default-image

আন্দোলন করা ও তাতে সংহতি জানানোয় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষক ও দুই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সংগঠন ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক’। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের শাস্তি প্রত্যাহার করা না হলে নতুন কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংগঠনটি।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে আয়োজিত ‘শিক্ষার্থী-শিক্ষক-অভিভাবক প্রতিবাদ সমাবেশ’ থেকে এই সময় বেঁধে দেওয়া হয়। ‘খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রতিহিংসামূলক শাস্তি প্রত্যাহার এবং প্রশাসনের দুর্নীতি তদন্তের দাবিতে’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নেটওয়ার্কের ব্যানারে একযোগে এই কর্মসূচি পালন করা হয়।

রাজু ভাস্কর্যের সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান বলেন, একটি সমাজকে জ্ঞানভিত্তিক করে তুলতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সৃজনশীলতা। সৃজনশীলতার প্রথম শর্ত হচ্ছে প্রশ্ন। প্রশ্ন করার মধ্য দিয়ে সৃজনশীলতার বিকাশের যে চর্চা, সেটিকে আজ রোধ করা হচ্ছে। এমন একটি আমলাতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা যখন তৈরি হচ্ছে, তখন সৃজনশীলতা কিংবা জ্ঞানভিত্তিক সমাজের মতো শব্দগুলো ভণ্ডামি ছাড়া কিছু নয়। সেই মকারিরই (ভণ্ডামি) একটা পরিপূর্ণ বিকাশ ও প্রকাশ দেখা গেল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের আচরণ ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারে। একজন শিক্ষকের ব্যাপারে সিভিল সার্জনের কাছ থেকে মিথ্যা সনদ নিয়ে সুস্থ প্রমাণের চেষ্টাও চালানো হয়েছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ওই শিক্ষকদের মানবাধিকারও লঙ্ঘন করেছেন। এর তদন্ত হওয়া উচিত এবং এর দায়ে তাঁর শাস্তি হওয়া উচিত।

বিজ্ঞাপন

তানজীমউদ্দিন খান আরও বলেন, ‘খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি শাসনের মকারির (ভণ্ডামি) প্রকাশ দেখা যাচ্ছে। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম কিছু দেখা যাচ্ছে না। এ ধরনের অপকর্মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচানোর জন্য খুবই জরুরি। আগামী ৭ জানুয়ারির মধ্যে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করতে হবে। শরবত খাইয়ে আশ্বাস দিলে হবে না, আমরা আনুষ্ঠানিক প্রত্যাহার দেখতে চাই। সিন্ডিকেটকে অবৈধ ঘোষণা করা হোক। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন। তাঁর অপকর্মের তদন্ত হোক, সম্ভব হলে মামলাও করা হোক। এসব বিষয়ের সমাধান না করে তিনি যেন কোনো প্রশাসনিক ছাড়পত্র না পান। উপাচার্য বরাবর শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে আজ আমরা চিঠি দিচ্ছি। ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে দাবি না মানা হলে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্মার্থ না বুঝেই সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েছেন, এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০তম সমাবর্তনে অমর্ত্য সেন বলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হচ্ছে, ‘না’ বলতে শেখানো, যেকোনো অন্যায়-অন্যায্যতাকে চ্যালেঞ্জ করা। বলা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি চলবে না। রাষ্ট্র নিজেই একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যার ভেতরে দাঁড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব প্রতিষ্ঠান কাজ করে। রাজনীতি চলবে না, তাহলে কী চলবে? আন্তোনিও গ্রামসি বলেছিলেন, সারি সারি দালানকোঠা বিশ্ববিদ্যালয়ের থাকে, কারাগারেরও থাকে। একটি মানুষকে বন্দী করে, অন্যটি করে মুক্ত। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় কি কারাগার বা ক্যান্টনমেন্ট? ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কি সামরিক বাহিনীর জেনারেল যে মানুষ কথা বলতে পারবে না, আন্দোলন করা যাবে না?

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফায়েক উজ জামানকে উদ্দেশে রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, ‘খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে বলে দিচ্ছি, আমাদের দাবি যদি মানা না হয়, তাহলে প্রস্তুত থাকুন—আমরা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে আপনার কার্যালয় ঘেরাও করব।’

শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সমাবেশে বক্তব্য দেন বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর মোর্চা প্রগতিশীল ছাত্র জোটের সমন্বয়ক ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের (বাসদ) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (মার্ক্সবাদী) সাধারণ সম্পাদক রাশেদ শাহরিয়ার, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের (গণসংহতি আন্দোলন) কেন্দ্রীয় সভাপতি গোলাম মোস্তফা, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক দিলীপ রায়, গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের সভাপতি আরিফ মঈনুদ্দীন ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক অমল ত্রিপুরা।

প্রগতিশীল ছাত্র জোটের সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে রাষ্ট্র যেভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও আজ একই ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। শুধু একটা নৈতিক আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন একটি ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে। অরাজনৈতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি কায়েমি দখলদারত্বের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের জোটভুক্ত (ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ) বাংলাদেশ ছাত্রলীগ-বিসিএলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান ও বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অতুলন দাসও সমাবেশে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন। দুজনই ছাত্রলীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলোর সমালোচনা করেন। মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ যদি স্বচ্ছ হতো, তাহলে আমরা দেশে গণতান্ত্রিক ও মুক্তবুদ্ধিচর্চার বিশ্ববিদ্যালয় পেতাম।’ অতুলন দাস বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়কেই এখন বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফার সঞ্চালনায় সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম, ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুব, অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুশাদ ফরিদী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আদনান তূর্য বক্তব্য দেন। উপস্থিত ছিলেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সিরাজ সালেকীন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সৌম্য সরকার প্রমুখ।

উচ্চশিক্ষা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন