default-image

‘যখন হাইস্কুলে ভর্তি হই, তখন মা বলেছিলেন, “তোমাদের ক্লাসের ফার্স্ট গার্লের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিয়ো তো।” বছর শেষে রেজাল্ট হওয়ার পর আমি মাকে বললাম, “মা, তুমি না ফার্স্ট গার্লকে দেখতে চেয়েছিলে? আমাকে ভালো করে দেখে নাও, আমি ক্লাসে প্রথম হয়েছি।”’ স্কুলজীবনের অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন মোছা. জাকিয়া ইসলাম। স্কুল-কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেও তিনি সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদ থেকে স্নাতকে জাকিয়া পেয়েছেন সিজিপিএ ৪.০০। ক্যাম্পাসে তিনিই প্রথম স্নাতক শেষে সিজিপিএ ৪-এর মধ্যে ৪ পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিশ্চয়ই জানেন, সিজিপিএ ৪.০০ ধরে রাখা চাট্টিখানি কথা নয়। এর অর্থ হলো, চার বছরের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে পড়ালেখায় একচুল ছাড় দেননি জাকিয়া ইসলাম। কীভাবে এই ‘কঠিনেরে ভালোবাসলেন’, সেটাই আগে জানতে চাই।

ভালো ফলের রহস্য
কৃষকরত্ন শেখ হাসিনা হলের ৫১১ নম্বর রুমের বাসিন্দা এই তরুণী ঘড়ি ধরে কখনো পড়ালেখা করেননি বলে জানালেন। যতক্ষণ একটা বিষয় আয়ত্তে না আসে, সেটা বোঝার জন্য বারবার পড়েন তিনি। প্রয়োজনে নানা বই, গবেষণাপত্র বা ইন্টারনেট ঘাঁটেন। ঢুঁ মারেন লাইব্রেরিতে। ক্লাস লেকচার মনোযোগ দিয়ে টুকে রাখেন বলে তাঁর পড়ালেখাটা সহজ হয়ে যায়। ক্লাস শেষে আবার বন্ধুদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন, ইউটিউবে এ–সংক্রান্ত ভিডিও পেলে চট করে দেখে নেন। আর এরপরও বুঝতে অসুবিধা হলে শিক্ষকেরা তো আছেনই। নতুন যেকোনো কিছু আগ্রহ নিয়ে শিখতে খুব ভালো লাগে জাকিয়ার। ‘জোর করে পড়ছি’—এ কথা কখনোই তাঁর মনে হয়নি।

৪ বছরের স্নাতক পড়ার সময় নানা বিষয় পড়তে হয়েছে, তবে জাকিয়ার সবচেয়ে ভালো লেগেছে অ্যাগ্রিকালচারাল কেমিস্ট্রি, জেনেটিকস ও হর্টিকালচার। প্রতিটি সেমিস্টারেই জিপিএ ৪ ধরে রেখেছেন। তবে শেষ সেমিস্টারে ৪ থাকবে কি না, এ নিয়ে নাকি দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। ফলাফল ঘোষণার দিন নিজের ফল দেখতে গিয়ে বুক ধুকধুক করছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জাকিয়া আবিষ্কার করেন, তিনিই একমাত্র ৪ ধরে রাখতে পেরেছেন। একদিকে নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছিল না, অন্যদিকে সবার অভিনন্দনে ধাতস্থ হতে হতে বেশ খানিকটা সময় লেগে গেছে।

পথচলা
গাইবান্ধা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও গাইবান্ধা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে লেখাপড়া করেছেন তিনি। প্রয়াত খাদেমুল ইসলাম ও গুলশান আরা বেগমের তিন সন্তানের মধ্যে জাকিয়া সবার ছোট ও আদরের। বাবা মারা যাওয়ার পর মায়ের ত্যাগ, কষ্ট ও পাঠানো টাকার মূল্যায়ন কিছুটা হলেও তিনি করতে পেরেছেন বলে মনে করেন। নানা কথার ফাঁকে আক্ষেপ করে বললেন, ‘বাবা বেঁচে থাকলে আমার সাফল্যের কথা শুনে তিনিই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন।’ 

সারা জীবন কৃষি খাতের সঙ্গেই নিজেকে যুক্ত রাখতে চান জাকিয়া। শুধু নামে নয়, কাজের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষিবিদ হতে চান। উচ্চতর গবেষণা ও শিক্ষকতার স্বপ্ন আছে তাঁর। নিরাপদ ও ভেজালমুক্ত খাদ্য নিয়ে কাজ করতে চান, দেশের কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানোর জন্য নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চান—এই লক্ষ্যের কথাও বললেন। জাকিয়া বলেন, ‘আমি মনে করি, যদি খাদ্যে ভেজাল থাকে, তাহলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে। তাই আগামী প্রজন্মকে দেশের মূল্যবান সম্পদে পরিণত করার জন্যই খাদ্য থেকে ভেজাল দূর করা খুব জরুরি। কৃষিতে এমন ধরনের সহনীয় রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হোক, যেন জীববৈচিত্র্য, মাটির উর্বরতা ঠিক থাকে—সব মিলিয়ে পরিবেশবান্ধব হয়। কৃষকদের কাছে ভালো কিছু পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে স্নাতকোত্তরে অ্যাগ্রিকালচারাল কেমিস্ট্রিতে ভর্তি হওয়ার জন্য আবেদন করেছি।’ 

জাকিয়া গল্পে গল্পে বললেন, প্রথম সেমিস্টারের লেভেল-১–এ পড়ার সময় জন্ডিসে আক্রান্ত হওয়ায় এক মাস ক্লাস করতে পারেননি। উপস্থিতিতে নম্বর কম ছিল। সেমিস্টারের ফলাফল প্রকাশিত হলে দেখা গেল, জাকিয়া পেয়েছেন ৪.০। এই প্রাপ্তিই জীবনের সেরা মুহূর্ত। জাপানের প্রতিষ্ঠান নাগাও ন্যাচারাল এনভায়রনমেন্ট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন করে মোট ৫০ জন শিক্ষার্থীকে প্রায় ৮০ হাজার টাকার বৃত্তি দিয়েছিল। জাকিয়া জানালেন, তিনিও বৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীদের একজন। এ ছাড়া ডিন’স একাডেমিক এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড আছে তাঁর ঝুলিতে। 

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0