এ কি তবে প্লিনির করোটি?

বিজ্ঞাপন
default-image

ইতালির রোমের জাদুঘর স্টোরিকো নাজিওনেল দেল’আর্তে স্যানিতারিয়া। অন্য যেকোনো জাদুঘরের মতোই সেখানে রক্ষিত আছে একটি করোটি ও কিছু হাড়, যেমন থাকে হরহামেশা। এত দিন এ নিয়ে তেমন মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু এটিই এখন গবেষকদের ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। তবে অন্য কারণে। গবেষকেরা মনে করছেন, জাদুঘরে রক্ষিত এই করোটি বিখ্যাত প্লিনি দ্য এলডারের।

প্রায় দুই হাজার বছর আগের কথা। ৭৯ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে রোমান সাম্রাজ্যের পম্পেই উপকূলবর্তী ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরি থেকে হঠাৎ অগ্ন্যুৎপাত হতে শুরু করে। এরই কাছাকাছি অঞ্চলে থাকতেন তৎকালীন রোমান সম্রাট টাইটাসের নৌবহরের অন্যতম অ্যাডমিরাল প্লিনি দ্য এলডার। ইতিহাসে প্রথম বিশ্বকোষ রচয়িতা হিসেবে স্বীকৃত প্লিনি দ্য এলডার একই সঙ্গে ছিলেন প্রাকৃতিক ইতিহাসের প্রতি প্রচণ্ড কৌতূহলপ্রবণ এক মানুষ। ছিলেন একজন সমরবিদও। তাঁর লিখিত ‘ন্যাচারালিস হিস্টোরিয়া’–কে (ন্যাচারাল হিস্টোরি) এখনো বিশ্বকোষ ঘরানার গ্রন্থের অন্যতম আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্টোরিকো নাজিওনেল দেল’আর্তে স্যানিতারিয়ায় সংরক্ষিত মাথার খুলিটি এই প্লিনি দ্য এলডারেরই বলে মনে করা হচ্ছে।

মাথার খুলিটি নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য ছিল না। কিন্তু হঠাৎ করেই পুরোনো বিতর্কটি সামনে এল। দীর্ঘদিন ধরেই বহু গবেষক বলে আসছেন যে তৎকালীন রোম সাম্রাজ্যের পম্পেই উপকূলের কাছে স্টেবি নামক স্থানে ’৭৯ সালে ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতে মারা যাওয়া বিখ্যাত অ্যাডমিরাল ও লেখক প্লিনি দ্য এলডারের খুলিটি সংরক্ষিত অবস্থায় এ জাদুঘরে রয়েছে। জাদুঘরের ক্যাটালগেও এই বিতর্কিত দাবিটির উল্লেখ ছিল। কিন্তু তা কেবল একটি দাবিই ছিল। মাঝেমধ্যে বিতর্ক হতো, এই যা।

কিন্তু এ বিষয় নিয়েই ইতালির জীববিজ্ঞানী, নৃবিজ্ঞানী ও রসায়নবিদদের একটি দল কয়েক বছর ধরে গবেষণা করে। তারা ১২০ বছর আগে পম্পেই উপকূলের কাছে খুঁজে পাওয়া মাথার খুলি ও এর নিম্ন-চোয়ালের বেশ কয়েকটি ফরেনসিক পরীক্ষা করে। গত ২৩ জানুয়ারি তারা তাদের গবেষণার ফল প্রকাশ করে। জাদুঘরটিতে এ উপলক্ষে আয়োজিত এক সম্মেলনে গবেষকেরা বলেন, খুলির চোয়ালের অংশ ছাড়া বাকি অংশটি প্লিনির হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্লিনির মৃত্যু সম্পর্কে যে ধরনের তথ্য রয়েছে, তার সঙ্গে এটি মিলে যায়। তবে নিম্ন-চোয়ালটি অন্য কোনো ব্যক্তির।

তবে এমন খবর শোনামাত্র উড়িয়ে দিয়েছেন প্রাচীন ইতিহাস, বিশেষত রোমের ইতিহাস নিয়ে বর্তমান বিশ্বে শেষ কথা বলে পরিচিতি পাওয়া ইতিহাসবিদ ম্যারি বিয়ার্ড। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক নতুন এ গবেষণা ফলাফলকে এক কথায় উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘আমি ৯০ শতাংশ নিশ্চিত যে এটি একটি ভুয়া খবর।’

কিন্তু এমন বক্তব্যেও খুব একটা পিছু হটেননি গবেষণা দলের অন্যতম সদস্য আন্দ্রে সিয়ন্সি। নিউইয়র্ক টাইমসকে এই ইতিহাসবিদ বলেন, ‘আমরা শতভাগ নিশ্চিত নই। তবে এর সঙ্গে প্লিনির খুলির সাদৃশ্য রয়েছে। অনেকগুলো কাকতালকে এক সূত্রে গেঁথেই এমন সিদ্ধান্তে এসেছি। আর এর বিরুদ্ধে তেমন শক্ত কোনো তথ্যও নেই। এ ক্ষেত্রে ঠিক যেমনটা প্লিনি বলেছিলেন, একমাত্র নিশ্চয়তা হচ্ছে কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়।’

সিয়ন্সি জানান, এই প্লিনি প্রকল্পের ধারণাটি এসেছিল ‘ইনকোয়ারি অন দ্য ডেথ অব অ্যান অ্যাডমিরাল’ নামের একটি বই থেকে। সামরিক ইতিহাস নিয়ে কাজ করা ইতিহাসবিদ ফ্লাভিও রুসোর লেখা বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৪ সালে।

বলা হয়, প্লিনি দ্য এলডার ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতের পর উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে মারা যান। প্লিনি দ্য এলডারের মৃত্যুর খবরটি পাওয়া গিয়েছিল তাঁর ভাগনে প্লিনি দ্য ইয়ঙ্গারের কাছ থেকে, যিনি ছিলেন ওই অগ্ন্যুৎপাতের পর সংশ্লিষ্ট এলাকার একমাত্র জীবিত ব্যক্তি। আরেক ভাষ্য অনুযায়ী, প্লিনি মারা গিয়েছিলেন নিজের কৌতূহল মেটাতে গিয়ে। প্লিনি তখন থাকতেন মিসেনামের (বর্তমান মিসেনো) একটি বাড়িতে, যা ছিল আগ্নেয়গিরি থেকে মাত্র ২৪ মাইল দূরে। দূর থেকে কালো ধোঁয়া ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়া মেঘ দেখে অগ্ন্যুৎপাতের বিষয়টি আগেই টের পেয়েছিলেন তাঁর বোন। এ নিয়ে তাঁকে সতর্কও করেছিলেন তিনি। সে সময় ১৭ বছর বয়সী প্লিনি দ্য ইয়ঙ্গারও বিষয়টি দেখে সতর্ক হন। কিন্তু প্লিনি দ্য এলডার চেয়েছিলেন আগ্নেয়গিরি ও এর অগ্ন্যুৎপাত সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানতে। তাই তিনি আগ্নেয়গিরির আরও কাছে যেতে চাইলেন।

ইতিহাসবিদ ডেইজি ডুন বলেন, ‘প্রাকৃতিক ইতিহাসের ওপর ৩৭ খণ্ডের বই লেখা প্লিনির জন্য এটাই স্বাভাবিক ছিল। সম্রাট টাইটাসের নৌবহরের অ্যাডমিরাল হওয়ার সুবাদে প্লিনি একটি জাহাজ নিয়ে আগ্নেয়গিরির দিকে যাত্রা করেন। পথেই তাঁর হাতে আসে রেকটিনা নামের এক নারীর পাঠানো চিরকুট—তিনি সাহায্য চান। মুহূর্তেই প্লিনি পরিকল্পনা বদলে ফেললেন। গবেষকের অভিযাত্রা বদলে গেল উদ্ধার অভিযানে। তিনি আরও কিছু জাহাজকে এ কাজে নামার আদেশ দেন। ভীষণ বিপৎসংকুল ছিল সে অভিযান। সমুদ্রও উত্তাল হয়ে উঠেছিল। ফলে অন্য জাহাজের ক্যাপ্টেনরা ফিরে যেতে চাইলেন। কথিত আছে, সেটিই ছিল সেই মুহূর্ত, যখন প্লিনি উচ্চারণ করেন তাঁর অমর বাক্য, ‘ফরচুন ফেভারস দ্য ব্রেভ।’ এই অভিযান চালানোর সময়ে পম্পেইয়ের দক্ষিণে স্টেবি এলাকায় মাত্র ৫৬ বছর বয়সে মারা যান প্লিনি।

তারপর হাজার বছরের নীরবতা। ১৯০০ সাল। বর্তমান স্টেবিয়া শহরের নিচে খুঁজে পাওয়া গেল প্রাচীন স্টেবির ভগ্নাবশেষ। সঙ্গে ৭৩টি কঙ্কাল। এই কঙ্কালগুলোর একটির সঙ্গে পাওয়া গেল সাপের নকশা করা সোনার ব্রেসলেট। সঙ্গে সোনার নেকলেস, একটি প্যারাজোনিয়াম (সুতীক্ষ্ণ ফলাযুক্ত তিনকোনা ড্যাগার), যার রয়েছে হাতির দাঁতের কারুকাজ খচিত বাঁট। একটি পিলারের ওপর ছিল এর খুলিটি। অলসভাবে পড়ে থাকা ধড়টি দেখে ওই ভূমির তৎকালীন মালিক গেনারো মেত্রোন এটিকে প্লিনি দ্য এলডারের বলে দাবি করেন। যুক্তি, প্লিনি দ্য ইয়ঙ্গারের ভাষ্যমতে, তাঁর মামার মরদেহ ছাইয়ের মধ্যে এমনভাবে পড়ে ছিল, যেন তিনি ঘুমোচ্ছেন। তবে এই দাবি সে সময় হেসে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

তবে নৃতাত্ত্বিকেরা বলছেন, একজন রোমান অ্যাডমিরালের শরীরে এত অলংকার থাকার কথা নয়।

সে যা–ই হোক, প্লিনি দ্য এলডার আবার জেগে উঠেছেন। স্টোরিকো নাজিওনেল ডেল’আর্তে স্যানিতারিয়া জাদুঘরের কাচের বাক্স থেকে বেরিয়ে আবার যেন ঘুরে বেড়াচ্ছেন পৃথিবীর মানচিত্রে। বলছেন, ‘আমাকে পাঠ করো।’ এই পাঠের জন্য অবশ্য গবেষকদের হাতে ওই খুলি ছাড়া আর কিছু নেই। সত্তর বছর আগেই হতাশ হয়ে পড়া গেনারো মেত্রোন কঙ্কালের সঙ্গে পাওয়া অলংকারগুলো বিক্রি করে দেন। খুলিটি ছাড়া বাদবাকি হাড় আবার কবর দিয়ে দেন। শুধু নিজের কাছে রেখে দেন ওই হাতির দাঁতের কারুকাজখচিত তিনকোনা ছুরিটি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন