default-image

মৌলিক গবেষণা বৈজ্ঞানিক গবেষণার একটি প্রধান অনুষঙ্গ। এর প্রধান লক্ষ্য নতুন নতুন উদ্ভাবনী গবেষণার মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান বের করা। পৃথিবীজুড়ে গবেষকেরা জ্ঞান–বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গবেষণা করেন, বিভিন্ন জার্নালে নিয়মিত তা প্রকাশও করেন, কিন্তু মৌলিক গবেষণার সংখ্যা খুবই অপ্রতুল! অধিকাংশ সময়ই তাঁরা সমসাময়িক বই এবং জার্নালকেই বেশি গুরুত্ব দেন, আর সে জন্যই মৌলিক গবেষণার মূল উৎসগুলো আর খোঁজা হয়ে ওঠে না। আন্তর্জাতিক কনফারেন্স বা সেমিনারেও এ বিষয়ে আলোচনা হয় সামান্যই। অনেক সময় দেখা যায় একজন গবেষক তাঁর পুরো গবেষণাজীবন অন্যদের অনুসরণ করে কাটিয়ে দিলেন কোনো ধরনের মৌলিক গবেষণার চেষ্টা না করে।
এর প্রধান কারণটাও অবশ্য অজানা নয়। আজকের বাস্তবতায়, মৌলিক গবেষণা বেশ কষ্টসাধ্য। এর খরচ ও ঝুঁকি অনেক। সব সময় গবেষণার ফল না–ও আসতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই পাঁচ-সাত বছর পর ফল পাওয়া গেলেও তা বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করা না–ও যেতে পারে। তারপরও অনেক গবেষকই চেষ্টা করেন প্রথাগত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে নতুন তত্ত্ব ও তথ্য নিয়ে কাজ করতে। তবে নতুন ধারণা বা পরীক্ষার ব্যাপারটি গবেষকের বিভিন্ন বিষয়ের জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সে জন্যই সমসাময়িক বই এবং জার্নালের পাশাপাশি মৌলিক ও উদ্ভাবনী গবেষণার বিকল্প উৎসগুলো জানা, পড়া ও খোঁজা জরুরি। এর মানে এই নয় যে এগুলো করলেই নিত্যদিন নতুন কিছু না কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে, বরং তা আমাদের সফল হাওয়ার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেবে।

তাহলে কোথায় এবং কীভাবে একজন গবেষক নতুন ও উদ্ভাবনী ধারণার তত্ত্ব–তালাশ করবেন?

বিজ্ঞাপন

প্রকৃতি

বিখ্যাত স্থপতি ফজলুর রহমান খান প্রথম দেখিয়েছিলেন কীভাবে ফাঁকা সিলিন্ডার আকৃতির বহুতল ভবন সহজেই টেকসই ও ভূমিকম্পরোধী হতে পারে। নলাকার বহুতল ভবনের এই ধারণা উনি ‘বাঁশ’ থেকে পেয়েছিলেন কি না, তা হয়তো জানা নেই। তবে প্রাণী বা উদ্ভিদের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে আধুনিক কালের অনেক আবিষ্কার হয়েছে। প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে কোনো কিছু তৈরি করার এই বিজ্ঞানকে বলা হয় ‘বায়োমিমিক্রি’, যা মৌলিক গবেষণার জন্য খুবই জরুরি। উদাহরণসরূপ, সামুদ্রিক বেলুগা মাছের সঙ্গে বেলুগা বিমান, স্ট্রিংরের (শংকর মাছ) সঙ্গে বি-২ স্পিরিট বোমারু বিমানের সাদৃশ্য উল্লেখ করা যায়। একইভাবে মৌমাছি কীভাবে মধু সংগ্রহ করে, তার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে ‘বি অ্যালগরিদম’, যা দ্রুত খাদ্য বিতরণসহ বিভিন্ন ব্যবসার সময় ব্যবস্থাপনায় প্রয়োগ করা হয়। বিশেষ প্রজাতির সামুদ্রিক কচ্ছপ ৫০০ বছরের বেশি বেঁচে থাকে। এদের ডিনএ অনুসন্ধান করে প্রাণীর দীর্ঘায়ু হওয়ার রহস্য জানা অসম্ভব নয়।
শুধু বিজ্ঞান নয়, কলাতেও প্রকৃতির প্রভাব বিদ্যমান। ‘সোয়ান লেক’খ্যাত ব্যালে নৃত্যে যেমন রাজহাঁস-রাজহংসীর জলকেলি ফুটিয়ে তোলা হয়, তেমনি কবুতরের বাকবাকুম নিয়েও হয়তো ব্যালে-ধাঁচের দেশীয় নাচ করা যায়। পাখির ডাক কে না ভালোবাসে? তাই হয়তো বিটোফেনের পেস্টোরাল সিম্ফনিতে নাইটিঙ্গেল ও কোয়েল পাখির শব্দ ও ছন্দ ব্যবহার করা হয়েছে। নামীদামি স্পোর্টস কারের ডিজাইনও করা হয় বিভিন্ন মাছ, ফড়িং ও অন্যান্য প্রাণীর আদলে। সে জন্যই পিঁপড়া বা বিড়ালের চোখের মতো নকশা করা হেডলাইট প্রায়ই চোখে পড়ে।

প্রাচীন বই

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. জাহিদ হাসান, যিনি প্রথম ভাইল ফার্মিয়ন কণার অস্তিত্ব প্রমাণ করেছেন, গবেষণা করেন মূলত পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে। তা সত্ত্বেও তিনি দর্শন আর ধর্মতত্ত্বের নানা বই পড়েন। এর কারণ জানা না থাকলেও অনুমান করা কঠিন নয়। বিভিন্ন দর্শনতত্ত্ব ও ধর্মীয় বইয়ে অনেক ঘটনা বর্ণিত আছে, যা হয়তো গবেষকদের চিন্তা ও কল্পনাশক্তি বাড়িয়ে দেয়। জ্যোতির্বিদ্যাসংক্রান্ত ‘একাধিক মহাবিশ্বের’ (মাল্টিভার্স) থিওরি নানা ধর্মসংক্রান্ত ধারণার (যেমন ইসলাম, খ্রিষ্টধর্ম ও ইহুদিধর্মে বর্ণিত সাত আসমান-জমিন, হিন্দুধর্মে বর্ণিত সপ্তস্বর্গ-সপ্তপাতাল) সঙ্গে মিলে যায়। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত মিরাজের ঘটনা আমাদের এক অকল্পনীয় গতির ধারণা দেয়, যা সেই সময়ে ছিল মানবচিন্তার অতীত। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন চেষ্টা করছেন কীভাবে অতিদ্রুত গতিসম্পন্ন (হাইপারসনিক/মাক ৫ বা তারও বেশি) বাণিজ্যিক বিমান তৈরি করা যায়, যা আন্তমহাদেশীয় যোগাযোগকে সহজ করে তুলবে।

বিজ্ঞাপন

বিলুপ্তপ্রায় বিদ্যা

২০১৫ সালে ড. ইউ ইউ ম্যালেরিয়া ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কার পান, যার মূল উপাদান তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন একটি গুল্ম (Qing hao) থেকে। চীনে ঐতিহ্যগতভাবে এটি ব্যবহার করা হতো ম্যালেরিয়ার জ্বর উপশমের জন্য। এভাবে ইউনানি বা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত গাছগাছড়া থেকে বিভিন্ন জীবন রক্ষাকারী ওষুধ তৈরি করা যেতে পারে। বিভিন্ন দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোও হতে পারে গবেষকদের মৌলিক চিন্তার রসদ। প্রাচীন মিসরীয় পিরামিডগুলো হাজার বছর ধরে টিকে আছে, যা দেখে হয়তো অতি টেকসই বাড়ি নকশা করা যায়। প্রাচীনকালের সাধু-যোগীদের টেলিপ্যাথির ব্যাপারটা আমরা হয়তো মিথ হিসেবেই জানি, যা এখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা আবিষ্কার করার চেষ্টা করছেন। এটা হলে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে মোবাইল ফোন ছাড়াই একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগের পথ উন্মুক্ত হবে। আধুনিককালের সনিক গান (Sonic Gun) প্রচণ্ড শব্দ তৈরি করতে পারে, যার বর্ণনা পাওয়া যায় হিব্রু বাইবেলের ‘জেরিকোর যুদ্ধ’ অংশে। রাজস্থানের প্রচণ্ড গরম থেকে রক্ষা পেতে এখানের বিখ্যাত হাওয়া মহলের বাইরের দেয়ালে বিশেষ ধরনের নলাকার জানালা সজ্জিত আছে, যা মূল মহলে শীতল বাতাস প্রবাহিত করে। পরিবেশবান্ধব এই প্রাচীন প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রাকৃতিকভাবেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
এ ছাড়া গবেষকেরা বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার ধারণা ও গবেষণা পদ্ধতি অনুসরণ করে নিজ নিজ সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, উন্নয়ন অর্থনীতির র‌্যান্ডমাইজড ফিল্ড ইন্টারভেনশন তত্ত্ব চিকিৎসাশাস্ত্রের র‌্যান্ডমাইজড কন্ট্রোলড ট্রায়ালের পদ্ধতি অনুসরণ করে ব্যুৎপত্তি লাভ করেছে। একইভাবে গণিতের গ্রাফ থিওরির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে সোশ্যাল নেটওয়ার্ক থিওরির বিভিন্ন তত্ত্ব ও তার প্রয়োগিক দিক। তবে খুব চট করে মৌলিক গবেষণার এসব ধারণা খুঁজে পাওয়া যায় না। তার জন্য চাই প্রচুর পড়াশোনা, সারাক্ষণ লেগে থাকার মানসিকতা। মৌলিক ও উদ্ভাবনী গবেষণায় তাহলেই আসবে প্রতীক্ষিত সাফল্য।

* লেখক: ড. মেজবাহুল আহমদ, ইউনিভার্সিটি অব নেব্রাস্কা, লিংকন, যুক্তরাষ্ট্র। mg.ahamad@gmail.com

মন্তব্য পড়ুন 0