default-image

২০১৯ সালে সারা বিশ্বের ৪ হাজার ৭০০ শিক্ষার্থীর মধ্য থেকে সম্মানজনক শোয়ার্জম্যান বৃত্তির জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হন ১৪৫ জন। এই মেধাবীদের একজন বাংলাদেশি। তাঁর নাম দেবপ্রিয়া দাস।

শোয়ার্জম্যান বৃত্তির অধীনে চীনের বিখ্যাত শিঙ্গুয়া ইউনিভার্সিটিতে সম্পূর্ণ বিনা খরচে স্নাতকোত্তর কোর্স করার সুযোগ পাবেন দেবপ্রিয়া। হোস্টেল সুবিধা, যাতায়াতের জন্য বিমানভাড়াও বহন করবে বিশ্ববিদ্যালয়। এ ছাড়া আর্থিক অনুদান হিসেবে দেবপ্রিয়া পাবেন চার হাজার মার্কিন ডলার বা প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা। 

পড়ালেখায় বরাবরই মনোযোগী দেবপ্রিয়া। পড়তে তাঁর সব সময় ভালো লাগে। তবে শুধু পরীক্ষায় ভালো করার জন্য নয়, বরং নতুন কিছু শেখার জন্য। দেবপ্রিয়া বলেন, ‘স্কুলজীবন থেকে এখন পর্যন্ত আমি কিন্তু কখনোই সারা দিন বই নিয়ে বসে থাকিনি। ক্লাসে অথবা বাসায় যতক্ষণ পড়ি, ততক্ষণ মনোযোগ সহকারে বুঝে বুঝে পড়ার চেষ্টা করি।’

২০১৯ সালে ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্ন থেকে নিউরোসায়েন্স অর্থাৎ স্নায়ুবিজ্ঞানে প্রথম বিভাগ পেয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। যদিও প্রথমে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের লাইফ সায়েন্স বিষয়ে। কিন্তু ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নের নিউরোসায়েন্স বিষয়টি তুলনামূলক বেশি গবেষণাকেন্দ্রিক হওয়ায় লাইফ সায়েন্সে পড়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন তিনি।

স্কুলজীবন থেকেই জীববিজ্ঞান বিষয়ের প্রতি অন্য রকম একটা আগ্রহ কাজ করত। সেই আগ্রহকে পুঁজি করেই জীববিজ্ঞানসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন তিনি।

এত সব বিষয় ছেড়ে জীববিজ্ঞানেই কেন আগ্রহ? দেবপ্রিয়ার মতে, জীববিজ্ঞান বিষয়টি নিয়ে অনেকেরই ভুল ধারণা রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, এটা অনেক কঠিন বিষয়, সবটাই মুখস্থ করতে হয়, ইত্যাদি। কিন্তু জীববিজ্ঞান মোটেই কোনো মুখস্থবিদ্যানির্ভর বিষয় নয়। মুখস্থ না করে বুঝে পড়তে পারলেই জীববিজ্ঞানের মজাটা পাওয়া যায়।

জীববিজ্ঞানের মজা পেয়েছেন বলেই শুধু পড়তে নয়, এই বিষয় পড়াতেও ভালোবাসেন তিনি। তাই জীববিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন শুরুর আগে কয়েক মাস তাঁর নিজ স্কুল, মাস্টারমাইন্ডে শিক্ষকতা করেছেন তিনি। এ ছাড়া তখন ‘বায়োল্যান্ড’ নামে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যেখানে সিলেবাসের গৎবাঁধা জীববিজ্ঞানকে শিক্ষার্থীদের সামনে নতুনভাবে উপস্থাপন করতেন দেবপ্রিয়া। পড়াশোনার বাইরেও বায়োলজি অলিম্পিয়াডের জন্য প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করতেন তিনি। অতএব ভালো শিক্ষক হিসেবে দেবপ্রিয়ার নামডাক ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু এরই মধ্যে গ্র্যাজুয়েশনের জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার সময় চলে এল। দেবপ্রিয়ার বিদায় তাঁর সব ছাত্রছাত্রীদের মন খারাপ করে দিয়েছিল। যদিও পরবর্তী সময়ে ছুটিতে দেশে এলেই তাঁর কাছে পড়তে চলে আসত ছাত্রছাত্রীরা।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সহপাঠীদেরও পড়াতেন দেবপ্রিয়া। পড়া বুঝিয়ে নেওয়ার জন্য অনেকেই তাঁর কাছে আসত। হাসতে হাসতে দেবপ্রিয়া বলেন, ‘আমি কিন্তু ওদের ফ্রি পড়াতাম না, বরং বিনিময়ে বেশ ভালো অঙ্কের একটা সম্মানীও পেতাম!’

জীববিজ্ঞান নিয়েই যে তিনি ভবিষ্যৎ গড়বেন, তা তিনি নিজেও জানতেন না। সপ্তম শ্রেণির জীববিজ্ঞান বইয়ে পরিপাক প্রণালি পড়ে বেশ মজা লেগে যায়। সেদিন থেকেই বিষয়টির প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে। দেবপ্রিয়া মনে করেন, যার যে বিষয়ে আগ্রহ, তার সেই বিষয় নিয়ে পড়া উচিত। তাহলে পড়াশোনায় কখনোই একঘেয়েমি আসে না। তিনি বলেন, ‘আমি খুব ভাগ্যবান যে আমার মা–বাবা পড়াশোনার ব্যাপারে কখনোই কিছু চাপিয়ে দেননি। আমি যখন যা নিয়ে পড়তে চেয়েছি, তাঁরা সহযোগিতা করেছেন।’

যদিও দেবপ্রিয়ার মা শিউলি দাস একসময় চাইতেন মেয়ে সংগীতশিল্পী হোক। খুব ছোটবেলাতেই তাই হারমোনিয়ামের সঙ্গে পরিচয় ঘটে দেবপ্রিয়ার। ছায়ানটে বছর পাঁচেক রবীন্দ্রসংগীত চর্চাও করেছেন। তবে গান একান্তই নিজের জন্য করতেন তিনি। সংগীতকে পেশা হিসেবে নেওয়ার ইচ্ছা কখনোই ছিল না। পরবর্তী সময়ে ও লেভেল পড়ার সময় পড়াশোনার চাপ বাড়তে থাকে। ফলে ধীরে ধীরে গানের জগতের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়।

গানের বাইরেও স্কুলজীবনে আরও একটি অর্জন আছে দেবপ্রিয়ার। ২০১৫ সালে দেশে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হওয়া বাংলাদেশ বায়োলজি অলিম্পিয়াডে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন তিনি।

দেবপ্রিয়া জানান, তাঁর মাস্টার্সের ক্লাস শুরু হবে আগামী আগস্ট থেকে। ক্লাস শুরু হওয়ার আগে সময় ব্যয় করছেন নিজের প্রথম বইয়ের পেছনে। ও লেভেলের শিক্ষার্থীদের জন্য জীববিজ্ঞানের একটি সহায়ক বই লিখছেন তিনি। বইয়ের নাম এখনো ঠিক করা হয়নি। তবে তিনি আশা করছেন, আগামী মে-জুন মাসের মধ্যে বইটি পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশিত হবে।

পড়াশোনা শেষে আবার নিজ দেশেই ফিরতে চান দেবপ্রিয়া। মাধ্যমিক আর উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের জীববিজ্ঞান সিলেবাস পরিবর্তনের জন্য কাজ করতে চান তিনি। শিক্ষকতার পাশাপাশি দেশে জীববিজ্ঞান বিষয়ে ভালো মানের শিক্ষক তৈরি করতে চান। আরও নানা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আছে তাঁর। কে জানে, বছর কয়েক পর হয়তো শুধু মাস্টারমাইন্ড স্কুল নয়, সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়বে জীববিজ্ঞানের শিক্ষক দেবপ্রিয়ার নাম!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন