৫ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হলো চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম সমাবর্তন। পুরোদস্তুর প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলো একঝাঁক তরুণ প্রাণের। তাঁদের মধ্যে চারজন পেয়েছেন স্বর্ণপদক। মেধাবী এই চার প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলেছেন মো. কামরুজ্জামান।

দক্ষ প্রকৌশলী গড়ার স্বপ্ন

default-image

নটর ডেম কলেজে পড়ার সময় থেকেই পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল ই এম কে ইকবাল আহমেদের। মনে মনে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন, প্রকৌশলী হবেন। ইকবাল আহমেদের স্বপ্নটা পূর্ণতা পেয়েছে। ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) থেকে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগে স্নাতক হয়েছেন তিনি। সমাবর্তনে পেয়েছেন স্বর্ণপদক।
অধ্যবসায় আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে আটটি সেমিস্টারের সাতটিতেই প্রথম হয়েছিলেন। ক্লাসের এই ‘ফার্স্ট বয়’ যে শিক্ষক হতে যাচ্ছেন, সেটা নিশ্চয়ই তাঁর সহপাঠীরা আগে অনুমান করতে পেরেছিলেন। চুয়েটের টানে শিক্ষাজীবন শেষে এখানেই ‘শিক্ষকজীবন’ শুরু হয়েছে ইকবাল আহমেদের। ২০১৭ সালে তিনি প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগে।
কোনো পুরস্কার পেলে অনুভূতি জানতে চাওয়াটা রীতির মধ্যে পড়ে। ইকবাল আহমেদের কাছে তাই আমাদেরও প্রথম প্রশ্ন ছিল, ‘কেমন লাগছে?’ বললেন, ‘এই অর্জন আমাকে আনন্দ দেয় ঠিকই। কিন্তু গর্বিত হব তখন, যখন আমার শিক্ষার্থীরা দক্ষ প্রকৌশলী হয়ে দেশ ও জাতির সেবা করবে। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। দেশের জন্য দক্ষ প্রকৌশলী তৈরি করার কার্যক্রমের কিছুটা অংশীদার হওয়াই আমার লক্ষ্য।’ জানিয়ে রাখি, ২০১৭ সালে তড়িৎ ও কম্পিউটার কৌশল অনুষদ থেকে সর্বোচ্চ সিজিপিএ অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক পেয়েছেন তিনি।
কিন্তু যাত্রা তো এখানেই শেষ নয়। বর্তমানে চুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগে স্নাতকোত্তর করছেন। গবেষণা করছেন থিন ফিল্ম ফটোভোল্টিক সেলের ওপর। ভিনদেশে উচ্চতর গবেষণা সম্পন্ন করে ফিরে এসে দেশ ও জাতির স্বার্থে কাজ করতে চান তিনি।

কোয়ান্টাম কম্পিউটার যখন গবেষণার বিষয়

default-image

শুনতে অনেকটা বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো মনে হতে পারে। তবু রুবায়া আবসারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার আগে সাধারণ কম্পিউটার আর কোয়ান্টাম কম্পিউটারের পার্থক্যটা একটু বলে নেওয়া প্রয়োজন। সাধারণ কম্পিউটার যেখানে প্রতিবার ০ অথবা ১ ব্যবহার করে, সেখানে কোয়ান্টাম কম্পিউটার একই সময়ে একসঙ্গে ০ ও ১—দুটিরই প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। সহজ করে বললে, যে হিসাব করতে সাধারণ কম্পিউটারের ১০ বছর লাগবে, কোয়ান্টাম কম্পিউটার সেটির সমাধান করবে মাত্র ২০০ সেকেন্ডে! এই আশ্চর্য রহস্য নিয়েই গবেষণা করছেন চুয়েটের ১২তম ব্যাচের (২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষ) শিক্ষার্থী রুবায়া আবসার।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ–রসায়ন (বায়োকেমিস্ট্রি) বিভাগের সাবেক অধ্যাপক নূরুল আবসার এবং তাহমিনা আবসারের একমাত্র মেয়ে রুবায়া আবসারের বেড়ে ওঠা বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি তাঁর প্রচণ্ড ঝোঁক ছিল, সঙ্গে অদম্য কৌতূহল। পদার্থবিজ্ঞান আর গণিত ছিল নেশার মতো। জানার ক্ষুধা মেটাতেই ২০১২ সালে ভর্তি হন চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগে।
২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে সর্বোচ্চ সিজিপিএ অর্জন করে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এবারের সমাবর্তনে স্বর্ণপদকজয়ীদের একজন তিনি।
রুবায়া আফসার এখন কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়াটারলু থেকে স্নাতকোত্তর করছেন। মেসেঞ্জারে কথা হলো তাঁর সঙ্গে। রুবায়া আফসার বললেন, ‘স্বর্ণপদক পাওয়া তো নিশ্চয়ই জীবনের একটা বড় পাওয়া। কিন্তু ৬ ডিসেম্বর এখানে আমার একটা পরীক্ষা আছে। তাই নিজ হাতে পদক গ্রহণ করতে পারছি না। এত বড় একটা সম্মানের দিনে উপস্থিত না থাকতে পারাটা একই সঙ্গে জীবনে বড় “না পাওয়া”ও হয়ে থাকবে।’ কোয়ান্টাম কম্পিউটার বিষয়ক গবেষণার মাধ্যমে প্রযুক্তিবিশ্বে বড় ভূমিকা রাখতে চান তিনি।

স্বপ্নের সিঁড়ি আকাশছোঁয়া

default-image

চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার স্বপন কুমার বড়ুয়া এবং শিপ্রা বড়ুয়ার একমাত্র সন্তান সঞ্চয় বড়ুয়া। একমাত্র সন্তান বলেই হয়তো বাবার একটু বেশি যত্ন, একটু বেশি শাসন ছিল। বাবা ফটিকছড়ি করোনেশন সরকারি মডেল উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। সন্তানের দিকে খেয়াল রাখতে ওই স্কুলেই ভর্তি করেন তাঁকে।
দেখতে দেখতে স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে সঞ্চয় বড়ুয়া ভর্তি হন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় প্রথম স্থান লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে প্রথম হওয়ার ধারাটা অব্যাহত রেখে বেশ কয়েকটি বৃত্তি পাওয়া ছাড়াও ২০১৭ সালে ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে চীনে শিক্ষামূলক ভ্রমণে গিয়েছিলেন।
২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে সর্বোচ্চ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতক শেষ করেছেন সঞ্চয়। পেয়েছেন রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক।
স্নাতক সম্পন্ন করার মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন সঞ্চয় বড়ুয়া। পরবর্তী সময়ে চুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগে এ বছরের জুলাই মাসে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। স্বপ্ন এখন বিজ্ঞানসাধনার। নতুন নতুন আবিষ্কার করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান তিনি।

শেখাতে চান কম্পিউটার কৌশল

default-image

সময়টা ২০১৩ সাল। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে তখনো পাঠ্য হিসেবে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি যোগ হয়নি। কিন্তু ঢাকা কলেজের ছাত্র রাশেদুর রহমানের আগ্রহ ছিল এ বিষয়েই। বাবা সাইদুর রহমান একপ্রকার বিরক্ত হয়ে বাজার থেকে প্রোগ্রামিংয়ের একটি বই কিনে দেন। সেদিন থেকে স্বপ্নের বীজ বোনা শুরু।
উচ্চমাধ্যমিকের পাট চুকিয়ে রাশেদুর ভর্তি হন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার কৌশল বিভাগে। আত্মবিশ্বাস আর সফলতার ক্ষুধা নিয়ে কাটিয়ে দেন চার বছর। অর্জন করেন ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের সর্বোচ্চ সিজিপিএ। এবারের সমাবর্তনে পেয়েছেন স্বর্ণপদক। কম্পিউটার কৌশলের জ্ঞান সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চান তিনি। তা ছাড়া উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণার জন্য যেতে চান বিদেশেও।
রাশেদুর বললেন, ‘স্বর্ণপদক পাওয়া অবশ্যই খুব আনন্দের ব্যাপার। কিন্তু গর্ব তো করব সেদিন, যেদিন প্রযুক্তিবিশ্বে বাংলাদেশ নেতৃত্ব দেবে, আর আমি নিজেকে এই অর্জনের সহযাত্রী হিসেবে খুঁজে পাব।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0