default-image

পৃথিবীতে একটি বিষয়ই অপরিবর্তনীয়, তা হলো পরিবর্তন। যা-ই ঘটুক না কেন, পরিবর্তন অনিবার্য। যেহেতু এটি এড়ানো সম্ভব নয়, তাই আমাদের উচিত, পরিবর্তনের হাত ধরে যেসব নতুন সুযোগ আসে, সেগুলো কাজে লাগানো।

যেকোনো পরিস্থিতিতেই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কঠিন। আকস্মিক হলে তো আরও জটিল। যত দিন এই মহামারি নিয়ন্ত্রণে না আসছে, তত দিন আমাদের সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, অর্থাৎ অতীতের চেনা শিক্ষাব্যবস্থাতেও ফেরা হবে না। প্রয়োজনের তাগিদেই আমরা অনলাইন শিক্ষার সঙ্গে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করছি, এর ভালো-মন্দ দিকগুলো সম্পর্কে অবগত হচ্ছি। সাধারণ ধারণা হলো অনলাইন শিক্ষা কখনোই মুখোমুখি বসে শিক্ষা গ্রহণের বিকল্প হতে পারে না। সত্যিই কি তাই? আমি মনে করি কথাটা আংশিক সত্য, তবে পুরোপুরি নয়।

শ্রেণিকক্ষের পড়ালেখা কি সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত? নিশ্চয়ই নয়। এটা সবাই জানেন যে আমাদের প্রত্যেকের শেখার নিজস্ব ধরন আছে। শ্রেণিকক্ষে যেভাবে পড়ানো হয়, তা হয়তো একদল শিক্ষার্থীর জন্য মানানসই, তাঁরা এ থেকে উপকৃত হচ্ছেন। অন্যদিকে আরেক দলের কাছে এ ধরন গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁদের ক্লাসের বাইরে গিয়ে ‘গ্রুপ লার্নিং’-এর মাধ্যমে বিষয়টা বুঝে নিতে হয়। অনলাইন শ্রেণিকক্ষের দরজা একজন শিক্ষার্থীর জন্য সপ্তাহে সাত দিন, ২৪ ঘণ্টা খোলা। আগ্রহী শিক্ষার্থীরা তাঁদের নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী বিষয়টা আয়ত্তে আনতে পারেন। অনলাইন শিক্ষার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ‘অনলাইন শিক্ষা’ নয়, বরং প্রস্তুতির অভাব।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে কোর্সগুলো অনলাইনে নিতে হয়েছে। যারা আগে থেকেই এই পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত, তাদের প্রস্তুতি ভালো ছিল। যারা দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে, তারাই নেতৃত্ব দেয়, ঝুঁকি নেয়। ঝুঁকি গ্রহণের সুফল এখন তারা ভোগ করছে। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় ও অধ্যাপকেরা অনলাইনে পাঠদানের কৌশল আরও ভালোভাবে রপ্ত করতে শুরু করেছেন, শেখার অভিজ্ঞতায় নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

অনলাইন শিক্ষার বিস্তারের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো উচ্চমানসম্পন্ন প্রচুর একাডেমিক প্রোগ্রাম এবং এ–সংক্রান্ত কোর্স পৃথিবীব্যাপী শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনেক কম খরচে এ সুবিধার সুযোগ তৈরি করা। এখন পর্যন্ত অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ই তাদের মূল শিক্ষাক্রম অনলাইনে নিয়ে আসার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়নি। উবারের আগমন যেভাবে একটা বড় পরিবর্তন এনেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে কোভিড-১৯-এর সংকটময় পরিস্থিতি সে রকম একটা পরিবর্তনের নিয়ামক হতে পারে। নিজেদের কোনো গাড়ি না থাকা সত্ত্বেও বিশ্বের অনেক দেশে উবার সবচেয়ে প্রভাবশালী পরিবহনপ্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে। ফলে ট্যাক্সির ব্যবসায় একটা বড় বিঘ্ন ঘটেছে এবং যাঁরা ট্যাক্সি চালিয়ে উপার্জন করতেন, তাঁদের জীবনে একটা বড় ধাক্কা লেগেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর কোভিডের প্রভাব কতখানি পড়বে, তা বলার সময় এখনো হয়নি। তবে এমনটা ধারণা করাই যায় যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যম হিসেবে অনলাইন পূর্ণ গ্রহণযোগ্যতা পাবে। আমি মনে করি, আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য এটা শিক্ষার একটা সোনালি সময়ের সূচনা। অনলাইনের কল্যাণে আজ বিশ্বের নতুন বা প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাদানকারীদের কত শত মডিউল বা প্রোগ্রাম যে হাতের নাগালে চলে এসেছে, তা আপনার ধারণারও বাইরে। কিছু কিছু কোর্স করা যায় বিনা মূল্যে। যাঁরা সত্যিকার অর্থেই শিখতে চান, তাঁদের জন্য একমাত্র বাধা হতে পারে যথোপযুক্ত ইন্টারনেট–ব্যবস্থা। সর্বস্বীকৃত সনদপ্রাপ্তির বিষয়ে কিছুটা জটিলতা থাকতে পারে, তবে শিক্ষা গ্রহণে কোনো বাধা নেই। এমন অনেক ডিগ্রি প্রোগ্রাম আছে, যেগুলো ক্যাম্পাসের ক্লাসের তুলনায় অনলাইনে অনেক কম খরচে করা সম্ভব হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া টেক বিশ্ববিদ্যালয় এ ক্ষেত্রে একটা চমৎকার উদাহরণ হতে পারে। স্বনামধন্য এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে হাজিরা দিয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করতে হলে আপনাকে দিতে হবে ৪০ হাজার ডলার বা প্রায় ৩৪ লাখ টাকা। অথচ অনলাইনে মাত্র সাত হাজার ডলার (প্রায় ছয় লাখ টাকা) দিয়ে আপনি এ ডিগ্রি নিতে পারবেন। কম্পিউটার বিজ্ঞানে বিশ্বের অন্যতম সেরা একটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এখন শিক্ষার্থীরা পেতে পারেন বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বসে। বাংলাদেশের যোগ্যতাসম্পন্ন যেকোনো শিক্ষার্থী এ ধরনের বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোগ্রামে অংশ নিতে পারেন, ঘরের বাইরে পা না রেখেই।

দিন শেষে আমাদের সবাইকেই ‘আজীবন ছাত্র’ হওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। কথার কথা নয়, এমনটা হতেই হবে। জীবনভর শিক্ষা গ্রহণকে একটি উপভোগ্য অভ্যাসে পরিণত করুন। শেখার আনন্দ আবিষ্কার করুন—জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য, জীবন সমৃদ্ধ করার জন্য ও নিজেকে একজন সুশিক্ষিত হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। আমার প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের পুরোটাই কেটেছে একাডেমিক পরিবেশে, আমিও একজন আজীবন ছাত্র। ব্যবসা, আইন, ইতিহাস, সংস্কৃতি, নানা বিষয়ে আমি অনলাইনে কোর্স করি। চাকমা, বাংলা, ইংরেজি, ফরাসি ভাষায় আমার দখল আছে। এখন অনলাইনে স্প্যানিশ শিখছি। আপনাদেরও এমনটা করতে হবে। আরও বেশি করতে হবে।

মানসম্পন্ন শিক্ষার জন্য যদি ইন্টারনেটকে ব্যবহার করতে চান, অজস্র সুযোগ আছে। আমার আইপ্যাডে আমি বহু পুরোনো বই নামিয়ে রেখেছি, সব শেষ করতে আমার বোধ হয় অন্তত পাঁচ বছর লাগবে। যদি এমন হয় যে আপনি আমার কথায় অনুপ্রাণিত হলেন, আজীবন শিখতে আগ্রহী হলেন, কিন্তু কোথা থেকে শুরু করবেন বুঝতে পারছেন না; একটা নতুন ভাষা দিয়ে শুরু করছেন না কেন? এটা যেমন ফরাসি বা স্প্যানিশ ভাষা হতে পারে, তেমনি হতে পারে কোনো প্রোগ্রামিংয়ের ভাষা।

একজন দুর্দান্ত শিক্ষার্থী হোন। জানুন, কীভাবে শিখতে হয় ও ভুলে যেতে হয়। জীবনের বাকিটা পথ শিক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করুন। অনলাইন শিক্ষা আপনার সামনে সেই সুযোগ করে দিচ্ছে। আমি যে ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ছাত্র ছিলাম, লাতিন ভাষায় সেখানকার একটা মোটো আছে—‘তুম এস্ত’, অর্থাৎ ‘এটা নির্ভর করছে তোমার ওপর।’ আজীবনের শিক্ষার্থী ও ভবিষ্যৎ নির্মাতারা, এটা পুরোপুরি নির্ভর করছে আপনাদের ওপর, এই সুন্দর অথচ স্বল্প সময়ের জীবনে আপনারা কী অর্জন করতে চান? আমার বিনীত অনুরোধ: শেখার মধ্য দিয়েই জীবনটা সর্বোচ্চ কাজে লাগান। কারণ, মানুষ মরণশীল, আর আমাদের জীবন একটাই।

[ইংরেজি থেকে অনূদিত]


অমিত চাকমা: অমিত চাকমার জন্ম রাঙামাটিতে, ১৯৫৯ সালে। দীর্ঘদিন কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অন্টারিওর উপাচার্য ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০তম সমাবর্তনের বক্তা ছিলেন তিনি। সেই অনুষ্ঠানে তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রি দেওয়া হয়।

উপাচার্য, ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞাপন
শিক্ষা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন