প্রথম আলো: বেডু কেবল অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ওপর গবেষণাটি করেছে। তাদের যুক্তি এই শিক্ষার্থীরা ২০২৪ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেবে। তাই তাদের ঘাটতি চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য গবেষণাটি করা হয়েছে। কিন্তু করোনাকালে নিশ্চয়ই অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরও এই ঘাটতি হয়েছে। সেই চিত্রটিও জানা এবং ঘাটতি পূরণে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার বলে মনে করেন কি ?

এম তারিক আহসান: করোনাকালে অষ্টম শ্রেণির পাশাপাশি অন্যান্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরও এই শিখন ঘাটতি থাকাটি স্বাভাবিক। শুধু তাই নয়, অষ্টম শ্রেণির যে কয়টি বিষয়ে গবেষণা হয়েছে তার বাইরেও অন্য বিষয়গুলোতেও শিখন ঘাটতি রয়েছে। কাজেই এই বিষয়টি মাথায় রেখে সব শ্রেণির সব বিষয়ে শিখন ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

প্রথম আলো: বেডু বলছে, শিক্ষার্থীদের ঘাটতি পূরণে কেন্দ্রীয়ভাবে কার্যক্রম হাতে নেওয়া প্রয়োজন। এর অংশ হিসেবে দূরশিক্ষণ কার্যক্রম, যেমন টেলিভিশনে ক্লাস সম্প্রচার, অনলাইন ক্লাসসহ বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। এগুলো বাস্তবায়ন যোগ্য বলে মনে করেন?

এম তারিক আহসান: টেলিভিশন, অনলাইন ইত্যাদি দূরশিক্ষণের মাধ্যমে ক্লাসের পাশাপাশি আমাদের আরও নতুন কিছু বিষয়ে ভাবনার প্রয়োজন আছে। আমরা জানি, অনলাইন ক্লাস বা পোর্টাল ব্যবহার করে সব শিক্ষার্থী ক্লাস করার সুযোগ পায় না বা করতে পারেনি। তাই এগুলোর পাশাপাশি আরও কিছু সৃষ্টিশীল উপায় খুজে বের করা জরুরি, যেগুলো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণবলে মনে করি। বিশ্বব্যাপী জরুরি সময়ে শিখন ঘাটতি পূরণে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সেখানে দুটি বিষয় স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো, শিখন ঘণ্টার বিস্তরণ অর্থাৎ শিখন ঘণ্টাকে সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা। এ জন্য যেটি করা দরকার সেটি হলো মুখোমুখি শ্রেণি কার্যক্রমের পাশাপাশি বাড়িভিত্তিক বা এলাকাভিত্তিক শিখন কার্যক্রম পরিচালনা করা। আরেকটি হলো শিক্ষাক্রম বা পেডাগজিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি। এর মাধ্যমে মূল যোগ্যতাগুলোকে চিহ্নিত করে সেগুলোর মধ্যে কাছাকাছি যোগ্যতাগুলোকে গুচ্ছ করে কতগুলো থিম ঠিক করতে হবে। তার ভিত্তিতে প্রকল্পভিত্তিক বা সমস্যাভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে শিখন ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। এভাবে মাধ্যমে নতুন শ্রেণির (ওপরের শ্রেণি) কার্যক্রমে ব্যাঘাত না ঘটিয়ে পুরোনো শিখন ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা যাবে। এই প্রক্রিয়ায় দলগতভাবে কাজ করার ফলে শিক্ষার্থীরা একে অপরের কাছ থেকেও শিখন ঘাটতি পূরণে সহযোগিতা নিতে পারবে। যার ফলে শুধু শিক্ষকের ওপর চাপ পড়বে না। এসব উদ্যোগ সারা পৃথিবীতেই চর্চা করা হয়েছে এবং হচ্ছে।

প্রথম আলো: আমরা জানি এলাকাভেদে শিক্ষায় মারাত্মক বৈষম্য আছে। বেডুর গবেষণা প্রতিবেদনও বলছে রাঙামাটি, খাগড়াছড়িসহ বেশ কিছু এলাকায় শিখন ঘাটতি অনেক বেশি। আপনার কাছে জানতে চাই শিক্ষায় এলাকাভেদে থাকা বৈষম্য নিরসনে কি করা উচিত ?

এম তারিক আহসান: এলাকাভেদে নানা বৈষম্য রয়েছে। দুর্গম এলাকাগুলোতে শিক্ষার্থীদের সকলের হাতে প্রয়োজনীয় ডিভাইস নেই। এমনকি মা–বাবার হাতেও নেই। এ অবস্থায় শিখন ঘাটতি পূরণ করতে চাইলে আগেই যা বললাম অর্থাৎ বাড়িভিত্তিক বা বাড়িভিত্তিক নানা রকম কার্যক্রম নিয়ে এগোতো হবে।এ ক্ষেত্রে যেসব শিক্ষার্থী কাছাকাছি এলাকায় বসবাস করে তাদের ছোট ছোট শিখনদলে ভাগ কার্যক্রম চালানো সম্ভব। একইভাবে বাড়িতেও দৈনন্দিন শিখন কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা সম্ভব। এর মাধ্যমে শিখন কার্যক্রম কেবল শ্রেণিকক্ষের গণ্ডির মধ্যে থাকবে না। এই কাজে অভিভাবকদেরও ভূমিকা থাকবে। এভাবে শিক্ষার্থীরা দ্রুত সময়ে শিখন ঘাটতি পূরণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে।

প্রথম আলো: করোনাকালের অভিজ্ঞতায় ভবিষ্যতে কি করা উচিত?

এম. তারিক আহসান: করোনাকালের অভিজ্ঞতাকে মাথায় রেখে শিক্ষাক্রমকে নতুনভাবে সাজানো প্রয়োজন। এখন শিক্ষাক্রমগুলো যেভাবে গতানুগতিক পদ্ধতিতে পরিচালনা করি, সেখানে বিদ্যালয়, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর স্বাধীনতা কম।এই স্বাধীনতা যখন বিদ্যালয় পর্যায়ে দিতে পারব, তখনই কিন্তু নমনীয় চর্চাগুলো করা সম্ভব। আমি আশাবাদী আমাদের নতুন শিক্ষাক্রমের রূপরেখার আলোকে যে বিস্তারিত শিক্ষাক্রম, বই ও শিক্ষক নির্দেশিকা তৈরি হচ্ছে সেখানে নমনীয় চর্চার সব সুবিধা রাখা হয়েছে। কাজেই ভবিষ্যতে যে শিক্ষাক্রম শিক্ষার্থীদের কাছে যাচ্ছে সেটি জরুরি সমস্যা মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত। আশা করি, করোনাকালীন শিক্ষা থেকে ভবিষ্যতে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিকভাবে পরিচালনা করে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য যোগ্য করে গড়ে তুলতে পারব।

শিক্ষা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন