বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমাদের স্কুলের কথাই বলি। ১৬ ডিসেম্বর বা ২৬ মার্চ এলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডিসপ্লেতে অংশগ্রহণের জন্য বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়। একটু সহযোগিতা পেলেই ওরা সংগঠিত হয়ে যায়। প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। নিজেরাই বিভিন্ন থিম দাঁড় করিয়ে শিক্ষক–শিক্ষিকাদের সঙ্গে, প্রয়োজনে আমার সঙ্গে শেয়ার করে। আমি ওদের উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখে, ওদের সৃজনশীলতা দেখে আনন্দিত হই। খুব সুন্দর করে ডিসপ্লের প্রস্তুতি নেয়, যাতে যেকোনো মূল্যে প্রতিযোগিতায় প্রথম হতে পারে। প্রথম হতে না পারলে মন খারাপ করে। আমি ওদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে শান্ত করি। শিশু-কিশোরদের মন তো, সামান্যতেই খারাপ হয়ে যায়। আবার অল্প সান্ত্বনাতেই বিক্ষুব্ধ ভাবটা কেটে যায়।

একটা বিষয় দেখে আমি খুব চমকিত হই। ডিসপ্লেতে শিক্ষার্থীরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করে। তাদের ডিসপ্লেতে মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ ও সাহসিকতা যেমন উঠে আসে, তেমনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে আসে পাকিস্তানি বাহিনী আর রাজাকারদের নীচতা ও বর্বরতা। শুধু তা–ই নয়, শিক্ষার্থীরা তাদের অভিনয়ের মাধ্যমে তুলে আনে কৃষক, শ্রমিক, নারী-পুরুষ, ছাত্র-শিক্ষকসহ সর্বসাধারণের দুঃখ–দুর্দশার কথা। তারা বইপত্রে মুক্তিযুদ্ধের কথা পড়ে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকে যে তারা গভীরভাবে উপলব্ধি করে, তা তাদের ডিসপ্লে বা অভিনয় না দেখলে বোঝা কঠিন।

এসব ডিসপ্লে, নাচ, গান ও অভিনয়ের মাধ্যমে তারা যে শুধু একাত্তরকে তুলে আনে, তা-ই নয়, বরং সমসাময়িক কালের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও তুলে আনে। যেমন মাদক, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, ইভ টিজিং, বাল্যবিবাহ ইত্যাদির কুফল সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করার চেষ্টা করে।

এবার স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্‌যাপিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এবারের ডিসপ্লেও হয়েছে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে জমজমাট ও বর্ণাঢ্য। এতে শিক্ষার্থীরা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে আমাদের বিজয়ের মহানায়ক হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আর সংগ্রামী জীবনের কথা। তুলে এনেছে বাঙালিদের চূড়ান্ত বিজয় ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর লজ্জাজনক পরাজয়ের কাহিনি। তুলে ধরেছে করোনার ভয়াবহতা আর এর বিরুদ্ধে এ দেশের মানুষের সংগ্রামের কথা। তারা তুলে ধরেছে বাংলাদেশকে ডিজিটাল দেশে রূপান্তরের কথা। পাশাপাশি তুলে ধরেছে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার কথা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষিত রূপকল্পের কথাও উঠে এসেছে। এককথায় একাত্তর থেকে শুরু করে সমসাময়িক কালের সব ধরনের বিষয়ই সর্বসাধারণের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে আমাদের কোমলমতি শিশু–কিশোরেরা।

আমাদের শিশু–কিশোরদের উচ্ছ্বাসপূর্ণ উপলব্ধি ও অভিব্যক্তি দেখে বেশ কয়েকবার চোখের পানি ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছি। ওরা দেশের এত সব বিষয় নিয়ে ভাবে! ভাববেই তো। ওরা তো আর আগেকার দিনের শিশু–কিশোরদের মতো নয়। ওদের সামনে সারা বিশ্বের তথ্যভান্ডার খোলা। ইন্টারনেটের এই যুগে ওরা একটা মাত্র ক্লিকের মাধ্যমেই শতসহস্র তথ্য হাতের কাছে পেয়ে যায়। সহজেই জেনে যায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধে কার কী ভূমিকা ছিল। বর্তমানে কে কী করছে। আমি ভাবি, এই অতি বুদ্ধিমান বর্তমান প্রজন্মের একটু পরিচর্যা হলে ওরা সহজেই সমৃদ্ধ জনসম্পদে পরিণত হবে। ২০৪১ সালের যে উন্নত বাংলাদেশের কথা আমরা বলছি, তার কান্ডারি তো হবে ওরাই। তাই ওদের দেশপ্রেমিক আর উন্নত চিন্তা–চেতনার নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালানো তো আমাদের অত্যন্ত জরুরি একটা কাজ।

আমরা যারা এ দেশের সিনিয়র নাগরিক, তাদের দায়িত্ব অনেক। বিশেষ করে আমাদের কার্যকলাপ শিশু–কিশোরদের সামনে যদি আদর্শস্থানীয় না হয়, তবে তো ওদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়বে। আমরা শুধু ছোটদের সুন্দর সুন্দর উপদেশ দেব আর নিজেরা উল্টোপাল্টা কাজ করব, তা কী করে হয়? লাখো শহীদের রক্তে ভেজা আমাদের এই মাটি। এখানে দাঁড়িয়ে বুকভরে নিশ্বাস নেওয়ার অধিকার সবার আছে। বিশেষ করে আমাদের শিক্ষার্থীদের সুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠার, আনন্দঘন পরিবেশে শিক্ষা লাভ করার ও মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার অধিকার আছে। ওদের এসব অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের শিক্ষার্থীরা সুস্থ মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারলেই একটা সুন্দর সমাজ গড়ে উঠবে, যা উন্নত ও আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে সহায়ক হবে।

আমাদের বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা মুক্তিযুদ্ধকে জানে পড়ে, নাটক–সিনেমা দেখে আর ইন্টারনেট ঘেঁটে। কিন্তু আমাদের অধিকাংশ নাটক–সিনেমার ক্ষেত্রেই দায়সারা গোছের কাজ হচ্ছে। আমাদের দরকার আরও অনেক হুমায়ূন আহমেদ, নির্মলেন্দু গুণ, জহির রায়হান। আমাদের বিজয়ের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ভারতের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনায় একটা সিনেমা নির্মিত হচ্ছে। এমন আরও অনেক ভালো কাজ দরকার। আমাদের ভবিষ্যতের কান্ডারিদের জাতির প্রকৃত ইতিহাস জানার সুযোগ করে দিতে হবে।

আরেকটা কথা না বললেই নয়; বিশ্ব মহামারি করোনার কারণে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটাই বাধাগ্রস্ত হয়ে আছে। করোনা শিগগিরই চলে যাবে—এমনটা হয়তো হবে না। তাই করোনার মধ্যেই আমাদের শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নেওয়ার বিকল্প পথ খুঁজে বের করতে হবে। আর এ পথ যত তাড়াতাড়ি খুঁজে বের করতে পারব, ততই মঙ্গল। আশার কথা হলো এর মধ্যেই আমরা এসএসসি পরীক্ষা নিতে পেরেছি, যার ফলাফলও প্রকাশিত হয়েছে। এইচএসসি পরীক্ষাও শেষ হয়েছে। এভাবেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের এগিয়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

বহু প্রতীক্ষার পর হলেও মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষার্থীদের ভোগান্তিও হয় অনেক।

এমনও দেখা যায়, একজন পরীক্ষার্থীর আজ দুপুরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা; কাল সকালে তারই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা, আবার বিকেলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা। এভাবে একজন পরীক্ষার্থীর ওপর দিয়ে কতটা ধকল যায়, তা কি আমরা কখনো ভেবে দেখেছি? কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় মিলে গুচ্ছ পদ্ধতিতে যে পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছে, তাতেও যে শিক্ষার্থীদের খুব সুবিধা হয়েছে, এমনটা বলা যাবে না। ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা প্রথমবার ফি দিয়ে আবেদন করেছে। ফলাফল প্রকাশের পর আবার প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয় নির্বাচনের জন্য আলাদা আলাদাভাবে আবেদন করতে হচ্ছে। এতে অর্থ যেমন ব্যয় হচ্ছে, কালক্ষেপণও হচ্ছে তেমন। আমাদের সন্তানদের সুবিধা হবে—এমন সুসমন্বিত একটা পদ্ধতি আমরা তো বের করতে পারলাম না।

বর্তমান সরকারের আমলে আমাদের দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শিতা, অক্লান্ত পরিশ্রম ও বিরামহীন প্রচেষ্টার ফলে উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করছে দেশ। আমরা অনেক আগেই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করতে পেরেছি। সব বাধা–বিপত্তি পেরিয়ে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ পর্যায়ে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন বাস্তবতা। যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষেত্রে উন্নতি চোখে পড়ার মতো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও আমরা এগিয়েছি অনেক।

উড়ালসেতুও পেয়েছি আমরা। মেট্রোরেলের কাজও তো শুরু করে দিয়েছি। হাওরাঞ্চলে উড়ালসড়কও হয়তো পেয়ে যাব কয়েক বছরের মধ্যেই। আধুনিক বাংলাদেশ এখন আর শুধু স্বপ্ন নয়; বরং বাস্তবতা। এ সবকিছুর ইতিবাচক প্রভাব যে আমাদের শিক্ষার্থীদের ওপর পড়বে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এরপরও আমাদের অনেক কাজ বাকি আছে। আমাদের সমাজকে যেকোনো মূল্যে মাদক, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বাল্যবিবাহমুক্ত করে অনুকূল সামাজিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক–কর্মচারীর স্বল্পতাসহ সব ধরনের ঘাটতি পূরণ করে শিক্ষার্থীদের জন্য একটা শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে আমাদের শিক্ষার্থীরা আনন্দচিত্তে ও নির্বিঘ্নে শিক্ষা লাভ করতে পারে।

এবারের বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ ও ডিসপ্লেতে শিক্ষার্থীদের চোখে–মুখে যে অভিব্যক্তি দেখেছি, তাতে আমি খুবই আশান্বিত হয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে এ দেশের গর্বিত নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা তীব্রভাবেই ওদের মধ্যে আছে বলে আমার বিশ্বাস। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী আমরা উদ্‌যাপন করেছি। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে শপথও নিয়েছি। এই শপথকে আমরা যেন লোকদেখানো শপথে পরিণত না করি। বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করার যে প্রচেষ্টা প্রধানমন্ত্রী চালিয়ে যাচ্ছেন, আমাদের উচিত তাতে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করা। আর আমরা যদি লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারি, তবে আমাদের সন্তানেরা উন্নত দেশের গর্বিত নাগরিক যেমন হবে, তেমনি নিশ্চিত হবে তাদের গুণগত শিক্ষাও। আমরা কি পারি না আমাদের সন্তানদের উন্নত ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাদের দেশপ্রেমিক ও উপযুক্ত বিশ্ব নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে?

*লেখক: মো. মোতাহার হোসেন, প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত), মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা।

উচ্চশিক্ষা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন