অনন্য, অদম্য মেধাবী

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের মধ্যপাড়া এলাকার প্রতিমা রানী দাসের একমাত্র সন্তান শোভা রানী। জন্মের পাঁচ–ছয় মাস আগেই বাবা বুলু চন্দ্র লোদকে হারান। সেই থেকে শোভাকে নিয়ে মায়ের সংগ্রাম শুরু। স্বজনদের কাছ থেকে বিতাড়িত হয়ে মা-মেয়ে নানা জায়গায় ঘুরেছেন। শেষ পর্যন্ত মেয়ের চিন্তা করেই দ্বিতীয় বিয়ে করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চলে আসেন প্রতিমা। কিন্তু সেখানেও ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়নি। সহ্য করতে হয় স্বামীর নিয়মিত নির্যাতন। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেই জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসিতে জিপিএ-৫ পান শোভা।

এসএসসির ফল প্রকাশের কয়েক দিন পর সৎবাবা আবার শোভাকে ঘর থেকে বের করে দেন। নিয়াজ মুহাম্মদ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সহিদুল ইসলামের কাছ থেকে এসব জানতে পেরে এগিয়ে আসে প্রথম আলো। ব্র্যাক ব্যাংক-প্রথম আলো ট্রাস্ট অদম্য মেধাবী শিক্ষাবৃত্তির জন্য মনোনীত হন শোভা রানী। একাদশ শ্রেণিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে সহায়তা করেন সহযোগী অধ্যাপক হামজা মাহমুদ। এ ছাড়া বই-খাতা-কলম দেন প্রথম আলো বন্ধুসভার সদস্যরা।

শোভা রানী বলছিলেন, ‘নিরুপায় হয়ে আমার কথা ভেবেই মা বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু আমাদের কপালে নির্যাতন ছাড়া কিছু জোটেনি। তবু আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। কারণ, তিনি আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন।’

বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় ১ হাজার ৩৬ জন শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দিয়েছে প্রথম আলো ট্রাস্ট। এই অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে শোভাই প্রথম বুয়েটে পড়ার সুযোগ পেলেন। স্নাতক পর্যায়েও তাঁর বৃত্তি অব্যাহত থাকবে।

জীবনজুড়ে সংগ্রাম

শোভাকে পড়াশোনা করাতে দিনের পর দিন মুখ বুজে কাজ করেছেন তাঁর মা। আচারের এক হাজার প্যাকেট বানালে ৩০ টাকা, এক কেজি চকলেট বানালে ১ টাকা করে পেতেন। শোভাও মাকে সাহায্য করেছেন এই কাজে। একসময় মুদিদোকানে কাজ করেছেন। সপ্তম শ্রেণিতে শুরু করেন টিউশনি। কোনোমতে মা-মেয়ের চলে যেত।

শোভা বলেন, ‘নবম শ্রেণিতে সৎবাবা আমার পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন। স্থানীয় একটি কোচিং সেন্টারের শিক্ষকেরা সহায়তা করেন, অনুপ্রেরণা দেন। এসএসসি পর্যন্ত তাঁরা বিনা পয়সায় পড়িয়েছেন। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে কেন্দ্রবিন্দু একাডেমিক কেয়ার বিনা মূল্যে পড়িয়েছে, অর্থ সহায়তা দিয়েছে। সঙ্গে প্রথম আলো ট্রাস্টের বৃত্তি তো ছিলই। তাই সাহস পেয়েছি। পড়াশোনা, মেসের ভাড়া, খাওয়া-দাওয়া, মায়ের চিকিৎসা—সব সামলাতে গিয়ে ভেঙে পড়েছি অনেকবার, কিন্তু হাল ছাড়িনি।’

ভাড়া বাসার দুই রুমের একটিতে থাকতেন শোভা। কিন্তু সেই রুমের ভাড়া দিতেন না বলে বাড়ির মালিক ঘরের বাতি জ্বালাতে দিতেন না। পাশের ঘরের আলোয় বসে পড়তে হতো শোভাকে। মাঝেমধ্যে বাড়ির একটা ফাঁকা জায়গায় বসে পড়েছেন। একটু বড় হওয়ার পর বখাটেদের উৎপাতে সেখানেও বসা যেত না। এইচএসসির সময় ছাদে বসে পড়ালেখা করেছেন তিনি।

করোনাকালে মেস বন্ধ হলো, টিউশনিও বন্ধ হলো। বাধ্য হয়ে আবার সৎবাবার কাছে ফিরেছিলেন শোভা ও তাঁর মা। সন্ধ্যায় তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তেন। ভোরে উঠে শুরু হতো পড়ালেখা। শোভা বলছিলেন, ‘অনেকে বলে, করোনার সময় পড়াশোনার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমি তা মনে করি না। পরিস্থিতি আমাকে যতটুকু সুযোগ দিয়েছে, আমি তার সর্বোচ্চ ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি। মনকে বুঝিয়েছি—১ মাস পর হোক, ১০ দিন পর হোক, পরীক্ষা তো হবেই। আমি যেন সেই সময়ের জন্য প্রস্তুত থাকি।’

প্রতিকূলতাই প্রেরণা

শোভার কথায় বারবার ঘুরেফিরে এল মায়ের কথা। অদম্য মেধাবী এই শিক্ষার্থী বলছিলেন, ‘আমার মা অসুস্থতা নিয়েও দিনের পর দিন কাজ করেছেন—আমার জন্য। ছোটখাটো বিষয়ে তাঁকে অপমানিত হতে হয়েছে। আমি যখন গর্ভে, তখন লোকে বলত, “ছেলে হলে বিদেশে গিয়ে মায়ের জন্য কিছু করতে পারবে।” আমি তাই সব সময় ভাবি, আমি আমার মায়ের যোগ্য মেয়ে। একটা ছেলে হলে মায়ের জন্য যা করত, মেয়ে হয়ে আমি তার চেয়েও বেশি করব।’

সব সময় ঝগড়া-কলহ দেখে বড় হয়েছেন। শোভার মনে হতো, পড়ালেখাই তাঁর একমাত্র সম্বল। কারণ, পড়ালেখায় ভালো করতে না পারলে নিশ্চয়ই বাড়ি থেকে বিয়ে দিয়ে দেবে। তাই যত বেশি বাধা এসেছে, পড়ায় তত মন দিয়েছেন তিনি।

প্রথম আলো ট্রাস্ট, বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষকসহ নানা সময়ে যেসব প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি তাঁকে সহায়তা করেছেন, সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শোভা রানী বলেন, ‘বুয়েটে পড়ার স্বপ্ন সত্যি হচ্ছে। প্রকৌশলী হয়ে আমি আরও শোভাদের পাশে দাঁড়াতে চাই। জীবনে কত ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে, সব বলতে চাই না। পারবও না। এখন শুধু তাকাতে চাই সামনের দিকে।’