default-image

মেক্সিকো সিটি শহরটি বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল মহানগরগুলোর একটি। শহরটি পঞ্চদশ শতকে আজটেক সভ্যতার রাজধানী তেনোচতিতলানের ধ্বংসাবশেষের ওপর নির্মিত। সাধারণ চোখে ওই দুই শহরের মধ্যে অভিন্ন কোনো বৈশিষ্ট্য হয়তো দেখা যায় না। কিন্তু নতুন এক গবেষণায় বলা হচ্ছে, দুটি শহর একই গাণিতিক সূত্র মেনে তৈরি করা হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, সংস্কৃতি, সরকারব্যবস্থা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যবধান সত্ত্বেও প্রাচীন এবং আধুনিক শহরগুলো নিজ নিজ জনসংখ্যার তুলনায় দ্রুতগতিতে সম্প্রসারিত হয়েছে। এই আবিষ্কারের ফলে এ যুগের নগরগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধির নতুন কিছু উপায় বের করা সম্ভব হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ ডেভিড কারবালো ওই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, মানুষ কীভাবে কোনো জায়গায় বসতি স্থাপন করে, সে সম্পর্কে অতীত ও বর্তমানের কিছু অভিন্ন ধরন বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বিষয়টি থেকে সমকালীন নগর পরিকল্পনাবিদেরা নতুন বার্তা পাবেন।
আধুনিক নগরগুলোর নকশার সঙ্গে প্রাচীন শহরগুলোর বৈশিষ্ট্যের মিল খুঁজে পেয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদেরা স্বভাবতই অবাক হন। যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক স্কট অর্টম্যানের নেতৃত্বে গবেষকেরা দুই হাজার বছরে স্থাপিত বিভিন্ন প্রাচীন শহর ও স্থাপনার প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে দেখেন। পরে সেগুলোর সঙ্গে আধুনিক মেক্সিকো সিটির নকশা ও কাঠামোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেন। ওই এলাকায় বিভিন্ন বিশাল পিরামিড ও মন্দিরের মতো কিছু স্থাপত্য এবং সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ ওই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এসব স্থাপনা তৈরির কাজে ব্যবহৃত উপাদানগুলো কালের প্রবাহে হারিয়ে গেছে। তাই গবেষকেরা বসতিগুলোর সম্প্রসারণের গতি জানতে নমুনা কাঠামো ব্যবহার করেন। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন সৌধ ও গ্রামের ঘরবাড়ির সংখ্যা ও আকার বিবেচনায় নেওয়া হয়।
প্লস ওয়ান এবং সায়েন্স অ্যাডভানসেস সাময়িকীতে প্রকাশিত পৃথক প্রতিবেদনে বলা হয়, তুলনামূলক বড় প্রাচীন শহরগুলোতে মানুষের তুলনায় কখনো কখনো সৌধের সংখ্যা বেশি ছিল। আর বাড়িঘর ও সৌধগুলো আকারেও ছিল তুলনামূলক বেশি বড়। এ থেকে বোঝা যায়, শ্রমিকদের সংখ্যা বৃদ্ধির বাইরেও শহরগুলো সম্প্রসারিত হয়েছিল। তবে শহর যত বড় ছিল, তার সম্প্রসারণও তত বেশি হতো।
সাধারণভাবে বলা যেতে পারে, প্রাচীন শহরগুলোর সঙ্গে এ যুগের প্রযুক্তি-নিয়ন্ত্রিত মহানগরগুলোর খুব সামান্যই মিল ছিল। তেনোচতিতলানের জনসংখ্যা ছিল দুই লাখের মতো। সেখানে ছিল বাজার, ব্যস্ত কিছু সড়ক ও খাল। কিন্তু আধুনিক কোনো প্রযুক্তি সেখানে ছিল না। ছিল না গণপরিবহনের মতো কোনো অপরিহার্য ব্যবস্থা। অর্থনীতি তখন মূলত কৃষিনির্ভর ছিল। তবু মানুষের সামাজিক জীবনের কিছু দিক—যেভাবে পারস্পরিক যোগাযোগ এবং নির্ভরশীলতা তৈরি হয়—সেই যুগেও একই রকমের ছিল। সময়ের ব্যবধান অনেক হওয়া সত্ত্বেও গবেষকেরা প্রাচীন ও আধুনিক যুগের শহরগুলোর বিকাশের ধরনের ওপর নির্ভর করে একটি অভিন্ন গাণিতিক সূত্র বা সমীকরণ তৈরি করতে পেরেছেন।
অর্টম্যান বলেন, যে মৌলিক প্রক্রিয়ায় নিউইয়র্কের মতো একটি স্থান গড়ে উঠেছিল, একইভাবে বিশ্বের অন্যান্য অংশে প্রাচীন কৃষিভিত্তিক গ্রাম বা শহরগুলোও তৈরি হয়েছিল। ব্যাপারটা সত্যিই বিস্ময়কর।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রত্নতত্ত্ববিদ মাইকেল স্মিথ ওই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না। তিনি বলেন, গবেষণাটির মাধ্যমে অতীত ও বর্তমান শহরগুলো সম্পর্কে আগের তুলনায় আরও নিবিড় ধারণা পাওয়া যায়। শহরগুলো কীভাবে কার্যকর থাকে এবং আগের চেয়ে উন্নত হয়ে উঠতে পারে, সে ব্যাপারে জানার জন্য এই গবেষণার গুরুত্ব রয়েছে। আশা করা যায়, নতুন নতুন নগর প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করতে গিয়ে স্থপতিরা মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের উপযোগী করে পর্যাপ্ত স্থান বরাদ্দ রাখবেন। পাশাপাশি নজর রাখবেন অবকাঠামো যেন এমন হয়, শহরজুড়ে চলাচল করা সহজ হয়।
সূত্র: সায়েন্স নাউ ও লাইভসায়েন্স

বিজ্ঞাপন
প্রযুক্তি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন