default-image

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগে আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবরক্ষণ বিভাগ। পাঁচ বছরের আর্থিক লেনদেন নিরীক্ষা করে দেখা গেছে, ৮৬ লাখ টাকার বেশি খরচের বিল–ভাউচার নেই। বড় খরচের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কমিটির অনুমোদন নেই। বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান একক সিদ্ধান্তে খরচ করেছেন। নিয়মবহির্ভূতভাবে ১৭ লাখ টাকা সম্মানীও নিয়েছেন তিনি। কেনাকাটায় ভ্যাট, করও দেননি।

বিভাগের বর্তমান চেয়ারম্যান খন্দকার ফারজানা রহমানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব পরিচালকের কার্যালয়ের অভ্যন্তরীণ অডিট শাখা এই নিরীক্ষা করে। ২০১৫ সালের ১ আগস্ট থেকে ২০২০ সালের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত ৫ বছর ১ মাস সময়ের লেনদেন খতিয়ে দেখা হয়। ১ মার্চ প্রতিবেদন জমা হয়।

২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠা থেকে গত বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক জিয়া রহমান। গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দায়িত্ব নেন খন্দকার ফারজানা রহমান।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে জিয়া রহমান গত সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, ’৭৩–এর অধ্যাদেশ অনুযায়ী বিভাগের হিসাব নিরীক্ষা করার এখতিয়ার চেয়ারম্যানের নেই। চেয়ারম্যান যে নিরীক্ষা করাচ্ছেন, তা বিভাগের কোনো শিক্ষক জানতেন না। কোনো কমিটিকেও জানানো হয়নি। চেয়ারম্যানের দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় তিনি যেসব কাগজপত্র বুঝিয়ে দিয়ে এসেছিলেন তার বড় অংশই ‘মিসিং’ বলে দাবি করেন জিয়া রহমান। পুরো প্রক্রিয়াটি তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও মানহানির জন্য করা হয়েছে বলে তাঁর দাবি।

নিয়মবহির্ভূতভাবে বিভাগের দুজন শিক্ষকের নামে ১ কোটি টাকার এফডিআর খোলা হয়েছে। কোনো ক্রয়েরই ভ্যাট ও কর দেওয়া হয়নি। ফলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ভ্যাট বাবদ প্রায় ৮ লাখ ৩৮ হাজার ২৭৩ টাকা এবং কর বাবদ ২ লাখ ৫৫৯ টাকা।

বর্তমান চেয়ারম্যান ফারজানা রহমান প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ বিভাগের কোনো হিসাব নিরীক্ষা হয়নি। তাই দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম মেনে তা করার উদ্যোগ নেন। নিরীক্ষা প্রতিবেদনটি গত সোমবার বিভাগের একাডেমিক কমিটিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে জিয়া রহমানও ছিলেন। তিনিসহ একজন শিক্ষক প্রতিবেদনটি গ্রহণ করেননি। বাকি দুজন শিক্ষক গ্রহণ করেছেন। কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিরীক্ষা প্রতিবেদনটি তাঁরা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষের কাছে পাঠাবেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সান্ধ্য কোর্সের সঙ্গে জড়িত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সম্মানী বা পারিশ্রমিক দেওয়ার কোনো নীতিমালা শুরুতে গ্রহণ করেনি এই বিভাগ। পরে নীতিমালা করা হলেও একাডেমিক কমিটিতে তা অনুমোদন করা হয়নি। এ খাতে নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা। আবার যখন নীতিমালা হয়েছে তখন চেয়ারম্যানের সম্মানী ভাতার ক্ষেত্রে সে নীতিমালা মানা হয়নি। অন্য বিভাগীয় চেয়ারম্যানরা সাধারণত তিন হাজার টাকা করে সম্মানী পান। কিন্তু জিয়া রহমান মোট ১৭ লাখ টাকা সম্মানী নিয়েছেন। বিভাগের সূত্র জানায়, বিভাগের একাডেমিক কমিটির সিদ্ধান্ত ছাড়াই তিনি সান্ধ্য কোর্সের পরিচালক হিসেবে ২৫ হাজার টাকা এবং চেয়ারম্যান হিসেবে অতিরিক্ত ২৫ হাজার টাকা করে নেন।

এ বিষয়ে জিয়া রহমান বলেন, ‘বর্তমান চেয়ারম্যানও একইভাবে দুই লাখ টাকা নিয়েছেন। পরে তিনি তা ফেরত দিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আমাকে ফেরত দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।’ বর্তমান চেয়ারম্যান ফারজানা রহমান বললেন, ‘এটা জিয়া রহমান যেভাবে শুরু করে গিয়েছিলেন, সেভাবেই চলছিল। কিন্তু নিয়মবহির্ভূত জানার সঙ্গে সঙ্গে আমি টাকা ফেরত দিয়ে দিই।’

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বিভাগের বিভিন্ন খাত ও প্রকল্পে অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা প্রকল্পের নামে ১ লাখ টাকা, ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামের নামে ৮ লাখ টাকা, বিভাগীয় শ্রেণি সংস্কারের নামে ৪২ লাখ টাকা, কম্পিউটার ল্যাব সংস্কারের নামে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর নামে সাড়ে ৫ লাখ টাকা, কনফারেন্সের অনুদান ৯ লাখ টাকা, আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজনে ১০ লাখ টাকা, ভারত ও ভিয়েতনাম ভ্রমণে ১১ লাখ টাকা, কম্পিউটার ও অন্য মালামাল ক্রয়ে ১২ লাখ ৩১ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়। কিন্তু এসব খরচের হয় ভাউচার নেই, না হয় যথাযথ অনুমোদন ছিল না, অথবা কোনো কমিটির মাধ্যমে টাকা ব্যয় হয়নি। যে ভাউচারগুলো পাওয়া গেছে, তার ৯৫ শতাংশ স্বাক্ষরহীন, টাকা গ্রহণের রসিদ নেই। ছয়টি চেকে ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে, খরচের ভাউচার নেই। এমনকি কোন খাতে ব্যয় হয়েছে, তা–ও জানা যায়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়মবহির্ভূতভাবে বিভাগের দুজন শিক্ষকের নামে ১ কোটি টাকার এফডিআর খোলা হয়েছে। কোনো ক্রয়েরই ভ্যাট ও কর দেওয়া হয়নি। ফলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ভ্যাট বাবদ প্রায় ৮ লাখ ৩৮ হাজার ২৭৩ টাকা এবং কর বাবদ ২ লাখ ৫৫৯ টাকা। পরীক্ষাসংক্রান্ত ব্যয়ে শিক্ষকদের সম্মানী থেকে ১০ শতাংশ হারে আয়কর কাটা হলেও তা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। ফলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে আয়কর বাবদ ১৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। আপ্যায়ন ও আনুষঙ্গিক ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকার সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি।

বিজ্ঞাপন

নিরীক্ষায় অনিয়ম পাওয়া গেলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত হিসাব পরিচালক মো. ইলিয়াছ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত করে। এরপর অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, খরচ বিভাগ করুক বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ করুক, এটা জনগণের টাকা। প্রতিটি পয়সার হিসাব থাকা উচিত, না থাকলে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে অপরাধ। আর অপরাধ হলে, অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনেই এর প্রতিকার আছে। দায়ী ব্যক্তির কাছ থেকে সেই টাকা আদায় করতে হবে এবং শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে।

শিক্ষা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন