default-image

জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চার যেকোনো বিশ্ব প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের তরুণেরা যে নিজেদের অবস্থান পাকা করতে শুরু করেছেন, সে কথার আবার জানান দিল মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটির) দল ‘মঙ্গলবারতা।’ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মার্স সোসাইটি আয়োজিত ‘ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ’ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ৪৪টি দলের মধ্যে নবম স্থান অর্জন করেছে ‘মঙ্গলবারতা’, যা সমগ্র এশিয়ার মধ্যে সেরা সাফল্য। এই দলটির পেছনে ছিল কানাডার ম্যাকগিল, ভারতের আইআইটি, যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ও কর্নেল ইউনিভার্সিটির মতো বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তৈরি রোভার।
মঙ্গলবারতা দলের যেসব সদস্য যুক্তরাষ্ট্র ঘুরে এলেন, তাঁরা হলেন তানভীর আহমেদ, ইফফাতুর রিদওয়ান, ইসমাইল হোসেন, শাদমান সাকীব, সাদিয়া সায়ারা চৌধুরী, প্রমিত সাহা, শুভাশীষ রায় ও মোহাইমেন রহমান। দলের তিন সদস্য এ এস এম মহিউদ্দিন, মাঈনুল হাসান ও ইমতিয়াজ আবেদীন অনিবার্য কারণে দলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারেননি। দলের সবাই এমআইএসটি কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী।
গত ২৮-৩০ মে যুক্তরাষ্ট্রের ইউটা রাজ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে এই প্রতিযোগিতা। দেশে ফেরার পর জুনের শেষ সপ্তাহে কথা হলো এই দলের মেধাবীদের সঙ্গে।
‘আমাদের তৈরি রোভার বিশ্বসেরা ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের তৈরি রোভারের সঙ্গে মঙ্গল গবেষণাকেন্দ্রে একসঙ্গে চলবে—এমন একটা ভাবনা থেকেই এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার কথা ভাবি আমরা।’ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার একেবারে শুরুর গল্প বলছিলেন শাদমান সাকীব।
দলের নাম ‘মঙ্গলবারতা’ হলেও তাঁদের তৈরি রোভারের নাম ‘মায়া’। মঙ্গলবারতা দলের রোভার ‘মায়া’ কতটা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে দেশের জন্য মঙ্গলবারতা বয়ে আনল, সেই গল্প শোনান সহদলনেতা ইফফাতুর রিদওয়ান, ‘ধাপে ধাপে বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে আমাদের। সারা বিশ্ব থেকে রেজিস্ট্রেশন করা শতাধিক দলের মধ্য থেকে চূড়ান্তভাবে বাছাই করা হয় ২৩টি দলকে। সেই তালিকায় সগৌরবে স্থান করে নেয় মঙ্গলবারতা।’
এরপর মঙ্গলবারতা তৈরির সময়ের কষ্টকর দিনগুলোর গল্প শোনান ইসমাইল হোসেন, ‘প্রায় এক ফুট উঁচু রোভারটি তৈরি করতে দীর্ঘ ছয় মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে আমাদের।’
দলনেতা তানভীর আহমেদ বলেন, ‘এই প্রতিযোগিতাটি রোবটিক্স জগতে একটি মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতা। মঙ্গলগ্রহ থেকে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে বিজ্ঞানীদের গবেষণার কাজে পাঠানোর উপযোগী রোভার তৈরি করাই এই প্রতিযোগিতা আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। আমরা জানতাম, এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের বাঘা বাঘা শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাই নিজেদের প্রস্তুত করতে অসম্ভব কষ্ট স্বীকার করেছি।’
এমআইএসটির মঙ্গলবারতা দলের সদস্যদের কাছ থেকে জানা যায়, ১ ফুট উঁচু রোভারটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘মায়া’। এটি নিয়ন্ত্রণ করা যায় পাঁচ কিলোমিটার দূর থেকে। ছয় চাকাবিশিষ্ট এই রোভারের মূল বৈশিষ্ট্যই হলো এটা দুর্গম অঞ্চল, যেখানে মানুষের পক্ষে পৌঁছানো সম্ভব নয় সেখানে গিয়ে উদ্ধারকাজ ও বিভিন্ন গবেষণাকাজ সম্পন্ন করতে পারা। এর রয়েছে চার আঙুলবিশিষ্ট একটি হাত। ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সহনীয় এই রোভারটি আঁকাবাঁকা, উঁচু-নিচু পথ দিয়ে চলাচল করতে পারে।
এমআইএসটির কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আফজাল হোসেন ‘মঙ্গলবারতা’ দলের এমন সাফল্যে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের এত দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল তারা পেয়েছে, বিশ্বের অনেক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের দলকে পেছনে ফেলে তারা সেরা দশের ভেতর জায়গা করে নিয়েছে, যা এক বিশাল অর্জন।’
সৌরজগতের এক রহস্যময় গ্রহ মঙ্গল। তাকে নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই বিজ্ঞানীদের। আর মঙ্গল থেকে নানা তথ্য-উপাত্ত পৃথিবীতে এনে বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের খোরাক জোগাচ্ছে নানা ধরনের রোভার। কে জানে হয়তো বাংলাদেশের তরুণদের তৈরি এই রোভারই হবে সেই রোভারগুলোর একটি!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0