আগামী সপ্তাহে আসতে পারে রাশিয়ার করোনার টিকা

বিজ্ঞাপন
default-image

রাশিয়ার পক্ষ থেকে একে রীতিমতো ‘চমক’ বলা যায়। খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই টিকা অনুমোদন দেওয়ার সব প্রস্তুতি সেরে ফেলেছে দেশটি। আন্তর্জাতিক একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় আগামী সপ্তাহেই কোভিড-১৯ টিকার নিবন্ধন দেওয়ার সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে রাশিয়া। অনুমোদন পেতে যাওয়া টিকাটি যৌথভাবে তৈরি করেছে দেশটির গামেলিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। ১২ আগস্ট হতে পারে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

দেশটির গবেষকেরা বলছেন, টিকাটির তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা চলছে। এ পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। টিকাটি এতে নিরাপদ হিসেবে প্রমাণিত হলে তা স্বাস্থ্যকর্মী ও দেশের জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের প্রথমে প্রয়োগ করা হবে। নিবন্ধন দেওয়ার পর টিকাটি আরও ১ হাজার ৬০০ মানুষের ওপর প্রয়োগ করে এর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা হবে।

স্পুতনিক নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এপ্রিল মাসে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিভিন্ন ওষুধের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার সময় সংক্ষিপ্ত করার আদেশ দেন। এর মধ্যে করোনাভাইরাসের টিকার পরীক্ষার বিষয়টিও ছিল। শুরুতে গত ১৭ জুন টিকাটি ৭৬ জন স্বেচ্ছাসেবীর ওপর প্রাথমিক পরীক্ষা হয়। তাঁদের মধ্যে অর্ধেককে তরল টিকা ইনজেকশনের মাধ্যমে পুশ করা হয় আর বাকি অর্ধেককে দ্রবণীয় পাউডার হিসেবে টিকাটি দেওয়া হয়। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করে, প্রাথমিক পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রত্যেক ব্যক্তির শরীরে প্রতিরোধী সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এ টিকার কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।

রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাশিয়ার শিল্পমন্ত্রী ডেনিস মানতুরভ বলেন, ‘সেপ্টেম্বরে আমরা টিকাটির ব্যাপক উৎপাদনে যাওয়ার জন্য সময় গুনছি।’

মঙ্গলবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে রাশিয়াকে টিকা তৈরিতে সব ধরনের নীতিমালা মানার আহ্বান জানানো হয়। মস্কো দ্রুত টিকা তৈরির পরিকল্পনা জানানোর পর এর নিরাপত্তা কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে এ আহ্বান জানানো হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মুখপাত্র ক্রিস্টিয়ান লিন্ডমেয়ার জেনেভায় জাতিসংঘের এক আয়োজনে বলেছেন, প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা ও চর্চা আছে। টিকা খুঁজে পাওয়া বা টিকা কীভাবে কাজ করে, তা জানা ও টিকা তৈরির সব কটি ধাপের মধ্য দিয়ে যাওয়ার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে।

গামেলিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তৈরি টিকা ছাড়াও রাশিয়ার ভেক্টর স্টেট রিসার্চ সেন্টার অব ভাইরোলজি অ্যান্ড বায়োটেকনোলজির পক্ষ থেকেও টিকা তৈরির কথা জানানো হয়েছে।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য আইন বিশেষজ্ঞ লরেন্স গোস্তিন বলেন, ‘আমি দুশ্চিন্তা করছি যে রাশিয়া তড়িঘড়ি করে যে টিকা আনতে চলেছে, তা শুধু অকার্যকরই নয়, বরং অনিরাপদ হতে পারে।’

যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অ্যান্টনি ফাউসি রাশিয়ার দ্রুত টিকা তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি আশা করি, চীন ও রাশিয়া সবার আগে টিকা আনার জন্য পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে পরীক্ষা শেষ না করেই টিকা সরবরাহ করা শুরু হচ্ছে, তাতে সমস্যা তৈরি হবে।’

টিকা তৈরি ও পরীক্ষা করতে যেখানে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়, সেখানে অনেকটা রাতারাতিই শতভাগ সফল টিকা তৈরি নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। নিউইয়র্ক পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মস্কোতে কিছু স্বাস্থ্যকর্মী ও সরকারি কর্মকর্তাকে টিকা নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। রাশিয়ার দাবি, এটা বিশ্বের প্রথম কোভিড-১৯ টিকা। ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় এটি নিরাপদ প্রমাণিত হওয়ার পর তা গ্রহণে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। মস্কোভিত্তিক গামেলিয়া ইনস্টিটিউটের তৈরি টিকাটি গ্রহণের জন্য একটি হাসপাতাল স্বাস্থ্যকর্মীদের তালিকা করেছে। স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে সরকারি কর্মকর্তারাও টিকা গ্রহণের চিঠি পাওয়ার কথা বলেছেন।

রাশিয়ান ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের সঙ্গে গামেলিয়া ইনস্টিটিউটের যৌথভাবে তৈরি টিকাটি শর্ত সাপেক্ষে এ মাসেই নিবন্ধন পাচ্ছে। তবে শর্তটি হচ্ছে, এটি আরও ১ হাজার ৬০০ জনের ওপর পরীক্ষা করা লাগবে। সেপ্টেম্বর মাস থেকে এ টিকার উৎপাদন শুরু হবে বলে গত ২৯ জুলাই প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে জানিয়েছেন ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী তাতিয়ানা গোলিকোভা।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, আগামী অক্টোবরে জনগণের বড় অংশের মধ্যে টিকা প্রয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে রাশিয়া। দেশটির সরকার এমন তথ্য জানিয়েছে। রাশিয়ার শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী ডেনিস মানতুরভ দেশটির তাস সংবাদ সংস্থাকে জানান, ২০২১ সালের মধ্যে প্রতি মাসে তাঁরা কয়েক লাখ টিকার ডোজ তৈরি করবেন বলে আশা করছেন।

এএফপি ও সিএনবিসির খবরে জানা যায়, দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী মিখাইল মুরাসকো বলেন, মস্কোভিত্তিক গামেলিয়া ইনস্টিটিউটে করোনাভাইরাসের টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ হয়েছে। রুশ সরকারি সংবাদ সংস্থা আরআইএর গত শনিবারের খবরে জানানো হয়, মস্কোর দাবি, পরীক্ষায় কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই আশানুরূপ সাড়া মিলেছে। রাশিয়ার ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (আরডিআইএফ) এই টিকার ট্রায়ালে অর্থায়ন করছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, চলতি মাসেই রাশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই ভ্যাকসিনের অনুমোদন দেবে। এখন অনুমোদন পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরির কাজ চলছে।

নিজস্ব টিকা পরীক্ষায় সফল হলেও রাশিয়ার বিরুদ্ধে টিকা হ্যাক করার অভিযোগও উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডা তাদের গবেষণাসংক্রান্ত তথ্য হ্যাক করার অভিযোগ তুলেছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। গত মাসে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাদের টিকা পরীক্ষার প্রথম ধাপের ফল প্রকাশ করে। তারা জানায়, কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধী সক্ষমতা দেখিয়েছে তাদের টিকা। এ ফল ঘোষণার কিছু সময় পরই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা জানায়, এপিটি ২৯ নামের একটি দল ব্রিটিশ পরীক্ষাগারগুলোয় সাইবার হামলা শুরু করে এবং গবেষণা তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালায়। তারা প্রায় নিশ্চিত যে এটি রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার অংশবিশেষের কাজ।

তবে এ ধরনের অভিযোগ মস্কো অস্বীকার করেছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, ‘এ হামলার সঙ্গে রাশিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।’

এদিকে টিকা নিয়ে রাশিয়ার তোড়জোড়ের মধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিরাশার কথা বলে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক মাইক রায়ান বলেন, ‘তৃতীয় ধাপ মানে টিকা চূড়ান্ত নয়। এর অর্থ এই প্রথম কোনো টিকা সাধারণ মানুষের ওপর পরীক্ষা করে দেখার উপযোগী হয়েছে। অন্যথায় এটি স্বাস্থ্যবান মানুষের ওপর প্রয়োগ থেকে দেখতে হবে যে তা সাধারণ সংক্রমণের ক্ষেত্রে সুরক্ষা দিতে পারে কি না।’

এর আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস বলেন, বিজ্ঞানীরা নিরাপদ ও কার্যকর টিকা খুঁজে পাবেন—এমন আশা থাকলেও এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। করোনার টিকা অনুসন্ধানে অগ্রগতির কথা বললেও এ নিয়ে সতর্ক করেন তিনি। আশা থাকলেও এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে বলেন, কখনো এর খোঁজ নাও মিলতে পারে।

বর্তমানে বিশ্বে ছয়টি সম্ভাব্য টিকা মানবপরীক্ষার তৃতীয় ধাপে রয়েছে। এর মধ্যে ফাইজার ও মডার্নার তৈরি টিকাও রয়েছে। বিশ্বজুড়ে ১৫০টির বেশি টিকার উন্নয়নকাজ চলছে। তবে এখন পর্যন্ত সব কটি টিকার কেবল নিরাপত্তার বিষয়টি অল্প কিছু মানুষের ওপর প্রয়োগ করে দেখা হয়েছে। এতে টিকার প্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।

ফাউসি বলেছেন, ‘এ বছর শেষ হওয়ার আগে টিকা আসবে। এমনকি তার আগেও চলে আসতে পারে। এ বছরের শেষ নাগাদ অন্তত একটি টিকা নিরাপদ ও কার্যকর বলে প্রমাণিত হবে।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন