default-image

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক কায়কোবাদ বলেছেন, ‘দেশের ছেলেমেয়েরা প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় ভালো করছে। এই ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা, শিশুদের মধ্যে অফুরন্ত প্রাণশক্তি লেলিয়ে দিতে হবে প্রোগ্রামিং ও জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষার মাধ্যমে। আমাদের মাথায় বিনিয়োগ করতে হবে।’ রাজধানীর প্যানপ্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের নিরালা কক্ষে রোববার সকালে এক মতবিনিময় সভায় অধ্যাপক কায়কোবাদ এ কথা বলেন।

দেশের স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে আগ্রহী করতে এবং দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য দ্বিতীয়বারের মতো শুরু হয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক-প্রথম আলো আন্তস্কুল ও কলেজ প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা-২০১৯ (আইএসসিপিসি)। সে লক্ষ্যেই এই মতবিনিময় সভার আয়োজন।

সভায় অধ্যাপক কায়কোবাদ বলেন, ‘শুধু রেমিট্যান্স, পোশাকশিল্প দিয়ে আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হতে পারব না। আমাদের কোটি মানুষ যে পয়সা বাইরের থেকে দেশে পাঠান, বাংলাদেশে অবস্থান করে কয়েক লাখ বিদেশি সে পরিমাণ টাকা নিয়ে যায়। সেই কাজগুলো করতে হলে, আমাদের প্রোগ্রামিং, প্রযুক্তিগত জ্ঞান শিখতে হবে। এই টাকাগুলো ধরতে দেশেই এসব প্রযুক্তি বানাতে হবে, সে অনুযায়ী দক্ষ করে তুলতে হবে শিক্ষার্থীদের। ছেলেমেয়েরা যে পারে, দক্ষতার অসংখ্য প্রমাণ আছে।’

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাসের এজাজ বিজয় বলেন, ‘২০৩০ সালের মধ্যে ৩ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান করতে হবে বলে জরিপে এসেছে। কারণ কর্মনির্ভর কাজগুলো সময়ে বিলুপ্ত হচ্ছে। ক্রিটিক্যাল থিংকিংসহ বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করতে পারে, এমন দক্ষ মানুষ আমাদের দরকার। এর জন্য প্রস্তুতি এখনই দরকার। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রোবটিকস, চালকহীন গাড়ি, থ্রি-ডি পেইন্টিং—এগুলো আমাদের ভবিষ্যৎ। এর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এর প্রয়োজনীয়তা থেকেই কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে যাতে আমাদের শিক্ষার্থীরা দক্ষ হতে পারে, সে জন্য এই প্রতিযোগিতা শুরু করা।’

প্রোগ্রামিংয়ে ভালো করতে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের দরকার বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবটিকস অ্যান্ড মেকাট্রনিকস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক লাফিফা জামাল। তিনি বলেন, বছরজুড়ে শিশুদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আর শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিতে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষকও দরকার। এই অভাব পূরণ করতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগগুলো। এ ছাড়া অনলাইনে প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত ভিডিও টিউটোরিয়াল রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

ইন্টারন্যাশনাল কলেজিয়েট প্রোগ্রামিং কনটেস্টের এশিয়া অঞ্চলের বিচারক ও সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক শাহরিয়ার মনজুর বলেন, কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয় প্রতিযোগিতায় এ উদ্যোগে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অনলাইন ভার্সনেও এই প্রতিযোগিতার কনটেন্টগুলো রাখতে হবে। প্রোগ্রামিংয়ের বইগুলো প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে দেওয়া গেলে শিক্ষার্থীরা আরও উৎসাহিত হবে বলে তিনি মনে করেন তিনি।

বুয়েটের অধ্যাপক মোহাম্মদ সোহেল রহমান বলেন, প্রোগ্রামিংয়ে ভালো করতে হলে শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণমূলক দক্ষতায় (অ্যানালিটিক্যাল স্কিল) জোর দিতে হবে। প্রোগ্রামিং মানে শুধু প্রোগ্রামিংয়ের ভাষা জানা বা প্রোগ্রামিং বানাতে পারা নয়, এর পাশাপাশি প্রোগ্রামিংয়ের সমস্যাগুলোর সমাধানের দক্ষতা বাড়াতে হবে।

সভা সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর যুব কর্মসূচির সমন্বয়ক মুনির হাসান। এবারের প্রতিযোগিতা নিয়ে তিনি বলেন, গতবারের প্রতিযোগিতা ৬০টি স্কুল নিয়ে শুরু হয়েছিল। এবার ১০০টি স্কুল নিয়ে শুরু হবে। এবারের আসরে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণও থাকছে। সিলেট ও চট্টগ্রামে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা হবে। এবার দ্বিতীয়বারের মতো প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার আয়োজনে থাকছে একাধিক পর্ব—স্কুল অ্যাকটিভেশন, আঞ্চলিক কর্মশালা, অনলাইন ও অফলাইন প্রতিযোগিতা, বাছাই প্রতিযোগিতা, চূড়ান্ত পর্ব এবং বিজয়ী দলের জন্য প্রোগ্রামিং ক্যাম্প। ফলাফলের ভিত্তিতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাঁচটি বিদ্যালয়কে দেওয়া হবে তিনটি করে ল্যাপটপ। এ বছরের অক্টোবরের শেষের দিকে ঢাকায় চূড়ান্তপর্ব অনুষ্ঠিত হবে।

মতবিনিময় সভায় প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা সব সময় ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের কথা ভাবি। সে লক্ষ্যে এবারের প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতাটি গতবারের চেয়ে আরও বড়, ফলপ্রসূ ও প্রস্তুতিমূলক করার চেষ্টা আমাদের থাকবে।’

অনুষ্ঠান শেষে গতবার আন্ত প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া দেশের বিভিন্ন জেলার পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে তিনটি করে ল্যাপটপ তুলে দেওয়া হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হলো গাজীপুরের মাওনা উচ্চবিদ্যালয়, ময়মনসিংহের হাতেম তাই উচ্চবিদ্যালয়, পাবনার ভাঙ্গুড়া জরিনা রহিম বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, শরীয়তপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. হুমায়ুন কবির উচ্চবিদ্যালয় ও বিরল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়। গতবার প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রোগ্রামিং নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যায়। এদের উৎসাহ দিতেই এসব ল্যাপটপ দেওয়া হয়।

দিনাজপুরের বিরল উপজেলার বিরল আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫৮০। তাদের বিদ্যালয়ে কোনো কম্পিউটার ল্যাব নেই। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মাঝে কম্পিউটার ও প্রোগ্রামিং নিয়ে প্রবল আগ্রহ। সে আগ্রহকে উৎসাহ দিতে প্রতিষ্ঠানটিকে তিনটি ল্যাপটপ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক মো. মহিউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার স্কুলের শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রোগ্রামিং নিয়ে অনেক আগ্রহ। তাই ওরা কম্পিউটার ছাড়াই প্রোগ্রামিং ক্লাব খুলেছে। স্কুলে দুইটি কম্পিউটার আছে। এর সঙ্গে এ তিনটি ল্যাপটপ দিয়ে আমরা একটা ল্যাব চালু করব।’

সভায় আরও বক্তব্য দেন ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের অধ্যাপক বিলকিস জামাল ফেরদৌসী, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সাদিয়া হামিদ কাজী, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশের কান্ট্রি হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স, ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিং বিটপী দাশ চৌধুরী, বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটির কোষাধ্যক্ষ মো. জাবেদুর রহমান, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারস অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের মহাসচিব মো. ইমদাদুল হক, স্কাইলার্ক সফটওয়্যার লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী বি এম শরীফ, টফডটকো-এর প্রধান নির্বাহী মাহমুদ রেদওয়ান, আইসিপিসি-২০১৮-এর বিচারক তাহমিদ রাফি, আইসিপিসি-২০১৮-এর ব্রোঞ্জ পদকজয়ী রেজওয়ান আরেফিন, এশিয়া আইসিপিসির রানার আপ রেদওয়ান মাহমুদ।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0