ছবি: ফেসবুক
ছবি: ফেসবুক

মিসরের মিসিং চিলড্রেন নামের একটি ফেসবুক পেজ হারানো শিশুদের খুঁজে পেতে সাহায্য করছে। ওই পেজে হারানো শিশুদের খুঁজে পেতে ছবি আপলোড করার পর এ পর্যন্ত ২ হাজার ৫০০ শিশুকে পাওয়া গেছে। বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে মিসরীয় এ ফেসবুক পেজ সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।

২০০৯ সালে ছয় বছর বয়সী মোস্তাফা কায়রোতে তার বোনের কাছে মায়ের সঙ্গে যাচ্ছিল। মিসরের উত্তরাঞ্চল থেকে এক দিনের যাত্রা তার জন্য সাত বছরের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাস্তায় মোস্তাফার মা অসুস্থ হয়ে পড়লে শিশুটিকে এক বোতল পানি কিনতে পাঠান। এরপর তিনি জ্ঞান হারান। মোস্তাফার বাবা অবসরে যাওয়া হিসাবরক্ষক আবদাল্লা বলেন, তিনি তাঁর স্ত্রীকে পরে হাসপাতালে খুঁজে পেলেও সন্তানকে আর খুঁজে পাননি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, তাঁর স্ত্রীকে ভর্তির সময় কোনো শিশু তার সঙ্গে ছিল না।

মোস্তাফা কায়রোতে হারিয়ে যায়। প্রায় আট বছরের দুর্দশা শুরু হয়। আবদাল্লা বলেন, ‘আমার স্ত্রী রাস্তায় চেয়ারে অচেতন হয়ে পড়ে ছিলেন। লোকজন তাঁকে হাসপাতালে দিয়ে আসে। মোস্তাফা যখন পানি আনতে গিয়েছিল, তখন এ ঘটনা ঘটে। লোকজন যখন তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যায়, তখন মোস্তাফার কথা কেউ খেয়াল করেনি। আমি দ্রুত স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে তার হারানোর কথা জানাই। তারা আমাকে আমার এলাকায় পুলিশকে জানাতে বলেন। আমি দ্রুত তা জানালেও আমাকে ৪৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে বলে।’

বিজ্ঞাপন

আবদাল্লা বলেন, ‘মোস্তাফা হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় পুলিশ কিছু না করায় আমি অসহায় বোধ করতে থাকি। আমার স্ত্রী কিছুটা সুস্থ বোধ করলে সন্তান হারানোর কথা জানার পর স্ট্রোকে আক্রান্ত হন এবং পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তাঁর মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করতে থাকে। এক বছরের মধ্যে তিনি মারা যান।

ওই সময় আমি স্ত্রী ও সন্তান দুজনকেই বাঁচাতে চেয়েছি। তাঁকে বাঁচাতে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে গিয়েছি। এক থানা থেকে আরেক থানায় গিয়ে সন্তানকে খুঁজেছি।’

২০১১ সালে মিসরে ব্যাপক আন্দোলনের ফলে পরিবর্তন আসে। প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক পদত্যাগে বাধ্য হন। ওই সময়টাতে আবদাল্লাকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে হয়। আন্দোলনের সময় অনেক থানায় আগুন লাগানো হয়। পুলিশের প্রতিবেদন পুড়িয়ে ফেলা হয়। ওই প্রতিবেদনের মধ্যে মোস্তাফাকে হারানোর প্রতিবেদনও ছিল।

২০১১ ও ২০১২ সালে আরেক ধাপ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যায় মিসর। ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট মুরসির বিরুদ্ধে আরেক দফা আন্দোলন শুরু হয়। দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০১৪ সালে এসে হারানো মোস্তাফাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য নতুন আবেদন করতে সক্ষম হন তিনি। সময় গড়িয়ে যেতে শুরু করলে আবদাল্লার আশা ফিকে হতে শুরু করে। এর মধ্যে তিনি মিসিং চিলড্রেন ফেসবুক পেজটির খোঁজ পান। তিনি অ্যাডমিনদের কাছে নিজের ছেলের ছবি পোস্ট করতে বলেন ওই পেজে। তবে, ফেসবুক পেজে ছবি দিয়ে হারানো মোস্তাফাকে পাওয়ার আশা করেননি তিনি।

২০১৫ সালের মাঝামাঝি মিসিং চিলড্রেন পেজটি চালু হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল হারানো ছেলেমেয়েদের গল্প বলে ও ছবি প্রকাশ করে সচেতনতা তৈরি করা। পেজটির উদ্যোক্তা ৪৩ বছর বয়সী প্রকৌশলী রামি আল-জেবালি। তিনি বলেন, ‘যখন পেজটি চালু করি তখন হারানো শিশুদের খোঁজার লক্ষ্য ছিল না। তবে প্রথম যখন কোনো হারানো শিশুকে ভাগ্যক্রমে পাওয়া যায়, তখন তিনি লক্ষ্য বদলে ফেলেন এবং হারানো শিশুদের খুঁজতে শুরু করেন। শুরুর কয়েক মাস পর ছবিগুলো থেকে একটি ছবির শিশু সম্পর্কে যোগাযোগ করা হয়। ফোন করে জানানো হয়, পোস্ট করা ছবির একটি ছেলে একটি বাড়ির সামনে ঘুমিয়ে আছে। শিশুটির ছবি তুলে পাঠালে আমরা নিশ্চিত হই। এরপর ওই শিশুটির মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিচয় নিশ্চিত হই।’

২০১৫ সালের জুলাই মাসে মোস্তাফার ছবি পোস্ট করার পর অনেকেই তাকে বিভিন্ন জায়গায় দেখার দাবি করেন। আবদাল্লা সব জায়গায় গেলেও তাকে খুঁজে পাননি। তবে ২০১৬ সালের ২৬ মে তিনি পেজটি প্রতিষ্ঠাতার স্ত্রীর কাছ থেকে ফোন পান, মোস্তাফাকে পাওয়া গেছে। তিনি যেন চাঁদ হাতে পেলেন।

মিসিং চিলড্রেনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন শিশু যত্ন কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, পেজে প্রকাশিত ছবির মতো একটি শিশু তাদের কেন্দ্রে রয়েছে। তারা চাইলে যাচাই করতে পারে। মিসিং চিলড্রেন তা যাচাই করে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করে। এ জন্য আবদাল্লার সঙ্গে যোগাযোগ করে। প্রথমে আবদাল্লার সন্দেহ তৈরি হলেও তাঁর সন্তানের পায়ের কাটা দাগ দেখে নিশ্চিত হন।

প্রায় সাত বছর পরে নিজের ছেলেকে ফিরে পান আবদাল্লা। তিনি গিজার ওই শিশু যত্ন কেন্দ্রে যান এবং মোস্তাফার সঙ্গে তার দেখা হয়। ২০০৯ সালের ওই ঘটনার পর কী ঘটেছিল তা জানতে পারেন তিনি। আবদাল্লা বলেন, মোস্তাফার মা অসুস্থ হলে লোকজন তাকে হাসপাতালে নেন। কিন্তু মাকে কোথাও না দেখে মোস্তাফা কাঁদতে শুরু করে। এ সময় কেউ তাকে পুলিশ স্টেশনে দিয়ে আসেন। ওই সময় সে শুধু নিজের নাম বলতে পারে। মায়ের কাছ থেকে আলাদা হওয়ার দুই মাইল দূরে ওই পুলিশ স্টেশন। সেখান থেকে তাকে শিশু যত্ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। আবদাল্লা বলেন, ‘ফেসবুক পেজটি না থাকলে মোস্তাফাকে খুঁজে পেতাম না।’

বিজ্ঞাপন

জেবালি বলেন, তাঁরা হারানো শিশুদের খোঁজার পাশাপাশি তাদের ভিক্ষাবৃত্তিতে না ব্যবহার করার জন্য কর্মসূচি শুরু করেছেন। এ ছাড়া রাস্তায় কোনো শিশুকে ভিক্ষা করতে দেখলে তার ছবি তুলে পোস্ট করার আহ্বান জানান তাঁরা। এরপর সেখান থেকে হারানো শিশুদের খোঁজা শুরু হয়। ছবি অনেক বেড়ে গেলে তারা ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেন। এভাবে তিনটি শিশুকে তারা খুঁজে পেয়েছেন। বর্তমানে তাদের কাছে মিসরের সবচেয়ে বড় হারানো শিশুদের একটি ডেটাবেইস রয়েছে।

বর্তমানে ওই পেজটিতে ১৩ জন কাজ করছেন এবং এর অনুসারী সংখ্যা ১৭ লাখ। তাদের বিশাল আইনজীবী, থেরাপিস্ট ও শিক্ষাবিদদের নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে, যাতে তারা হারানো শিশুদের ফেরাতে সাহায্য করতে পারেন। এ কারণে তাদের সফলতার হারও অনেক বেশি। তাদের কাছে ৭ হাজার হারানো বিজ্ঞপ্তি পোস্ট করে ২ হাজার ৫০০ শিশুকে খুঁজে পাওয়া গেছে।

দেশটির রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্র আল-আখবার জানিয়েছে, ২০১৮ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে দেশটির পুলিশ ২ হাজার ২৬৪টি শিশু হারানোর আবেদন পেয়েছে। তবে, বর্তমানে করোনা মহামারির কারণে শিশু হারানোর সংখ্যা এ বছর কম হবে বলে ধারণা করছেন জেবালি।

ফেসবুকের পক্ষ থেকে অন্যতম প্রভাব সৃষ্টিকারী পেজ হিসেবে একে ২০১৮ সালে নির্বাচন করা হয়। ফেসবুক তাদের ৫০ হাজার মার্কিন ডলার মঞ্জুরি দিয়েছে। তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট ও ফেস রিকগনিশন টুল তৈরি হয়েছে এর মাধ্যমে। মিসর ছাড়াও পেজটি রোমানিয়ায় কাজ শুরু করেছে।

মন্তব্য করুন