ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গতবছরের (২০১৯-২০ অর্থবছর) বাজেটে গবেষণাখাতে মোট বরাদ্দ ছিল ৪০ কোটি ৮০ লাখ ৭০ হাজার টাকা৷ কিন্তু সংশোধিত বাজেটে গবেষণাখাতে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৮ কোটি ৭২ লাখ ৮৭ হাজার টাকা৷ অর্থাৎ, গবেষণা-বরাদ্দের পুরো টাকা ব্যয় করতে পারেনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়৷

আজ বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে তিনটায় বসবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটের মুলতবি হওয়া বার্ষিক অধিবেশন৷ এই অধিবেশনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ অর্থ বছরের মূল বাজেট এবং ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট উপস্থাপন করা হবে৷ অধিবেশনটি উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রস্তুত করা গত অর্থ বছরের সংশোধিত ও আগামী বছরের মূল বাজেটের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণা-বরাদ্দের এই চিত্র পাওয়া গেছে৷

সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেট আগামী অর্থবছরের জন্য ৮৬৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকার বাজেট অনুমোদন দিয়েছে৷ আজকের সিনেট অধিবেশনে তা চূড়ান্ত হবে৷ এই বাজেট বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) ৭৪৮ কোটি ৬ লাখ টাকা অনুদান দেবে আর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি, ভর্তি ফরম বিক্রি, বেতন-ভাতা থেকে কর্তন, সম্পত্তিসহ নিজস্ব খাতগুলো থেকে ৭১ কোটি টাকা আয় হবে। এই দুই খাত থেকে ৮১৯ কোটি ৬ লাখ টাকা আয় হলেও বাজেটে ৫০ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঘাটতি থাকবে৷

গবেষণায় বরাদ্দ এবারও কমছে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল ৮১০ কোটি ৪২ লাখ টাকা৷ সেখানে গবেষণায় মোট বরাদ্দ ছিল ৪০ কোটি ৮০ লাখ ৭০ হাজার টাকা, যা ছিল বাজেটের ৫ দশমিক ৪ শতাংশ৷ এর আগের অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ছিল বাজেটের ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ৷ অর্থাৎ, সর্বশেষ দুই অর্থবছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় বরাদ্দ ক্রমাগত কমেছে৷

২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে গবেষণাখাতে মোট বরাদ্দ করা হয়েছে ৪০ কোটি ৯১ লাখ টাকা৷ শতাংশের হিসাবে এই বরাদ্দ মোট বাজেটের ৪.৭ ভাগ৷ এর মধ্যে কয়েকটি অনুষদের গবেষণার সরঞ্জাম কেনা এবং কয়েকটি অনুষদ-বিভাগের ল্যাবরেটরি যন্ত্রপাতি কেনা ও ল্যাব স্থাপনে ১৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে৷ এ ছাড়া গবেষণা মঞ্জুরী হিসেবে রয়েছে ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং শিক্ষকদের গবেষণা ভাতা হিসেবে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮ কোটি টাকা৷

 অন্য খাতগুলোতে বরাদ্দ ও বাজেট-ঘাটতি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন অর্থবছরের জন্য প্রস্তুত করা বাজেটে শিক্ষকদের বেতন খাতে ১৩৮ কোটি ৫০ লাখ (বাজেটের ১৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ) ব্যয় ধরা হয়েছে৷ এ ছাড়া কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন খাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয় হবে যথাক্রমে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ (বাজেটের ৭ দশমিক ৩০ শতাংশ) ও ৬৫ কোটি টাকা (বাজেটের ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ)৷ শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ভাতা বাবদ সহায়তা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয় হবে ২১৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা (বাজেটের ২৪ দশমিক ৮১ শতাংশ)৷

বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন অর্থবছরের তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, প্রতিবছরই বাজেটে ঘাটতি থাকছে৷ সর্বশেষ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ঘাটতি দেখানো হয়েছে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ আর নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সম্ভাব্য ঘাটতি ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ৷

এ ছাড়া শিক্ষকদের বিভিন্ন গবেষণা-প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক প্রকাশনা জার্নালে প্রকাশ করতে সহায়তা ও শিক্ষার্থীরা যাতে দেশে-বিদেশে শিক্ষা-বিনিময় করতে পারেন, সেই লক্ষ্যে দুটি নতুন খাত সৃষ্টি করা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে৷ এর মধ্যে প্রথমটির জন্য সংশোধিত বাজেটে ২০ লাখ ও আগামী প্রস্তাবিত বাজেটে ১ কোটি টাকা এবং দ্বিতীয়টির জন্য সংশোধিত বাজেটে ৫০ লাখ ও আগামী অর্থবছরের জন্য ১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে৷

কোভিড-১৯ মহামারির কারণে গত মার্চ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসগুলো কার্যত বন্ধ থাকায় যথার্থভাবে আর্থিক তথ্যাদি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন বিদায়ী কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দীন৷ বাজেটের মুখবন্ধে তিনি বলেছেন, আর্থিক বিধি-বিধান মেনে নির্ভুল বাজেট তৈরির সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে অনুমাননির্ভর তথ্যের ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে৷ কোথাও কোনো বরাদ্দের সমন্বয় করা প্রয়োজন হলে বা কোনো তথ্যের পরিবর্তন প্রয়োজন হলে ২০২০-২১ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে সমন্বয় ও সংযোজন করা হবে৷

"সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির অভাবে শিক্ষা ও গবেষণা ব্যাহত হচ্ছে, বললেন কোষাধ্যক্ষ"

অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারের যথার্থ দৃষ্টিভঙ্গি না থাকা এবং কখনো কখনো বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় দায়িত্বশীল প্রশাসকদের আর্থিক বিধিবিধান পালন না করার ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিদায়ী কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দীন৷

আজকের সিনেট অধিবেশনের জন্য প্রস্তুত করা বাজেটের মুখবন্ধে নিজের '৮ বছরের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা' থেকে এই মন্তব্য করেন সম্প্রতি মেয়াদ শেষ হওয়া কোষাধ্যক্ষ মো. কামাল উদ্দীন৷ তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের শিক্ষক৷

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগত মানের 'ব্যাপক ধসের' বিষয়টি উল্লেখ করে মো. কামাল উদ্দীন বলেন, সরকারসহ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা বাস্তবতা মেনে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে দুর্যোগ অনিবার্য।

মুখবন্ধে কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হওয়া অনলাইন ক্লাসের জন্য নিজের একটি প্রস্তাবও দিয়েছেন বিদায়ী কোষাধ্যক্ষ৷ তিনি বলেছেন, অনলাইন ক্লাস করার উপযোগী স্মার্টফোন কেনার জন্য যদি ২০ হাজার শিক্ষার্থীকে ২০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়, তাবলে ৪০ কোটি টাকার প্রয়োজন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে যারা পঞ্চম বা তার ওপরের গ্রেডে বেতন পাচ্ছেন, তাঁদের মূল বেতন এক বছরের জন্য ৩ বা ৫ শতাংশ কমিয়ে দিলে প্রায় ১০ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল থেকে আরও ১০ কোটি টাকা অনুদান দেওয়া সম্ভব৷ বাকি ২০ কোটি টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন তহবিল থেকে দেওয়া যেতে পারে। অথবা বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে সরকারের কাছে ৫০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের আবেদন করা যেতে পারে৷

বিজ্ঞাপন
শিক্ষা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন