বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

শিক্ষকদের যাঁরা নিয়ম করে নিচে ফেলে রাখেন, যাঁদের হাতে অবোধ শিশুর ভবিষ্যৎ চলার পথ তৈরি হচ্ছে, তাঁদেরই চরম অবহেলা, অবমাননা কেন করা হচ্ছে, সুধী মহলের কাছে প্রশ্ন রেখে গেলাম। মানে–সম্মানে বাঁচতে হলে পদ–পদবি আর গ্রেডও খুবই গুরুত্ব বহন করে। এহেন মর্যাদাহীন, অপ্রতুল বেতনে ভবিষ্যতে আমাদের সন্তানদের শিক্ষকতা পেশায় আনব কি না, কয়েকবার ভাবা লাগবে। নতুন প্রজন্ম শিক্ষকতা পেশাকে অন্তর থেকে ভালোবাসবে না যদি তারা ফার্স্ট ক্লাস লেখাপড়া করে থার্ড ক্লাস চাকরি করতে হয়।

default-image

এ অকদর্য নিয়মে ভালো কিছু আশা করা কি সম্ভব? সব সময় যদি পেশাগত টেনশন, গ্রেডের, ক্লাসের গ্লানি নিয়ে থাকতে হয়, তখন মনটা ভারাক্রান্ত, কোণঠাসা থাকে সর্বদা। সরকারি নথি, কাগজে–কলমে আমাদের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী লিখতেই হয়, যা খুবই অপমানজনক আর মর্যাদাহানিকর। অথচ ইউনিয়ন পরিষদ সচিবকেও দশম গ্রেডে উন্নীত করা হয়েছে। সম্প্রতি গণমাধ্যম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদৌলতে সবাই তা দেখছে আর নিজের অবস্থান নিয়ে আফসোস, হা–হুতাশ করছেন। কোটি সালাম দিয়ে শিক্ষকদের খুশি করা বর্তমান প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট নয়। কেবলই অট্টহাসির নামান্তর মাত্র। রাষ্ট্রের বিবেকের দরজার খুলবে কবে অপেক্ষায় আছি।

শিক্ষকেরাও মানুষ; জাতি গড়ার মহান কারিগর। পরিবারের ছয়জনের ভরণপোষণের নিয়মে নাকি বেতন ঠিক করা হয়েছে। প্রায়ই প্রতিটি ঘরে বয়স্ক অভিভাবক আছেন। তাঁদের চিকিৎসা খরচ চালাতে হয় প্রায়শ ধারদেনা করে। দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে তো আর কথায় নেই। আশ্চর্যের বিষয় হলো স্বাধীনতার এত বছর পরেও এত বড় একটি বিশাল শিক্ষক কর্মী বাহিনীর নেই কোনো নিজস্ব চিকিৎসাব্যবস্থা, নেই কোনো প্রাথমিক শিক্ষা হাসপাতাল, নেই নিজস্ব সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্যসামগ্রীর জোগান! যেহেতু মন্ত্রণালয় আছে সেহেতু রেশন থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা সবকিছুই থাকা বাঞ্ছনীয়। বেতন সর্বসাকল্যে যা পান একজন প্রাথমিক শিক্ষক, তা দিয়ে বড়জোর মাসের একপক্ষ চলতে পারেন। তারপর হিমশিম খেতে হয় মাসের বাকি দিনগুলো সংসার চালাতে। আর এটাই চরম সত্য, বাস্তবতা।

default-image

একটু রেলওয়ের দিকে তাকান। রেলগাড়ি চালানোর জন্য কত বৃহৎ আয়োজন, তাদের বিশাল সম্পদ, অনেক জায়গা–জমি পরিত্যক্ত পড়ে আছে বছরের পর বছর। আরও আছে ওখানকার কর্মকর্তা–কর্মচারীদের জন্য নিজস্ব স্বাস্থ্যসেবা, রেলওয়ে হাসপাতাল এবং নানাবিধ সুযোগ–সুবিধা। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষকদের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী, ১২তম গ্রেড দিয়ে পেছনে ফেলে রাখার অর্থ হলো দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে নীরবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া। দেশের চাকরিবিধি, নিয়মনীতি প্রণেতারা কী মূলে শিক্ষক ঠকানোর কাজগুলো করছেন, তার কারণ আসলেই অজানা। বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করলে, এটি একেবারেই স্বচ্ছ পানির মতো পরিষ্কার যে আমাদের বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষকেরা পেশাগতভাবে আজন্ম অবহেলিত ও মর্যাদাহীন। সে জন্য যেই কেউ হেলায় অসার মন্তব্য করতে তাঁদের ছাড়েন না। এলাকার লোকজন পর্যন্ত নামসর্বস্ব সামান্য কমিটির পদধারী হয়ে শিক্ষকের গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধাবোধ করে না আর কটুবাক্যে জর্জরিত করার তো লোকের অভাব নেই! এই লজ্জা কার? নিশ্চয়ই রাষ্ট্র তার গড়িমসি দুর্বল নীতির জন্য দায়ী। শুরুতেই গলদ করে রেখে উচ্চপর্যায়ে বেশি কদর, অর্থকড়ি ঢালার হেতু কী কারণে জানা নেই।

টিভির একটি অনুষ্ঠানে জেনেছি আমাদের রাষ্ট্রপ্রধান নিজেই বলছেন তাঁর জীবনের লক্ষ্য ছিল প্রাথমিক শিক্ষক হওয়া। নিশ্চয়ই তিনি প্রাথমিক শিক্ষকদের ভালোবাসেন, শ্রদ্ধা করেন তবে কেন এখনো এত উদাসীনতা? কেন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়ে আজীবন দুই পয়সার বিত্তবৈভবহীন মানুষ গড়ার কারিগর আত্মগ্লানিতে ভুগবেন? নামেই সরকারি চাকরির তকমা লাগিয়ে কেন ভেতরে অন্তঃসারশূন্যতায় বসবাস করবেন? যথাসময়ে নেই কোনো প্রমোশন। আজীবন একই পদে বহাল থেকে মাথা নিচু করে কেঁদে কেঁদে অবসরে যেতে হবে কেন? কেন তাঁদের সঠিক মূল্যায়ন কেউ করেন না?

default-image

জীবনে বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম উন্নত নিশ্চিত বাসস্থান, শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা আর নিরাপদ জীবনযাপনের অধিকার প্রাথমিক শিক্ষকদেরও আছে। দয়া করে শিক্ষকদের গ্রেড আরও ওপরের ধাপে সম্মানজনক জায়গায় নেওয়ার ব্যবস্থা করুন। নিষ্পাপ শিশুদের গড়ে দেওয়ার দায়িত্ব কখনো তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর হাতে দেওয়া সমীচীন নয়। সর্বোচ্চ গ্রেড পাওয়া শিক্ষকদের হাতে শিশুরা গড়ে উঠলে তাঁরাও একদিন বড় হয়ে চাইবে প্রাথমিক শিক্ষক হতে। আমাদের একান্তই চাওয়া দেশের প্রাথমিক শিক্ষকদের উন্নত জীবনমান ও মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে থার্ড ক্লাস পদ অপসারণ ও গ্রেড ১২ থেকে অন্তত আরও দুই ধাপে এগিয়ে নিয়ে ভবিষ্যতে উন্নততর শিক্ষাব্যবস্থার মূলোৎপাটন করবেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আশা করি, প্রাথমিক শিক্ষার সুবিস্তৃত বৃক্ষের শাখা–প্রশাখা সবুজ, ফুলেল সুবিস্তারে কর্তৃপক্ষের সদয় চিন্তার উদয় হবে এবং সবাই একবাক্যে স্বীকৃতি দেবেন এই বলে,
‘প্রাথমিক শিক্ষকই প্রথম গুরু; উত্তম উৎকৃষ্ট,
সুউচ্চ মর্যাদার আসনে তাঁদের করো উপবিষ্ট।’

*লেখক: পারভীন আকতার, শিক্ষক, কবি ও প্রাবন্ধিক, চট্টগ্রাম

উচ্চশিক্ষা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন