default-image

মানুষ

মূলভাব: সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই—এ ঘোষণাই দিয়েছেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম

অন্যান্য যে ভাব প্রকাশ পেয়েছে:

১. সবার উপরে মানুষ সত্য/মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ

২. ধর্মের নামে অধর্ম

৩. অবহেলিত মানুষের সকরুণ চিত্র/স্রষ্টার কাছে অন্যায়ের প্রতিবাদে নালিশ

৪. মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাঙ্ক্ষিত নেতার জাগরণ কামনা

৫. ধর্ম নিয়ে অধর্মকারীদের বিরুদ্ধে কবির বিদ্রোহ

সবার উপরে মানুষ সত্য/মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব

আলোচ্য ‘মানুষ’ কবিতায় কবি মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের জয়গান গেয়েছেন। সৃষ্টিজগতের সব প্রজাতির মধ্যে মানুষই যে শ্রেষ্ঠ, কবি নির্দ্বিধায় সেই সত্য তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে তিনি মানুষের সম-অধিকারের কথা তুলে ধরেছেন। কবি দেখিয়েছেন যে জগৎজুড়ে এক জাতি আছে সেই জাতির নাম মানুষ জাতি। অর্থাৎ দেশ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ ইত্যাদির সবকিছুর ঊর্ধ্বে মানুষ। গোটা বিশ্বের সব মানুষ এক মন্ত্রে উজ্জীবিত, আর তা হলো সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।

বিজ্ঞাপন

ধর্মের নামে অধর্ম

সব প্রজাতির মধ্যে মানুষ শ্রেষ্ঠতম প্রজাতি হলেও কিছু মানুষ আছে যারা ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে ধর্মের নামে অধর্ম করতেও দ্বিধা করে না। এ রকমই দুটো অধর্মের কাহিনি তুলে ধরেছেন আলোচ্য ‘মানুষ’ কবিতায়। প্রথম ঘটনায় জীর্ণ-শীর্ণ ক্ষুধার্ত এক পথিক মন্দিরে পূজারির কাছে খাবার চাইলে সে পূজারি সহসা মন্দিরের দরজা বন্ধ করে দেয়। ধর্মের রক্ষক হয়েও ধর্মীয় অনুশাসন না মেনে, একজন অসহায় নিরন্ন মানুষকে খাবার না দিয়ে তাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে দ্বিতীয় ঘটনাতেও একই রকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। সেখানে সাত দিন ধরে অভুক্ত এক মুসাফির মসজিদের খাদেমের কাছে খাবার চাইলে মুসাফিরের নামাজ না পড়ার অজুহাতে তাকে মসজিদ থেকে বিতাড়িত করে। শুধু তাই নয়, মানুষ হিসেবে তাকে বিন্দু পরিমাণে সম্মান না দিয়ে ভাগাড়ে গিয়ে মরতে অভিশাপ দেয়, যা অত্যন্ত অন্যায়, অমানবিক, অধর্মের কাজ। এমনই ভাবে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন কালে মানুষ অধর্ম করে বেড়াচ্ছে। কবি তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

অবহেলিত মানুষের করুণ চিত্র বা স্রষ্টার

কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহের কবি, বিপ্লবের কবি, সাম্যের কবি। তার এই বিপ্লব-বিদ্রোহ হলো সব ধরনের বৈষম্য দূর করে মানুষ হিসেবে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। তারপরও যুগে যুগে অগণিত মানুষ, ক্ষমতাশীলদের দ্বারা হয়েছে শোষিত, বঞ্চিত, নির্যাতিত, নিষ্পেষিত। তাদের আর্তনাদ ঈশ্বরের কাছে। আলোচ্য কবিতাতেও আমরা এ রকম দুটো ঘটনা দেখি। প্রথম ঘটনায় জীর্ণ-শীর্ণ পথিক খাবার না পেয়ে মন্দির থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়। ক্ষুধার যন্ত্রণা নিয়ে রাস্তায় চলতে চলতে সৃষ্টিকর্তার কাছে সে নালিশ জানায়। অঢেল গোস্ত-রুটি মসজিদে থাকা সত্ত্বেও খাদেম সাহেব সাত দিন ধরে অভুক্ত থাকা মুসাফিরকে খাবার না দিয়ে তাড়িয়ে দেয়। মুসাফির রাস্তায় চলতে চলতে স্রষ্টার কাছে নালিশ জানায়।

মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাঙ্ক্ষিত নেতার জাগরণ কামনা

‘মানুষ’ কবিতায় আমরা দেখতে পাই—ধর্ম নিয়ে কতিপয় মানুষের অন্যায় কাজের অবসান ঘটাতে কবি কিছু ঐতিহাসিক চরিত্রের প্রসঙ্গ এনেছেন। যাতে আমরা তাদের চেতনা ও আদর্শ ধারণ করে অন্যায়কারীদের মূল উৎপাটন করতে পারি। এই প্রসঙ্গে কবি চেঙ্গিস খান, কালাপাহাড়, গজনির সুলতান মাহমুদ, রাজচন্দ্র প্রমুখকে আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের আদর্শে উদ্ভাসিত হয়ে আমরা সব ধরনের বৈষম্য দূর করে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হব।

ধর্ম নিয়ে অধর্মকারীদের বিরুদ্ধে কবির বিদ্রোহ

যুগে যুগে দেশে দেশে কিছু মানুষ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ধর্মের নামে অধর্ম করতেও কার্পণ্য করেনি। কবি মানুষের এ ধরনের কাজের অবসান ঘটাতে চেয়েছেন। সব মানুষের তীর্থস্থান, পরম পুণ্যস্থানগুলোকে সেই সব মানুষের হাত থেকে উদ্ধার করতে কবি হাতুড়ি-শাবল চালাতে বলেছেন। স্রষ্টার ঘরে কোনো অন্যায়কারী মানুষের জয়গান যেন না হয়, সে জন্য কবি কালাপাহাড়, চেঙ্গিস খানের মতো ব্যক্তিদের আহ্বান জানিয়েছেন।

মোট কথা, কবি সব মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন
শিক্ষা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন