার সময় হয়তো আপনি চুপ ছিলেন, কিন্তু আপনার সন্তানকে চুপ করিয়ে রাখবেন না।’ মুখোশটি বিভাগের চেয়ারপারসন, অধ্যাপক জুড উইলিয়াম জেনিলোর এতটাই পছন্দ হয় যে তিনি সেটা নিজের জন্য রেখে দেন।

ভবিষ্যতে জেরিন নাচটাকে জনসংযোগের সঙ্গে যুক্ত করে ‘কিছু একটা’ করতে চান। এমন কিছু, যা মানুষের উপকারে আসবে, মানুষকে সচেতন করবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0