১৯৯৮ সালে অধ্যাপক মোহাম্মদ শফির নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের যাত্রা শুরু হয়। প্রথমে বিভাগটির নাম ছিল অ্যাকুয়াকালচার অ্যান্ড ফিশারিজ বিভাগ। পরে তা পরিবর্তন করে মাৎস্যবিজ্ঞান করা হয়। নিজস্ব ভবন করতে ২০০০ সালে মাৎস্যবিজ্ঞান বিভাগকে ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সেই অর্থে পাঁচতলার ভিত্তিসহ একতলা পর্যন্ত নির্মাণ করা সম্ভব হয়। অর্থাভাবে প্রায় ১৫ বছর আটকে ছিল বিভাগটির নিজস্ব ভবনের সম্প্রসারণের কাজ। ২০১৪ সালে নিজের সঞ্চিত অর্থ থেকে দুই দফায় প্রায় ৭০ লাখ টাকা দিয়ে থমকে থাকা সেই কাজ আবার শুরু করেন অধ্যাপক শফি। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও সেখানে অর্থায়ন করে। কার্জন হল এলাকায় বিভাগটির বর্তমান পাঁচতলা ভবনটির নামকরণ করা হয়েছে ‘অধ্যাপক মোহাম্মদ শফি ভবন’।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে কার্জন হলে তাঁর অর্থে প্রতিষ্ঠিত অধ্যাপক মোহাম্মদ শফি ভবনের সামনে নিয়ে আসা হয় মরদেহ। সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে মহান এই শিক্ষকের প্রথম জানাজা হয়। পরে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফনের জন্য মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার একটি মসজিদের সামনে গতকাল বাদ জোহর দ্বিতীয় জানাজা শেষে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয় অধ্যাপক শফিকে।

মাৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম ব্যাচের ছাত্র মো. মনিরুল ইসলাম অধ্যাপক মোহাম্মদ শফির সরাসরি ছাত্র। তিনি এখন বিভাগটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, অধ্যাপক মোহাম্মদ শফি ছিলেন একজন সত্যিকারের শিক্ষক ও শিক্ষাবিদ। শিক্ষা ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কল্যাণই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত। মাৎস্যবিজ্ঞান বিভাগকে নিজের হাতে সাজিয়েছেন। তিনি ৭০ লাখ টাকা দান না করলে হয়তো আমাদের বিভাগের সম্প্রসারণের কাজটি করা যেত না৷ অবসরের পরও দীর্ঘদিন তিনি বিভাগে ক্লাস নিয়েছেন। তবে ৩-৪ বছর ধরে শারীরিক নানা জটিলতায় ক্লাস নিতে পারেননি। দেশের মৎস্য খাতের উন্নয়নে অধ্যাপক শফির ভূমিকা অসামান্য। তাঁর লেখা কয়েকটি বই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য।

মনিরুল ইসলাম জানালেন, অধ্যাপক মোহাম্মদ শফি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। দুই ছেলে বিদেশে থাকেন আর মেয়ে স্বামীর সঙ্গে দেশেই থাকেন। স্ত্রীও এখন ছেলেদের সঙ্গে বিদেশে আছেন। কয়েক মাস আগে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর প্রবীণ এই অধ্যাপকের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অকেজো হয়ে যায়। করোনা থেকে সেরে উঠলেও গত দুই মাস ধরে তিনি আইসিইউতে ছিলেন। পরে সোমবার রাত ১২টা ১০ মিনিটে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।

অধ্যাপক মোহাম্মদ শফি ১৯৬৯ সালে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশে ফিরে ১৯৭২ সালে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরের বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন তিনি। চার বছরের অবৈতনিক ছুটি নিয়ে ১৯৭৮ সালে ইরাকের বাগদাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে মাছের ওপর গবেষণা করেন। দেশে ফিরে আবার বিভাগে যোগ দেন।

অধ্যাপক শফির মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান। এক শোকবাণীতে উপাচার্য বলেছেন, অধ্যাপক মোহাম্মদ শফি ছিলেন একজন প্রখ্যাত মৎস্যবিজ্ঞানী এবং নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ও গবেষক। মাৎস্যবিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণায় অসাধারণ অবদানের জন্য গুণী এই অধ্যাপক স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

ক্যাম্পাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন