বিজ্ঞাপন
default-image

নীলকান্ত ভানু বলছেন, অঙ্ক একটা ‘বিশাল মানসিক খেলা’ এবং অঙ্ক নিয়ে ‘মানুষের ভয় দূর করাই’ তার জীবনের লক্ষ্য। তিনি বলেন, আপনি যদি খুব দ্রুত দৌড়তে পারেন কেউ আপনাকে কোনোরকম প্রশ্ন করবে না, কিন্তু মনে মনে অঙ্ক করতে পারলে তা নিয়ে অনেকের মাথায় অনেক প্রশ্ন আসে।

গত ১৫ আগস্টে লন্ডনে মাইন্ড স্পোর্টস অলিম্পিয়াড (এমএসও) অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মেন্টাল ক্যালকুলেশন ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম এশীয় হিসেবে সোনা জেতেন ভারতের দক্ষিণের রাজ্য তেলেঙ্গানার ছেলে নীলকান্ত ভানু। এ আয়োজনের ২৩ বছরের ইতিহাসে ভানুই প্রথম ব্যক্তি ইউরোপীয়দের বাইরে যিনি এ পুরস্কার পেলেন।

সোনা জয় করতে গিয়ে নীলকান্ত ভানু ১৩ দেশের ২৯ প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলেছেন। তার দ্রুততম সময়ে সমস্যার সমাধান ও সুনির্দিষ্ট উত্তর বলে দেওয়ায় ক্ষমতায় মুগ্ধ বিচারকেরাও।

অনেকের মনে হতে পারে ক্যালকুলেটর থাকতে মাথা এত খাটানোর দরকার কি? এ ব্যাপারে নীলকান্ত ভানুর ভাষ্য, উসাইন বোল্ট ৯ দশমিক ৮ সেকেন্ডে ১০০ মিটার দৌড়ানো ক্ষমতায় আমরা মুগ্ধ হই, বাহবা দিই। আমরা কিন্তু বলি না, পৃথিবীতে তো গাড়ি আছে, বিমান আছে, অত দ্রুত দৌড়ানোর দরকার কি? ক্যালকুলেটর আছে বলে মাথা ব্যবহার করার দরকার নেই এর পেছনে তো কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। আসলে মানুষ অবিশ্বাস্য কিছু করতে পারে, এটা মানুষের জন্য একটা অনুপ্রেরণার ব্যাপার- দ্রুত অঙ্ক করতে পারা বা মাথা ব্যবহার করে হিসাব করতে পারাটাও একইভাবে দেখা উচিত।

ছড়িয়ে পড়ার করোনা ভাইরাসের কারণে ভারতে চলছে লকডাউন। এরই মধ্যে ভানু প্রকাশ তার গ্রামের মানুষদের অঙ্ক শিখতে সাহায্য করছেন। ভারতের মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে হিসেবে অন্যদের মতোই তার জীবনের লক্ষ্য হওয়ার কথা পড়াশোনা করে ভালো চাকরি জোগাড় করা। কিংবা ব্যবসায় শুরু করা। শুধু অঙ্ক নিয়ে পড়ে থাকা তার মতো পরিবারের ছেলের জন্য বিরল একটি অভিজ্ঞতাও। সংখ্যা নিয়ে আগ্রহ ও পারদর্শিতার কারণে ভানু প্রকাশ এখন অঙ্ক নিয়ে স্নাতক ডিগ্রি শেষ করতে চলেছেন।

default-image

মস্তিষ্কের খেলা গণিত

মাইন্ড স্পোর্টস অলিম্পিয়াড (এমএসও) প্রতিযোগিতায় জেতার জন্য বড় বড় প্রথম সারির প্রতিযোগীদের মতো ভানু প্রকাশ যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তিনি বলছেন, এটা টেবিলে বসে অনেক পড়াশোনা করে প্রস্তুতি নেওয়ার মতো কাজ নয়, তিনি মনে করেন এটা মস্তিষ্কের বড় একটা খেলা। আমি প্রস্তুতির জন্য দ্রুত অঙ্ক করতে পারার বিষয়টা আয়ত্ত করার ওপর শুধু জোর দেয়নি, আমি খুব দ্রুত সংখ্যা নিয়ে চিন্তার ক্ষমতা আয়ত্ত করেছি। ছোটবেলায় স্কুলের পড়ার বাইরে প্রতিদিন ছয় থেকে সাত ঘণ্টা অঙ্ক কষতেন। এখন অবশ্য তিনি আর প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিয়ম করে কষেন না অঙ্ক।

চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ভান প্রকাশ বলেন, আমি এখন নিয়মের কাঠামোর বাইরে গিয়ে মানসিক অঙ্কের অভ্যাস করছি। সেখানে আমি সারাক্ষণ সংখ্যা নিয়ে ভাবি, আমার মাথায় সব সময় সংখ্যা ঘোরে। আমি খুব জোরে গান-বাজনা ছেড়ে দিয়ে অঙ্কের চর্চা করি। অনেক সময় লোকের সঙ্গে কথা বলার সময়, ক্রিকেট খেলতে খেলতে সংখ্যা নিয়ে ভাবি। কারণ মস্তিষ্কের গঠনই এমন যে সেটি এক সাথে অনেকগুলো কাজ করতে পারে। তিনি এটার প্রমাণের জন্য বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারের সময় একই সঙ্গে ৪৮ এর ঘরের নামতা পড়তে থাকেন।

উসাইন বোল্ট ৯ দশমিক ৮ সেকেন্ডে ১০০ মিটার দৌড়ানো ক্ষমতায় আমরা মুগ্ধ হই, বাহবা দিই। আমরা কিন্তু বলি না, পৃথিবীতে তো গাড়ি আছে, বিমান আছে, অত দ্রুত দৌড়ানোর দরকার কি? ক্যালকুলেটর আছে বলে মাথা ব্যবহার করার দরকার নেই এর পেছনে তো কোনো যুক্তি থাকতে পারে না।

অনলাইনে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে নীলকান্ত ভানু বলেন, আমি যখন কথা বলছি তখন একই সঙ্গে পাশ দিয়ে যতগুলো ট্যাক্সি চলে গেছে সবগুলোর নম্বর আমি বলে দিতে পারব। কিংবা ধরুন, আমি একজনের সঙ্গে যখন কথা বলছি তখন কতবার তিনি চোখের পলক ফেলছেন সেটা আমি গুনতে থাকি। এভাবে মস্তিষ্ককে সব সময় খাটানো যায়।

১০ বছর বয়সে ভানু প্রথম গণিতের একটি টুর্নামেন্টে ২০১০ সালে ট্রফি জেতে। তবে এত কিছুর পরও ভানু প্রকাশের লক্ষ্যে কিন্তু রেকর্ড ভাঙা নয়। যদিও রেকর্ড ভাঙতে তিনি ভালোবাসেন, মজা পান। ‘দেখুন রেকর্ড ভাঙা বা রেকর্ড গড়া, কিংবা মাথার মধ্যে দ্রুত অঙ্ক করা এগুলো আসলে মানুষকে বোঝানোর একটা পথ যে পৃথিবীতে অঙ্কবিদদের প্রয়োজন আছে। তারা ফেল না নয়। আর অঙ্কের মধ্যে কিন্তু একটা মজা আছে, সেই মজাটা যে ধরতে পারে সে অঙ্ক ভালোবাসে’, বলছিলেন ভানু। তিনি বলেন, অনেকে অঙ্ককে ভয় পায়। তার মূল লক্ষ্য এই ভীতি দুর করা।

জীবনঘাতী আঘাতে বছরব্যাপী বিছানায়

default-image

‘মানব ক্যালকুলেটরের’ তকমা পাওয়া ভানু প্রকাশের জীবন কিন্তু এত সহজ ছিল না। অনেকেরই মনে হতে পারে ভানু প্রকাশ অঙ্ক বিষয়ে অসাধারণ প্রতিভা নিয়ে জন্মেছে। তার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও তা নয়।

২০০৫ সালে ৫ বছর বয়সে চাচার সঙ্গে স্কুটারে যাচ্ছিল ছোট্ট ভানু। ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কায় থেকে পড়ে যায় সে। পিচ ঢালা পথে পড়ে চোট পায় মাথায়। এ সময় চিকিৎসকের চুরির নিচে যেতে হয়, মাথায় ৮৫ সেলাই পড়ে। তখন প্রায় কোমায় যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল। সাত দিন কোনো হুঁশ ছিল না। মাথায় আঘাতের কারণে ভবিষ্যতে সে সমস্যায় পড়তে পারে বলেও জানায় চিকিৎসকেরা। এই আঘাত তাকে ভোগাবে বলেও বাবা-মাকে জানান চিকিৎসক। এর পরে এক বছরের তাকে বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়েছে। ওই সময়ই মাথার ভেতর দ্রুত অঙ্ক করতে পারার ক্ষমতা তৈরিতে তার যাত্রা শুরু হয়। বাবা-মা বলেছিলেন মাথার জখম হয়তো চিরদিনের মতো মস্তিষ্কের ক্ষমতা নষ্ট করে দিতে পারে। তাই মস্তিষ্ককে ব্যস্ত রাখতে, সক্রিয় রাখতে। অঙ্ক করার কাজটা রপ্ত করে ফেলেন নীলকান্ত। তিনি বলেন, ‘আমি এখন ওই সময়ের কষ্টের কথা ভুলতে পারি না। ওই দুর্ঘটনা আমার জীবন পাল্টে দিয়েছে। আমি গণিতে খুঁজে নিয়েছি আনন্দ।’ এই এক বছরে ভানু দাবা খেলা, অঙ্কের খেলা ও ধাঁধার উত্তরগুলো খুঁজতে খুঁজতে দিন-রাত কাটিয়েছেন। আর এতে তার মাথা সচল ছিল। এই এক বছর বন্ধ ছিল স্কুল যাওয়া। আর সময়টি সে কাটিয়েছে অঙ্কের ধাধা খেলে।

মাথায় আঘাত ও অস্ত্রোপচারের কারণে দেখতে কিছু কুৎসিত লাগে নীলকান্ত ভানুকে। ওই চেহারা দেখলে ভানু কষ্ট পাবেন ভেবে বাবা-মা ঘরে থেকে সব আয়না সরিয়ে ফেলেন। কিন্তু ভানুর চেহারা নিয়ে চিন্তা ছিল না। তার চিন্তা ছিল নিজের ভালোটা নিয়ে কাজ করা আর নিজেকে প্রমাণ করা।

৭ বছর বয়সে ভানু সাব জুনিয়র ক্যাটাগরির অঙ্গের পরীক্ষায় অন্ধ্র প্রদেশে রাজ্য পর্যায়ে তৃতীয় হয়। ওই সময় তার পরিবার অন্ধ্র প্রদেশের বাসিন্দা ছিল। পরে তেলেঙ্গনা অন্ধ্র থেকে আলাদা হয়। ওই পুরস্কার প্রসঙ্গে নীলকান্ত ভানু বলেন, এটা মেডেল ছিল না। সেটা ছিল আমার বাবার ও আমার ক্ষতচিহ্ন মুক্তির পথ।

এরপর থেকে আর ভানুকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। জিতেছেন বেশ কয়েকটি মেডেল। ২০১১ সালে ভারতের জাতীয় পর্যায়ের মেডেল জেতেন। ১৩ বছর বয়সে ভারতের হয়ে বিদেশেও কৃতিত্বে স্বাক্ষর রাখেন। অর্জন করেন একের পর এক পদক। এরপরই আর ফিরে তাকাতে হয়নি ভানুকে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় মেলে ঢের। গণিতের আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় চারটি রেকর্ড গড়েন ‘ফাস্টেস্ট হিউম্যান ক্যালকুলেটর’ তকমা পাওয়া ভানু। পাওয়ার মাল্টিপ্লিকেশন, সুপার সাবস্ট্রাকশন এবং মেন্টাল ম্যাথ: পাওয়ার অব টু অ্যান্ড থ্রি’র তকমা পান তিনি।

লিমকার ৫০ টি রেকর্ড ভেঙেছেন নীলকান্ত ভানু। আর তাই ভারতের লিজেন্ডারি গণিতবিদ শকুন্তলা দেবীর সঙ্গে তুলনায় চলে এসেছেন ২০ বছর বয়সী নীলকান্ত ভানু। ভারতের অনেকেই তাকে এখন কমিকসের ‘সুপার হিরো’ মনে করে।

গণিত সহজে ভানুর উদ্যোগ

default-image

ভানু বলেন, তার লক্ষ্যই ছিল গণিতের আতঙ্ক কাটানো। ২০১৮ সালে ভানু ‘এক্সপ্লোরিং ইনফিটিস’ নামে গণিতের একটি একাডেমি শুরু করেন। তার উদ্দেশ্যই, গণিতকে সবার কাছে আনন্দদায়ক করা। এ সম্পর্কে ভানু বলছিলেন, ‘আমি একদিন ভারতের এক পাড়া গ্রামে গেলাম। স্কুলের শিশুদের সঙ্গে কথা বলার সময়ে মনে হলো খুদে শিক্ষার্থীরা অঙ্কের গুন করতে ভয় পায়। তারা ব্যাপারটি বুঝতেও পারে না। ভারতের প্রতি চারজনের তিনজন শিক্ষার্থী সরকারি স্কুল পড়ুয়া। এরা কমবেশি সবাই গণিত নিয়ে সমস্যার মধ্য থাকে। এরপরই মনে হলো এটা নিয়ে কাজ করা দরকার।’ এরপরই ভানু একাডেমি শুরু করেন।

অনলাইনে ভানুর একাডেমির সাবসক্রাইবার ৫ লাখেরও বেশি। মূলত তৃণমূল পর্যায়ে গণিতের চর্চা ছড়িয়ে দিতেই কাজ করছে তার একাডেমি। ভারত পেরিয়ে কাজও শুরু করেছে নীলকান্ত ভানুর একডেমি। করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আগে বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ায় বুট ক্যাম্প করেছে ভানুর একাডেমি। ডিজিটাল এই শিক্ষণ কার্যক্রমে আছে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষার্থীও। ভানু স্বপ্ন সবার কাছে গণিতকে সহজ করে তুলে ধরা। আর ভারতের শিক্ষার্থীরা বিশ্বে গণিতে নিজেদের কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখবেন, তাও চান ভানু।

মাইন্ড স্পোর্টস অলিম্পিয়াডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইটান ইলফেল্ড সিএনএনকে বলেন, ভানুর নিয়ন্ত্রণে ছিল পুরো প্রতিযোগিতা। সে অন্য প্রতিযোগীর চেয়ে ৬৫ পয়েন্টে এগিয়ে থেকে টুর্নামেন্ট শেষ করে। তার একডেমি উদ্যোগ এটাই প্রমাণ করেছে যে, কেউ চাইলে গণিতে দক্ষ হয়ে উঠতে পারে, নিজেকে বিশ্বে তুলেও ধরতে পারে।

কি চান ভানু

ভানুর কৃতিত্বে খুশি হয়ে ভারতে রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোভিন্দ এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট এম. ভেঙ্গেকাইয়া নাইডু অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি গর্বিত পরিবার নিয়ে। আসলে ভবিষ্যতে কি করতে চান তাও জানান ভানু প্রকাশ। আর কখন এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চান না নীলকান্ত ভানু। ‘আমি নিশ্চিত নই যে, আবারও এ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে যাব কি না। আমি মনে করি আর নয়। আমি মনে করি সবাইকে এ ধারণা দিতে পেরেছি যে আমি দ্রুততম। আমি এখন এমন একপর্যায়ে আছি যে, মানুষ আমার কথা শুনতে চাচ্ছে, আমি নিজেকে ওদিকেই ব্যস্ত রাখতে চাই। আমি আর গণিতের মুখোমুখি হতে চাই না। আমি এখন গণিত ভীতির বিরুদ্ধে লড়তে চাই’ বলছিলেন ভানু।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, সিএনএন ও ইন্ডিয়া টুডে

উচ্চশিক্ষা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন