বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনেও সহায়ক বইয়ের নামে ‘গাইড বই’ এবং এদিক-ওদিক করে কোচিং–বাণিজ্যের বিষয়টিও রেখেই দেওয়া হয়েছে। এখন প্রস্তাবিত ‘প্রাথমিক শিক্ষা বোর্ড আইন-২০২১’–এর মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা বোর্ড গঠন করে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষা স্থায়ী রূপ দিলে শিক্ষার্থীদের কোচিং ও গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে। এর ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর লাভ হবে গাইড বই ও কোচিং–বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা। অনেকেই মনে করছেন, এই আইনের মাধ্যমে স্বার্থান্বেষী কোনো কোনো মহলকে লাভবান করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

প্রাথমিক শিক্ষা হলো একজন শিক্ষার্থীর জীবনের মূলভিত্তি, সেটা যদি মুখস্থনির্ভর হয়ে যায়, সৃজনশীল না হয়, তাহলে শিশুরা আগামী দিনে আমাদের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে তেমন অবদান রাখতে পারবে না। ফলে সমস্যা বাড়বে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের নানাভাবে প্রতিযোগিতামূলক পড়াশোনার দিকে ঠেলে দিয়েছি। ভালো জিপিএ অর্জনের জন্য একজন শিশু সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরই পড়াশোনা শুরু করে। বাসে-রিকশায় অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পথেও অনেক শিশুর পড়াশোনা চলতে থাকে। স্কুলের পড়া তো আছেই। এরপর কোচিং, তারপর আবার বাড়ি ফিরে গৃহশিক্ষকের জন্য অপেক্ষা করে শিশুরা। এর মধ্যে আবার পড়ার জন্য মূল বই বাদ দিয়ে বিভিন্ন প্রকাশনীর গাইড বই ‘প্রেসক্রিপশন’ আকারে পায় শিক্ষার্থীরা। প্রয়োজন না হলেও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চাপিয়ে দেয় এসব নোট-গাইড।

মুখস্থনির্ভরতা, গাইড বই অনুসরণ, কোচিং এবং প্রাইভেট পড়ার ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পাঁয়তারা সব সময়ই ছিল। এর মধ্যে এখন পিইসিই পরীক্ষা স্থায়ী রূপ পেলে আগের মতো প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো গর্হিত অসাধুতার সঙ্গেও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে। দেখেশুনে মনে হচ্ছে, এই আইন প্রণয়নের মাধ্যমে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল হয়তো শতকোটি টাকার গাইড বই বা কোচিং–বাণিজ্যকেই পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করছে।

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী, পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষাকে পাবলিক পরীক্ষা হিসেবে গণ্য করা হয়নি, বরং এই পরীক্ষার বিকল্প হিসেবে উপজেলা, পৌরসভা বা থানা পর্যায়ে সবার জন্য অভিন্ন প্রশ্নপত্রে সমাপনী পরীক্ষা নেওয়ার কথা বলা আছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুব স্পষ্ট করে শিক্ষার্থীদের ওপর পরীক্ষার বোঝা কমানোর ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সময় বলেছেন। তার প্রতিফলন আমরা নতুন শিক্ষাক্রমের রূপরেখায় দেখতে পেয়েছি, যেখানে পিইসি এবং জেএসসি পরীক্ষার মতো কোনো পরীক্ষা রাখা হয়নি। যা, নাগরিক সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সবার কাছে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমন আচরণ আমাদের উদ্বিগ্ন করছে।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রায় এক শতাব্দী আগে ‘তোতাকাহিনী’ লিখে গিয়েছিলেন।

মূর্খ পাখিকে শিক্ষিত করার প্রজেক্ট দিয়ে মন্ত্রী, নায়েব থেকে শুরু করে রাজার আশপাশের লোকজনের আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়। অথচ আসল উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয় না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চোখে আঙুল দিয়ে সেই সময়ই মুখস্থনির্ভর তোতা পাখি তৈরির শিক্ষাব্যবস্থার নিন্দা করেছেন। আজকের শিক্ষাব্যবস্থায় শিশুরা শৈশবের চঞ্চলতা হারিয়েছে। পাঠ্যপুস্তকের চাপে ভারাক্রান্ত হয়ে তারা নাচ-গান, খেলাধুলাসহ সব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যার ফলে সমাজে মাথাচাড়া দিচ্ছে উগ্রতা আর অসহিষ্ণুতা। যুগোপযোগী বিজ্ঞানমনস্ক একটি আধুনিক জাতি গঠন হুমকির মুখে পড়েছে। আমরা তোতা পাখি তৈরির এক নোংরা খেলায় মেতে উঠেছি।

কি রাষ্ট্র, কি শিক্ষক, কি অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সব ক্ষেত্রেই এই প্রয়াস অব্যাহত। ছোট্ট শিশুদের পিঠের ব্যাগের ওজন এত বেশি যে তারা মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারে না। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য চাই আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা গ্রহণ। উন্নত বিশ্বের স্কুলগুলোতে শিশুরা প্রথম দিনে গিয়ে একে অপরের সঙ্গে খেলাধুলা করতে করতে পরিচিত হয়। স্কুলগুলোতে শিশু মনোবিজ্ঞানীরা তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে শিক্ষার্থী অনুযায়ী তারা শিখন প্রদান করে থাকেন। আর আমাদের দেশে মনোবিজ্ঞান থেকে পাস করা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী বের হলেও তাঁদের কাজে লাগাচ্ছি না।

করোনায় বিপর্যস্ত পুরো দেশ। পুরো শিক্ষাপঞ্জি এলোমেলো। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম বেড়েছে। নতুন করে অনেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। যেখানে দেশের মানুষ নিজেদের জীবন ধারণের রসদ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে নতুন করে ‘প্রাথমিক শিক্ষা বোর্ড আইন’ করে বোর্ড গঠনের মধ্যে দিয়ে পিইসি পরীক্ষা স্থায়ী করা হলে তা শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের গাইড কেনা, কোচিংয়ের খরচ, প্রাইভেট টিউশনের খরচের দিকে ঠেলে দেওয়া হবে, যা ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘বোর্ডের সুফল–কুফল নিয়ে লেখালেখি হলে জাতি যদি না চায়, তখন তা পরিবর্তনও হতে পারে।’ তাঁর এ বক্তব্যকে আমরা সাধুবাদ জানিয়ে বলতে চাই, ইতিমধ্যে যেহেতু প্রাথমিক শিক্ষা বোর্ড স্থাপনের ব্যাপারে দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বিশেষজ্ঞ এবং গণমাধ্যম আপত্তি জানাচ্ছে, তাই এই মেরুদণ্ড ধ্বংসকারী এই সিদ্ধান্ত থেকে মন্ত্রণালয় সরে শিক্ষাকে আনন্দময় করে তোলা হোক।

*লেখক: ড. মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষক ও লেখক। [email protected] com

পরীক্ষা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন