এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ–৫ বিজ্ঞান ও গার্হস্থ্য শাখায় ১,২৩,৬২০ জন মানবিক, ইস.শিক্ষা ও সংগীত শাখায় ১৯,৬৬৪ জন ব্যবসায় শিক্ষায় ১০,৩৩০ জন
default-image

করোনা পরিস্থিতির কারণে অনেকটাই এলোমেলো গোটা শিক্ষা কার্যক্রম। মুক্তিযুদ্ধের পর এত দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস-পরীক্ষা না হওয়ার রেকর্ড নেই। গত ১০ মাসে বাতিল হয়েছে একের পর এক পরীক্ষা। ২০২০ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষা তারই একটি। বিশেষ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা ছাড়াই পরীক্ষার্থীদের যে মূল্যায়ন হয়েছে, তাতে ফলও হয়েছে ব্যতিক্রম।

প্রথমত, এবার এইচএসসিতে সব পরীক্ষার্থীই পাস করেছেন। দ্বিতীয়ত ফলের সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ যতজন পেয়েছেন, তা আগে কখনো পাননি। এমন ফলে স্বাভাবিকভাবে পরীক্ষার্থী ও তাঁদের অভিভাবকেরা বেশ খুশি। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জমায়েত নিষিদ্ধ থাকায় আনন্দের উচ্ছ্বাস বইছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। এর মধ্যেও বিচ্ছিন্নভাবে ঘরবন্দী শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ কলেজের সামনে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন।

এবার নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন ১১ লাখ ৪৫ হাজার ৩২৯ জন পরীক্ষার্থীর সবাই পাস করেছেন। আর জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬১৪ জন; যা মোট পরীক্ষার্থীর ১৩ শতাংশের বেশি। গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৪১ হাজার ৮০৭ জন; যা মোট পরীক্ষার্থীর ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ।

এইচএসসি পরীক্ষার পাশাপাশি গতকাল শনিবার মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন আলিম এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসি (বিএম) পরীক্ষার মূল্যায়নের ফলও প্রকাশ করা হয়েছে। এখন কোনো পরীক্ষার্থীর যদি ফল নিয়ে আপত্তি থাকে, তাহলে পর্যালোচনা (রিভিউ) করার আবেদন করতে পারবেন। আজ রোববার থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টেলিটক প্রিপেইড মোবাইল ফোনের মাধ্যমে নির্ধারিত পদ্ধতিতে আবেদন করা যাবে।

default-image

২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল গত বছরের ১ এপ্রিল থেকে। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করা হয়, যা দফায় দফায় বাড়িয়ে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করা হয়েছে। ফলে গেল বছরের এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে গত বছরের অক্টোবরে সরকার ঘোষণা দেয়, এবারের এইচএসসি পরীক্ষা না নিয়ে
ভিন্ন উপায়ে পরীক্ষার্থীদের ফল মূল্যায়ন করা হবে। তখন জানানো হয়েছিল, জেএসসি ও এসএসসি এবং সমমানের পরীক্ষার গড় ফলের ভিত্তিতে এইচএসসির পরীক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে আইনি জটিলতা দেখা দেয়। কারণ, এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষার সনদ দেওয়া হয় পরীক্ষার ভিত্তিতে। এ জন্য মহামারিজনিত বিশেষ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা ছাড়াই ফল মূল্যায়নের সুযোগ রেখে সম্প্রতি আইন সংশোধন করা হয়।

এরপর গতকাল সকালে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের মূল্যায়নের ফল ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মূল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে অনলাইনে যুক্ত হয়ে ফল প্রকাশ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। এরপর শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি ফলাফলের তথ্য তুলে ধরেন। একই সঙ্গে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে যাঁরা আগের প্রাক্-নিবন্ধন করে রেখেছিলেন, তাঁরা খুদে বার্তায় ফল পেতে শুরু করেন। এরপর বোর্ডের ওয়েবসাইটেও ফল দেওয়া হয়।

পাবলিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে এর আগে ১৯৬২ সালে পরীক্ষা ছাড়াই ডিগ্রি পাস কোর্সের শিক্ষার্থীদের উত্তীর্ণ ঘোষণা করা হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন
default-image
৯ বোর্ডে ১১,৪৫,৩২৯ জন পরীক্ষার্থীর সবাই পাস। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১৩ দশমিক ৪১ শতাংশ পরীক্ষার্থী। পর্যালোচনার আবেদন আজ থেকে।

যেভাবে হলো মূল্যায়ন

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে পরীক্ষা না হওয়ায় এবার জেএসসি এবং এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার বিষয় ‘ম্যাপিং’ করে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের ফল মূল্যায়ন করা হয়েছে।

সাধারণভাবে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষার আবশ্যিক বিষয় বাংলা, ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ের ২৫ শতাংশ এবং এসএসসি ও সমমানের আবশ্যিক বাংলা, ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ের নম্বরের ৭৫ শতাংশ নম্বর বিবেচনা করে এইচএসসিতে বাংলা, ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ের নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিভাগ (গ্রুপ) পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জেএসসি বা সমমান পরীক্ষার গণিত এবং বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বিষয়ের প্রাপ্ত গড় নম্বরের ২৫ শতাংশ এবং এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার বিভাগভিত্তিক তিনটি বিষয়ের ৭৫ শতাংশ নম্বর বিবেচনা করে এইচএসসির মানবিক ও অন্যান্য বিভাগের তিনটি বিষয়ের নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।

আর বিজ্ঞান বিভাগের ক্ষেত্রে জেএসসি ও সমমান পরীক্ষার গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে প্রাপ্ত গড় নম্বরের ২৫ শতাংশ এবং এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও উচ্চতর গণিত বা জীববিজ্ঞান বিষয়ের ৭৫ শতাংশ নম্বর বিবেচনা করে এইচএসসির পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও উচ্চতর গণিত বা জীববিজ্ঞান বিষয়ের নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।

ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ক্ষেত্রে জেএসসি বা সমমান পরীক্ষার গণিত এবং বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বিষয়ে প্রাপ্ত গড় নম্বরের ২৫ শতাংশ এবং এসএসসি বা সমমান পরীক্ষার গ্রুপভিত্তিক তিনটি সমগোত্রীয় বিষয়ের ৭৫ শতাংশ নম্বর বিবেচনা করে এইচএসসির ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের তিনটি সমগোত্রীয় বিষয়ের নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।

মানবিক ও অন্যান্য বিভাগের ক্ষেত্রে জেএসসি বা সমমান পরীক্ষার গণিত এবং বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বিষয়ের প্রাপ্ত গড় নম্বরের ২৫ শতাংশ এবং এসএসসি বা সমমান পরীক্ষার বিভাগভিত্তিক তিনটি বিষয়ের ৭৫ শতাংশ নম্বর বিবেচনা করে এইচএসসির মানবিক ও অন্যান্য বিভাগের তিনটি বিষয়ের নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।

ফল উন্নয়নের জন্য এবং আংশিক বিষয়ের (এক বা একাধিক বিষয়) পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে অকৃতকার্য বিষয়ের নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রেও ওপরের নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে।

জেএসসি এবং এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া ৩৯৬ জন পরীক্ষার্থী এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাননি। তাঁদের মধ্যে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীই বেশি।

৩৯৬ পরীক্ষার্থী জিপিএ–৫ পাননি

এর আগে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা ধারণা দিয়েছিলেন, যেসব পরীক্ষার্থী জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন, তাঁরা এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ পেতে পারেন। কিন্তু গতকাল দেখা গেল, জেএসসি এবং এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া ৩৯৬ জন পরীক্ষার্থী এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাননি। তাঁদের মধ্যে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীই বেশি।

ঢাকার সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে সাংবাদিকেরা শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনিকে প্রশ্ন করেছিলেন। জবাবে তিনি বলেন, বিষয় ম্যাপিংয়ের কারণে এমনটি হয়েছে। তিনি বলেন, ২০১৯ সালের এইচএসসিতে ৪৫ হাজার ৮৬৫ পরীক্ষার্থী আগের জেএসসি ও এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেলেও এইচএসসিতে তা ধরে রাখতে পারেননি।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সিস্টেম অ্যানালিস্ট মঞ্জুরুল কবীর বলেন, আগের দুই পরীক্ষায় যাঁরা চতুর্থ বিষয়ের জিপিএ মিলিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ এবার পূর্ণাঙ্গ জিপিএ পাননি। ৩৯৬ জনের জিপিএ-৫ না পাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, হয়তো এসব পরীক্ষার্থীর ম্যাপিং করা বিষয়ের কোনো কোনোটিতে আগের দুই পরীক্ষায় জিপিএ-৫ ছিল না। এ জন্যই এমনটি হয়ে থাকতে পারে।

অন্যদিকে জেএসসি এবং এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ না পাওয়া ১৭ হাজার ৪৩ জন পরীক্ষার্থী এবার এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছেন।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, যা ফল হয়েছে, তা ভালো হয়েছে। কিন্তু জেএসসি ও এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া ৩৯৬ জন পরীক্ষার্থীর জিপিএ-৫ না পাওয়াটা খটকা লাগছে। তাদের জন্য সোজাসাপ্টা পদ্ধতি ব্যবহার না করে আরও অন্য কিছু করার সুযোগ ছিল।

বিজ্ঞাপন

জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের ৮০ শতাংশই বিজ্ঞানের

নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন মোট জিপিএ-৫ পাওয়া পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ১ লাখ ২৩ হাজার ৬২০ জনই বিজ্ঞান ও গার্হস্থ্য বিভাগের (গ্রুপ) পরীক্ষার্থী। বাকিদের মধ্যে ১৯ হাজার ৬৬৪ জন মানবিক, ইসলাম শিক্ষা ও সংগীত বিভাগের এবং ১০ হাজার ৩৩০ জন ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের পরীক্ষার্থী।

নয়টি বোর্ডে জিপিএ-৫ পাওয়া মোট পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ৩ ভাগের ১ ভাগই ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের। এই বোর্ডের অধীন ৫৭ হাজার ৯২৬ জন পরীক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। সবচেয়ে কম জিপিএ-৫ পেয়েছেন সিলেট শিক্ষা বোর্ডে, ৪ হাজার ২৪২ জন।

অন্যদিকে জিপিএ-৫ পাওয়া পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রী বেশি (৭৮,৯১১ জন)। বাকি ৭৪ হাজার ৭০৩ জন ছাত্র।

রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ শাহান আরা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, এবারের ফলের সঙ্গে অন্যবারের ফল মেলানো যাবে না। এবারের ফল ব্যতিক্রম, যেখানে সবাই পাস করেছেন। এমনকি গতবার এক বা একাধিক বিষয়ে ফেল করে যাঁরা এবার এসব বিষয়ে পরীক্ষা দিতে চেয়েছিলেন, তাঁরাও পাস করেছেন। তবে এটা তো মানতে হবে যে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কিছু করারও ছিল না।

উচ্চশিক্ষা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন