বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

না হয় লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করা সম্ভব নয়। এগুলো মোটাদাগে জাতীয় প্রেক্ষাপট। আবার বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যদি বলি, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবকে মাথায় রেখে সারা পৃথিবী এখন দক্ষতা ও যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম প্রণয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ২০১১ সালে যোগ্যতার যে ধারণা ছিল, এখন তার বেশির ভাগই পরিমার্জিত হয়েছে। এখন পারদর্শিতার ওপর জোর দেওয়া জরুরি। শুধু মুখস্থনির্ভরতা জ্ঞান অর্জন করিয়ে শিক্ষার্থীদের বিশ্ববাজারের জন্য তৈরি করা যাচ্ছে না। এগুলোর সঙ্গে নতুনভাবে যোগ হয়েছে করোনা পরিস্থিতি। এই অতিমারির কারণে ভাবিয়ে তুলছে, আমরা অতীতে যেভাবে চলেছি, তার অনেক কিছুই কাজ করছে না। এ জন্য বিকল্প ধারায় যেতে হবে।

আমাদের আশপাশের দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখব, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান শিক্ষাক্রম পরিমার্জন করেছে। পৃথিবীর ১০২টি দেশের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫১টি দেশ শিক্ষাক্রম পরিমার্জনা করে পারদর্শিতাভিত্তিক শিক্ষাক্রমের দিকে যাচ্ছে। এসব জাতীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের শিক্ষাক্রমও পরিমার্জন করে যুগোপযোগী করা হচ্ছে।

প্রথম আলো: বিদ্যমান শিক্ষাক্রম কি যথেষ্ট নয়? বিদ্যমান শিক্ষাক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা কেউ কেউ বলছেন, এটিও ঠিকমতো বাস্তবায়ন করা গেলে শিক্ষায় অনেক ইতিবাচক প্রভাব পড়ত, কিন্তু ঠিকমতো বাস্তবায়িত হয়নি, আপনার মত কী?

এম তারিক আহসান: প্রথম কথা হলো, আগের শিক্ষাক্রম খারাপ বলে নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করা হয়, তা কিন্তু নয়। দ্বিতীয়ত, আজ থেকে ৯-১০ বছরে আগের যে বাস্তবতায় ২০১২ সালে বিদ্যমান শিক্ষাক্রমটি হয়েছিল, এখনকার পরিস্থিতি এক নয়, পরিস্থিতি বদলে গেছে। আবার তখন যোগ্যতার ধারণা ছিল অনেকটা কী শিখল, সেটার ওপর। কিন্তু গত ৯-১০ বছরের চর্চায় দেখা গেছে, আসলে কী শিখল বা শিখনফল অর্জন করল, সেটির মধ্যে যদি পারদর্শিতার বিষয়টি খুব সুন্দরভাবে উঠে না আসে এবং প্রয়োগমুখী দক্ষতা তৈরি না হয়, তাহলে সেই শিখন কাজে লাগবে না। সেটি জীবনমুখীও হয় না। এই ধারণাগত পরিবর্তনের জন্যও নতুন শিক্ষাক্রম দরকার ছিল।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি) ২০১৭ সাল থেকে তিনটি গবেষণা হয়েছে। তাতে বিদ্যমান শিক্ষাক্রমের কিছু চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবায়নে কিছু সীমাবদ্ধতার কথা এসেছে। শিখনের প্রক্রিয়া এবং মূল্যায়নের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল। আবার মুখস্থনির্ভরতা ও পরীক্ষানির্ভরতা কমানো যাচ্ছিল না। এ ছাড়া প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০১৩, ২০১৫ ও ২০১৭ সালে করা একটি ধারাবাহিক গবেষণায় দেখা যায়, অধিকাংশ প্রাথমিক শিক্ষার্থী যোগ্যতা অর্জন করতে পারছে না এবং যোগ্যতা অর্জনের ধারা বছর অনুযায়ী নিম্নমুখী। এসব গবেষণার মাধ্যমেও নতুন শিক্ষাক্রম তৈরির প্রয়োজনীয়তা বোঝা গেছে।

নতুন শিক্ষাক্রমের মূল বৈষম্য কী, বিদ্যমান শিক্ষাক্রমের সঙ্গে এর মূল পার্থক্য কোথায়?

এম তারিক আহসান: এই প্রথম প্রাক্‌-প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষাক্রমের রূপরেখা প্রণয়ন করা হলো। আগে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষাক্রম আলাদাভাবে হতো। আগে এক স্তর থেকে আরেক স্তরে যাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা হতো। নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীর শিখন ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। আবার দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে অভিন্ন বিষয়ে দক্ষ করে তুলতে সবাইকে অভিন্ন বিষয় পড়ানো হবে। এখনকার মতো নবম শ্রেণিতে গিয়ে বিভাগ বিভাজন হবে না। এটি হবে একেবারে একাদশ শ্রেণিতে (উচ্চমাধ্যমিক) গিয়ে। শিখন শেখানোর প্রক্রিয়াতেও বড় ধরনের পরিবর্তন থাকছে। আগে মুখস্থনির্ভরতা ছিল, এবার সেটা আর থাকবে না। বর্তমান মূল্যায়ন ব্যবস্থাটি পরীক্ষানির্ভর। নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীর যোগ্যতার পারদর্শিতা যাচাই করা হবে। এতে শিখনকালীন ধারাবাহিক মূল্যায়নই বেশি হবে। পরীক্ষানির্ভরতা কমবে।

নতুন শিক্ষাক্রমে দশম শ্রেণির আগে পাবলিক পরীক্ষা না থাকার কথা বলা হয়েছে, এর মানে কি পঞ্চম শ্রেণির প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী এবং অষ্টম শ্রেণির জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষা বাতিল হয়ে যাবে? বিষয়টি স্পষ্ট করে বলবেন কি?

এম তারিক আহসান: শিক্ষাক্রমের যে রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছে, তাতে এ ধরনের (প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী, জেএসসি) পাবলিক পরীক্ষার কোনো প্রস্তাবনা নেই। আমরা বলেছি, শিখনকালীন মূল্যায়ন (ধারাবহিক মূল্যায়ন) ও সামষ্টিক মূল্যায়নকে (পরীক্ষা) একত্র করে শিক্ষার্থীর যোগ্যতার পারদর্শিতাকে পরিমাপ করব। সেই হিসেবে এ ধরনের পাবলিক পরীক্ষার কোনো অস্তিত্ব থাকার কথা নয়। তাই আমি বলব, শিক্ষাক্রমের রূপরেখা অনুযায়ী ২০২৩ সাল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী এবং জেএসসি পরীক্ষা বাদ দেওয়া উচিত। তবে এই পরীক্ষার বিষয়টির জন্য যেহেতু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন, তাই সরকারকে এসব পরীক্ষা বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত শিগগিরই নেওয়া উচিত।

এর আগেও তো একবার এ ধরনের শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করা হয়েছিল, বিশেষ করে প্রাথমিকে, কিন্তু বাস্তবায়ন হলো না কেন?

এম তারিক আহসান: পরিকল্পনাজনিত বিষয়টিতে সঠিকভাবে গুরুত্ব না দিলে অনেক সময় দেখা যায়, বড় ও সুন্দর পরিকল্পনাও বাস্তবায়নের দিকে যায় না। তাই এ ধরনের পরিবর্তনে বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় জোর দিতে হয়। এ জন্য শিক্ষাক্রম প্রণয়নের সঙ্গে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার পরিকল্পনাও একই সঙ্গে প্রণয়ন প্রয়োজন।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন, নতুন শিক্ষাক্রম অনেক ভালো, কিন্তু বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ হবে, আপনি কি মনে করেন?

এম তারিক আহসান: যেকোনো পরিবর্তন আনতে হলে চ্যালেঞ্জ থাকবেই। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন অপরিহার্য, এটি আমরা সবাই মানি। এখানে উল্লে­খ্য, নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নের কাজটি হঠাৎ করে আসেনি। পাঁচ বছরের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এটি এসেছে। এটি করতে গিয়ে প্রাক্প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত হলো, এই প্রথম কোনো শিক্ষাক্রমের রূপরেখায় বাস্তবায়ন পরিকল্পনাটি বড় অংশজুড়ে আছে। সেখানে বলা আছে, ২০২২ সাল থেকে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে ২০২৭ সালে গিয়ে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত তা পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়িত হবে। এ লম্বা সময়ে ধাপে ধাপে বিভিন্ন স্তরে এটি বাস্তবায়িত হবে। বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষাব্যবস্থা—সবাইকে কীভাবে একই সঙ্গে এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো যায়, সেটি মাথায় রেখে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটি করা হয়েছে। তৃতীয়ত বাস্তবায়ন যখন হচ্ছে, তখন পুরো ব্যবস্থাটি তৈরি করা দরকার। এখানেও শিক্ষক ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনাকে কীভাবে ধীরে ধীরে তৈরি করা হবে, সেসব বিষয়ে বড় ধরনের সুপারিশ আছে। আগেই বলেছি, এ শিক্ষাক্রমের বড় শক্তি হলো, পাঁচ বছর প্রস্তুতি নিয়ে করা হয়েছে। এ জন্য কতগুলো গবেষণার ফল হাতে আছে। ধারাবাহিক মূল্যায়নের বিষয়ে প্রাথমিকে দুই বছর পরীক্ষামূলকভাবে দেখাও হয়েছে। এখন এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মনোযোগী হতে হবে।

আমরা অতীতে শিক্ষার অনেক ভালো সিদ্ধান্ত ঠিকমতো বাস্তবায়ন হতে দেখি না, যেমন জাতীয় শিক্ষানীতি, সৃজনশীল শিক্ষা, কারণ কী?

এম. তারিক আহসান: পরিকল্পনা যদি সামগ্রিক না হয়, তাহলেই হোঁচট খাওয়ার ভয়টি বেশি থাকে। বিভিন্ন উপাদানকে মালা গাঁথার মতো করে কাজটি করতে হয়। না হয় মালা সুন্দর হবে না। সেটি করতে না পারলেই বাস্তবায়নে ঝুঁকি তৈরি হয়। বিচ্ছিন্নভাবে ছোট ছোট অংশে পরিবর্তন আনলে আসলে তার সুফল পাওয়া যায় না।

আগামী বছর থেকে প্রথম শ্রেণি ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে পরীক্ষামূলকভাবে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হচ্ছে, এর মানে এখনই নতুন বই লিখতে হবে। কিন্তু এত অল্প সময়ে গুণগত মানসম্পন্ন পাঠ্যবই লেখা কি সম্ভব?

এম তারিক আহসান: খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আসলেই এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জকে বিবেচনায় রেখে এনসিটিবিসহ যাঁরা এই শিক্ষাক্রম প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত, তাঁরা সবাই বেশ কিছু পরিকল্পনা নিয়ে ভাবছেন। পাঁচ বছরের প্রস্তুতি বই তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে। এটি বড় শক্তি। বইয়ে আগের মতো মুখস্থনির্ভরতা বিষয় থাকবে না। বইগুলো হবে ‘রিসোর্স বুক ও ওয়ার্কবুক’। বই শিক্ষার্থীর জ্ঞান অর্জনের বিভিন্ন উৎস সম্পর্কে ধারণা দেবে এবং সেগুলো থেকে কীভাবে জ্ঞান অর্জন করে তা প্রয়োগ করতে হয়, সেই ধারণাও দেবে। ফলে বই তথ্যের ভারে ভারাক্রান্ত হবে না। এর সঙ্গে থাকবে সমৃদ্ধ ‘শিক্ষক গাইড’। এই শিক্ষক গাইডের মাধ্যমে ধারণা দেওয়া হবে, কীভাবে সহায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে শিক্ষার্থীর যোগ্যতা অর্জনের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। আশা করা যাচ্ছে, বই তৈরিতে সমস্যা হবে না। তবে পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ও চিন্তায় আছে। সেটি হলো, যদি খুব বেশি চ্যালেঞ্জ হয়, তাহলে ধাপে ধাপে বই দেওয়া। সেই চিন্তাও আছে, হয়তো প্রথম ছয় মাসে কতটুকু শিখবে, সেই পরিমাণ বইয়ের বিষয়বস্তু প্রথমে দেওয়া এবং পরবর্তীকালে বাকি অংশ দেওয়া। আর আগামী বছর তো পরীক্ষামূলকভাবে নির্ধারিত কিছুসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হচ্ছে, ফলে বই নিয়ে কোনো অসুবিধা হবে না বলেই মনে করি।

নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে কী কী করা উচিত। একেবারে সুনির্দিষ্টভাবে বলবেন কি?

এম তারিক আহসান: প্রথমেই বলব, শিক্ষাক্রম রূপরেখায় যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেটিকে অনুসরণ করে বিস্তারিত শিক্ষাক্রম প্রণয়ন, শিক্ষক গাইডসহ অন্যান্য উপকরণ এবং সেই সঙ্গে পাঠ্যবই তৈরির কাজে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে টিমওয়ার্ক করতে হবে। এটি বিচ্ছিন্নভাবে করতে গেলে আবারও ব্যবধান তৈরির ভয় রয়েছে। দ্বিতীয়ত শিখন-শেখানোর প্রক্রিয়াগুলো ধীরে ধীরে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং এলাকার মানুষকে অবগত করা যেতে পারে। শিক্ষক প্রশিক্ষণের যে মহাপরিকল্পনার সুপারিশ করা হয়েছে, তা দ্রুত বাস্তবায়ন শুরু করা দরকার। যেহেতু এটি বড় ধরনের পরিবর্তন, তাই এটি সম্পর্কে মানুষকে জানানো খুব জরুরি। পাবলিক পরীক্ষা কমানোর উদ্যোগ এখনই শুরু করতে হবে। সর্বোপরি বাস্তবায়ন পরিকল্পনাগুলো ঠিকমতো ও সময়মতো বাস্তবায়ন করতে হবে।

আপনাকে ধন্যবাদ।

এম তারিক আহসান: আপনাকেও ধন্যবাদ।

শিক্ষা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন