ক্যাম্পাসে প্রাক্তনদের উদ্যোগ

বিজ্ঞাপন
>করোনার এই দুঃসময়ে জনশূন্য ক্যাম্পাসে প্রাণ নেই। করোনাকালে ঘরবন্দী তরুণ শিক্ষার্থীদের স্বপ্নগুলোও। অর্থসংকট, কাজের সংকট, স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে শুধু শিক্ষার্থীরাই নন, একেকটা ক্যাম্পাস ঘিরে গড়ে ওঠা অনেক কর্মজীবীর দিন কাটছে দুঃসহ। সেই সব মানুষের দুঃসময়ে এগিয়ে এসেছেন ক্যাম্পাসের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু উদ্যোগের কথা থাকছে এই প্রতিবেদনে।
default-image

করোনাকালে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায়
আসিফ হাওলাদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

করোনা মহামারির কারণে চার মাসের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকার্যক্রম৷ এই দুঃসময়ে আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের পাশে থেকেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন।

এই তিন সংগঠনের বাইরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব বিভাগ ও ইনস্টিটিউট তাদের অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহযোগিতা করেছে। সামর্থ্য অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করেছেন বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরাও।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ও অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন যৌথভাবে সহযোগিতা করেছে এক হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে। এই দুই সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোনের বিকাশ ও রকেট অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে দুই হাজার করে টাকা। সমস্যায় থাকা শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরিতে সহযোগিতা করেছে ডাকসু ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্ক সংসদ।

শিক্ষক সমিতির সভাপতি (সদ্য সাবেক) অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক নিজামুল হক ভূইয়া এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ কে আজাদ ও মহাসচিব রঞ্জন কর্মকার মে মাসে এক যৌথ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি বড় অংশ নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে আসা। এর একটি অংশ সব সময় অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে থাকে। এই সংখ্যা প্রায় চার হাজার, যা মোট শিক্ষার্থীর ১০ শতাংশ। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেসব শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের কথা বিবেচনায় নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সরকারের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহযোগিতা করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে করোনা পরীক্ষার যে ল্যাবটি স্থাপন করা হয়েছিল, সেটিও হয়েছিল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সহযোগিতায়। শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা করেছে ডাকসুও। ‘শিক্ষার্থী সহায়তা ফান্ডের’ মাধ্যমে ডাকসু প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীকে দুই হাজার টাকা করে আর্থিক সহযোগিতা করেছে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাশে ছিল হল সংসদগুলোও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনও করোনাকালে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাশে ছিল। শুধু শিক্ষার্থীই না, ছিন্নমূল মানুষ ও পথশিশুদের পাশেও ছিল সংগঠনগুলো। ব্যক্তিগত ও নিজস্ব সাংগঠনিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতাও করেছেন অনেকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ও অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের একজন দরিদ্র ছাত্র৷ তিনি বলেন, টাকার পরিমাণ কম হলেও করোনার সময়ে প্রথম দিকে যখন সবকিছু স্থবির ছিল, সেই সময়ে সহায়তার দুই হাজার টাকা অনেক বড় একটা সাপোর্ট ছিল।

default-image

প্রাক্তন-বর্তমান মিলে দুঃসময়ের মোকাবিলা
মাইদুল ইসলাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

মুশফিকুর রহিম, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে। ওই বিভাগের অধ্যাপক আতিকুর রহমানের তত্ত্বাবধানে এখন ক্রিকেটের ইতিহাস নিয়ে এমফিল করছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের পদচারণে ক্যাম্পাসের বটতলা, ডেইরি গেটের দোকানিদের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে বাংলাদেশ জাতীয় দলের এই ক্রিকেটারের। করোনা মহামারির এই দুঃসময়ে সেখানকার দোকানিদের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। গত ২১ জুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ১৬০ জন দোকানির হাতে পৌঁছে গেছে তাঁর পাঠানো উপহার।

একইভাবে ক্যাম্পাসের দোকানি, রিকশাচালক, আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ১৫০টি পরিবারকে এখন পর্যন্ত সাড়ে তিন লাখ টাকার মতো ত্রাণসহায়তা দেওয়া হয়েছে।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে তহবিল গঠন করে সহায়তা প্রদান করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আমরাই জাহাঙ্গীরনগর’ ও ‘শুধুই জাহাঙ্গীরনগর’ নামের দুটি ফেসবুক গ্রুপে এই আয়োজন করা হয়। ১৪ এপ্রিল পয়লা বৈশাখে প্রথম এমন ভিন্নধর্মী আয়োজনের উদ্যোগ নেন জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হোসাইন ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মুশফিকুস সালেহীন। নাজমুল হোসাইন বলেন, ১৫ দিনে ২০টি এপিসোডে ২৩ জন শিক্ষার্থী সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেন। এ আয়োজন থেকে গঠিত তহবিলের টাকা বিতরণ করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থী টিউশনি করিয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারেরও খরচ চালাতেন। করোনার কারণে ৪ মাসের বেশি সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় টিউশনিও বন্ধ। এসব শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়িয়েছে ইন্সপায়ার, কেয়ার অ্যান্ড কালটিভেট হিউম্যান এইড (ইচ্ছা) নামে একটি সংগঠন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের উদ্যোগে রমজান মাসে ‘কুপন’ পদ্ধতিতে ত্রাণসহায়তা দেওয়া হয়। এই উদ্যোগের সমন্বয়ক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ এ মামুন বলেন, ‘আমরা কয়েকজন শিক্ষক মিলে প্রথমে তহবিল তৈরির কাজ শুরু করি। তহবিলে শিক্ষকেরা সহায়তা করেছেন। এ ছাড়া কয়েকজন কর্মকর্তা ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীও সহায়তা করেছেন।’

কুপন পদ্ধতিতে প্রথমে ১৫০টি পরিবারের একটা তালিকা তৈরি করা হয়। তালিকায় চা-বিক্রেতা, দোকানদার, ক্যানটিনের কর্মচারী, রিকশা ও ভ্যানচালক ছিলেন, যাঁরা এখন কর্মহীন হয়ে অসহায় দিন যাপন করছেন। স্বেচ্ছাসেবকেরা ব্যক্তির বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও কুপন বিলি করেছেন। নির্দিষ্ট দোকানে ত্রাণের প্যাকেট দেওয়া আছে। সবাই কুপনে উল্লিখিত দোকান থেকে নিরাপদে ত্রাণসহায়তা সংগ্রহ করেছেন। কুপনে প্রদানকৃত খাদ্যসামগ্রী একটি পরিবারের প্রায় এক মাসের খাবার ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় প্রতিটি বিভাগের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা নানাভাবে অর্থ সংগ্রহ করে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের তালিকা করে মোট ৮ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক–সামাজিক–সাংস্কৃতিক সংগঠন, প্রাক্তন এবং বর্তমান শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ ব্যক্তি উদ্যোগেও সহায়তা করে যাচ্ছেন।

default-image

শিক্ষার্থীদের পাশে
সুজয় চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

হরিধন দেবনাথ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী। বাবা বিথু ভূষণ গত ছয় মাস ধরে কর্মহীন। তিন মাস আগেও টিউশনি করে পরিবারের খরচ জোগাড় করতেন হরিধন। কিন্তু করোনার কারণে তাঁর টিউশনি বন্ধ হয়ে গেলে  বিপদে পড়েন তিনি। তাঁর এ দুঃসময়ে এগিয়ে আসেন বিভাগের শিক্ষক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। হরিধন এখন প্রতি মাসে অর্থসহায়তা পাচ্ছেন।

শুধু হরিধন নন, করোনাকালে বিপদে পড়া শতাধিক শিক্ষার্থীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন শিক্ষক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। করোনাকালে গত চার মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন, যোগাযোগ ও সাংবাদিক, সমাজতত্ত্ব, রাজনীতিবিজ্ঞান, বাংলা, ইংরেজি, রসায়ন, ফিন্যান্সসহ একাধিক বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা বর্তমান শিক্ষার্থীদের অর্থসহায়তা দিয়ে আসছেন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের কানাডা শাখা থেকে ক্যাম্পাসের চিকিৎসাকেন্দ্র উন্নয়নে ১০ লাখ টাকা সহায়তা দিয়েছে। পাশাপাশি কাজ করছে এমবিএ অ্যাসোসিয়েশন, ব্যাচ ৩১ নামের আরও কিছু সংগঠন।

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মেহজাবিন হোসাইন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। তিনি এবং প্রবাসী প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা মিলে অর্থ সহায়তা করছেন। একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আদনান মান্নান বলেন, করোনাকালে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকেরাও যথাসাধ্য সহযোগিতা করছেন। করোনায় টিউশন ও খণ্ডকালীন চাকরি হারিয়ে অনেক শিক্ষার্থী ফেসবুকসহ নানা মাধ্যমে কষ্টের কথা তুলে ধরেছিলেন। এসব দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির মাধ্যমে প্রথম ধাপে এক দিনের বেতন ৩৪৭ জন শিক্ষার্থীকে দিয়ে দেন শিক্ষকেরা।

শিক্ষকদের পাশাপাশি এগিয়ে আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন ব্যাচ ৩১। তারাও সমিতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করে। ইংরেজি বিভাগের এক প্রাক্তন শিক্ষার্থী পরিচয় প্রকাশ না করে শিক্ষার্থীদের জন্য দেন দেড় লাখ টাকা। পাশাপাশি পরিচয় প্রকাশ না করে একজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক দেন দুই লাখ টাকা।

সহায়তা পাওয়া বাংলা বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, বাবা মারা যাওয়ার পর ভেঙে পড়ে চার সদস্যের সংসার। মা তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করে সংসার চালাতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ওই শিক্ষার্থী টিউশনি করতে শুরু করেন। প্রতি মাসে তিনি চারটি টিউশন করাতেন। করোনা আসার আগেও মায়ের হাতে কিছু টাকা তুলে দিতেন। কিন্তু করোনার প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার পর একে একে তিনটি টিউশন চলে যায়। এতে অর্থকষ্টে পড়ে যান তিনি। পরে বিভাগের এক বড় ভাই ও শিক্ষকদের কাছ থেকে সহায়তা পেয়েছেন। পাশাপাশি সহায়তা পেয়েছেন শিক্ষক সমিতির কাছ থেকেও।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন