default-image

কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে ‘সীমিত সামর্থ্য’ নিয়েই অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে৷ কাল মঙ্গলবারের মধ্যে পুরোদমে শুরু হচ্ছে এই ক্লাস৷ প্রযুক্তিনির্ভর এই ক্লাস নেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা নিয়ে চলছে নানামুখী আলোচনা৷ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলছেন, অনলাইন ক্লাসের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হলো কোনো কোনো শিক্ষকের প্রযুক্তিগত অদক্ষতা আর এ মুহূর্তে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থান করা শিক্ষার্থীদের দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ। কারও কারও ক্ষেত্রে আবার ইন্টারনেট প্যাকেজ কেনার সামর্থ্যও একটা বিষয়।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে গত মার্চ থেকে বন্ধ আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম৷ গত মাসের শেষ সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এক সভা থেকে সব বিভাগ ও ইনস্টিটিউটকে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে অনলাইন ক্লাস শুরুর অনুরোধ জানানো হয়৷ সেই অনুরোধের পর সব বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের কাছ থেকে ই-মেইল ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য ইতিমধ্যেই নিয়েছেন৷ এ ছাড়া তাঁরা শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসবিষয়ক প্রয়োজনীয় পরামর্শ-নির্দেশনাও দিয়েছেন৷

কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার উদ্যোগ শুরু করলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ ও ইনস্টিটিউটগুলো এই পর্যায়ে অনলাইন ক্লাসকে ‘সিরিয়াসলি’ নিচ্ছে না৷ এই ক্লাসে উপস্থিতির বাধ্যবাধকতাও থাকছে না অনেক বিভাগে৷ তারা অনলাইন ক্লাসকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখছে৷ কিছু বিভাগে ইতিমধ্যে অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছে আর বাকি বিভাগগুলোতে আগামীকালের মধ্যেই শুরু হচ্ছে৷

মুঠোফোন বা কম্পিউটারে ইন্টারনেটের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অ্যাপে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভিডিও কনফারেন্সিংয়ে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে হয় অনলাইন ক্লাস৷ দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বেশ কিছুদিন ধরেই এই ক্লাস চলছে৷ কোনো কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অ্যাপে অনলাইন ক্লাস নিলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেবল একটি বিভাগের তা আছে৷ ফলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে জুম ও গুগল মিটের মতো অ্যাপগুলো ব্যবহার করে ক্লাস নিতে হচ্ছে৷ এ ধরনের ক্লাসের জন্য অ্যাপগুলোতে আগে যে খরচ লাগত, করোনা পরিস্থিতিতে তা অবশ্য কমেছে৷
শিক্ষার্থীরা বলছেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের অনেকেরই পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বল৷ অনেক শিক্ষার্থীর ইন্টারনেট প্যাকেজ কেনার সামর্থ্য নেই, কারও কারও আবার অনলাইন ক্লাসে অংশ নেওয়ার মতো ডিভাইসও নেই৷ তার ওপর দেশের সব এলাকায় ইন্টারনেটের গতি ভালো নয়৷ যেসব এলাকায় ইন্টারনেট দুর্বল, সেখানে অবস্থান করা শিক্ষার্থীদের অন্য সব সামর্থ্য থাকলেও তাঁরা অনলাইন ক্লাসে যথাযথভাবে অংশ নিতে পারবেন না৷

এদিকে শিক্ষকেরা বলছেন, অনলাইন ক্লাস নেওয়ার জন্য প্রযুক্তিগত যেসব টুল প্রয়োজন, সেগুলো সহজলভ্য৷ কিন্তু এ ধরনের ক্লাস নেওয়া নতুন অভিজ্ঞতা হওয়ায় অনেক বিভাগের শিক্ষকেরা অনলাইন ক্লাস নিতে গিয়ে সমস্যায় পড়বেন৷ কারণ, বিভিন্ন বিভাগে এমন অনেক শিক্ষক আছেন, যাঁদের প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা কম, প্রযুক্তি ব্যবহারে তাঁরা দক্ষও নন৷ যদিও অনলাইন ক্লাস নেওয়া শুরু হলে অল্পদিনেই শিক্ষকেরা এই প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হয়ে উঠবেন বলে মনে করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ৷

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের একটি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে অনলাইন ক্লাস শুরুর উদ্যোগ নিলেও এই ক্লাসকে আমরা তেমন সিরিয়াসলি নিচ্ছি না৷ কারণ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সংকটের বিষয়গুলো আমরা জানি৷ আমাদের অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের অ্যাটেনডেন্সের বাধ্যবাধকতা থাকবে না, কোনো পরীক্ষা নেওয়া হবে না৷ কেবল শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগের একটি মাধ্যম হিসেবে অনলাইন ক্লাস নেওয়া হবে, যাতে দীর্ঘ ছুটির কারণে আমাদের শিক্ষার্থীরা অবসাদগ্রস্ত কিংবা পড়াশোনার ট্র্যাক থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায়৷’
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের বিভাগগুলোতে তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক ক্লাস সমান্তরালে না হলে শিক্ষা পূর্ণাঙ্গ হয় না৷ এসব বিভাগে অনলাইন ক্লাসের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দিহান খোদ বিভাগীয় প্রধানেরাও৷ প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই ক্লাস কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়েও স্পষ্ট নন শিক্ষকেরা৷

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলছেন, তাঁর বিভাগের শিক্ষকেরা অনলাইন ক্লাস নিতে রাজি হয়েছেন৷ তবে অনলাইনে শুধু তত্ত্বীয় ক্লাসগুলো হবে, ব্যবহারিক ক্লাস নেওয়া সম্ভব নয়৷ এই শিক্ষক বললেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের যে সভা থেকে অনলাইন ক্লাস নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে, সেখানে আমি বলেছিলাম যে আমাদের অনুষদের বিভাগগুলোতে তত্ত্বীয়-ব্যবহারিক ক্লাস সমান্তরালে না হলে সিলেবাস পূর্ণাঙ্গ হবে না৷ কিন্তু উপাচার্য বলেছেন, ব্যবহারিকটা আপাতত থাক, তত্ত্বীয় ক্লাসগুলো চালিয়ে যান৷ ফলে আমাদের অনুষদে অনলাইন ক্লাস কতটুকু ফলপ্রসূ হবে, শিক্ষার্থীদের কতটা ইনভলভ করতে পারব, জানি না, কিন্তু প্রশাসনের সিদ্ধান্ত তো মানতেই হবে৷’

অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় নীতিমালা প্রণয়ন, তথ্যপ্রযুক্তিগত অবকাঠামো নির্মাণ, আর্থিক বিষয়সহ আনুষঙ্গিক বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরির জন্য সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) এ এস এম মাকসুদ কামালকে প্রধান করে একটি কমিটি করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ৷ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সীমাবদ্ধতার কথাগুলো জানালে এই অধ্যাপক প্রথম আলোর কাছে স্বীকার করেছেন যে অনলাইন ক্লাস নেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় সক্ষমতা তাঁদের পুরোপুরি নেই৷ তবে ক্লাস শুরু হলে সবাই ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন বলে মনে করেন তিনি৷
অধ্যাপক মাকসুদ কামাল বলেছেন, উন্নত দেশের মতো আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই৷ এই সক্ষমতা এক দিনে গড়ে ওঠার বিষয়ও নয়৷ তাঁরা জরিপ চালিয়ে দেখেছেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থীর স্মার্টফোন আছে৷ সে ক্ষেত্রে প্রযুক্তিকে ব্যবহার না করার কারণে শিক্ষার্থীরা যাতে সেশনজটে না পড়েন, তার জন্যই অনলাইন ক্লাস চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে৷
এই শিক্ষক আরও বলেন, ‘যেসব এলাকায় ইন্টারনেট দুর্বল, সেখানে অবস্থান করা শিক্ষার্থীদের অনুরোধ করব, তারা যেন ঘর থেকে বের হয়ে অন্য কোথাও গিয়ে ক্লাসে অংশ নেয়, যেখানে গিয়ে ক্লাসে অংশ নিতে তাদের সুবিধা হয়৷ বিজ্ঞান অনুষদের ব্যবহারিক ক্লাসগুলো যাতে পড়ে দ্রুত সময়ে নেওয়া যায়, সেই ব্যবস্থা করা হবে৷ আর শিক্ষকদের অনেক দিন থেকে অনলাইন ক্লাস নেওয়ার টুলগুলো সম্পর্কে অবহিত করা হচ্ছে৷ সেগুলো ব্যবহার করে বিভিন্ন বিভাগের চেয়ারম্যানরা ইতিমধ্যে শিক্ষকদের সঙ্গে সভা-সেমিনারও করেছেন৷ ফলে একটা সারফেইস লেভেলের দক্ষতা তাঁদের এরই মধ্যে গড়ে উঠেছে, যা ক্লাস নেওয়ার ক্ষেত্রে কাজে লাগবে৷ এ ছাড়া তাদের তাৎক্ষণিক সহযোগিতার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি সেল আছে৷’
এদিকে গতকাল রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে শুরু হওয়া অনলাইন ক্লাসে ব্যাচগুলোর অন্তত ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছেন বলে জানা গেছে৷ যদিও ক্লাস শুরু হওয়া সব বিভাগে এই হার এক রকম নয়৷ কোথাও ৬০ শতাংশ, কোথাও আবার ৩০-৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী ক্লাসে অংশ নিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন
উচ্চশিক্ষা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন