বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ফেসবুকের প্রকৌশল দল বলছে, সমস্যা ব্যাকবোন রাউটারের ত্রুটিপূর্ণ কনফিগারেশনে। ব্যাপারটা কী বুঝিয়ে বলবেন?

রাগিব হাসান: একটু তুলনা দিয়ে বলি। ধরা যাক, আমার বন্ধুর বাড়িতে আমি যেতে চাই। প্রথমে আমাকে তাঁর বাড়ির ঠিকানাটা জানতে হবে। ডিএনএস বা ডোমেইন নেমিং সার্ভিস হলো ওয়েবসাইটের নাম থেকে তার আইপি অ্যাড্রেস বা ইন্টারনেটে নেটওয়ার্ক ঠিকানা বের করার সেবা। বন্ধুর বাড়ির ঠিকানা নিয়ে আমি রাস্তায় বের হলাম, কিন্তু শহরে নতুন বলে রাস্তার কিছুই চিনি না। আমি তখন কী করব? রাস্তায় মোড়ে কারও সঙ্গে দেখা হলে বলব, আচ্ছা, এ ঠিকানায় যেতে হলে ওই মোড় থেকে কোন দিকে যাব? সেই ব্যক্তির দেখানো পথ ধরে আমি পরের মোড়ে যাব। এভাবে শহরে নতুন হলেও আমি একসময় সেই ঠিকানায় পৌঁছাতে পারব।

বিজিপি বা বর্ডার গেটওয়ে প্রটোকলও ঠিক একইভাবে কাজ করে। আমরা যখন facebook.com লিখি ব্রাউজারে, তখন প্রথমে ডিএনএস সার্ভার থেকে ফেসবুকের সার্ভারের আইপি ঠিকানা বের করা হয়। তারপর ফেসবুকের সার্ভারে রিকোয়েস্ট পাঠাতে হবে সাইটের তথ্যের জন্য। এই রিকোয়েস্ট আমার আইএসপি থেকে ফেসবুকের সার্ভার পর্যন্ত যেতে হবে। ইন্টারনেট আসলে ছোট ছোট নেটওয়ার্কের সমষ্টি। যেমন আমার আইএসপির একটা নেটওয়ার্ক আছে, ফেসবুকেরও নিজস্ব নেটওয়ার্ক আছে। এই নেটওয়ার্কগুলো একে অন্যের সঙ্গে রাউটার নামের যন্ত্র দিয়ে যুক্ত থাকে। রাউটারের কাজ হলো এক নেটওয়ার্কের ডেটা বা রিকোয়েস্ট আরেক নেটওয়ার্কে পাঠানো। আমি যখন আমার আইএসপির রাউটারকে বলব, আমি ফেসবুকের ওয়েবসাইটে যেতে চাই, তখন আইএসপি দেখবে, সেখানে যেতে হলে তার সঙ্গে যুক্ত কোনো রাউটারে এই রিকোয়েস্ট পাঠাতে হবে। সেই রাউটারও একই কাজ করবে। এভাবে এক রাউটার থেকে আরেক রাউটারে অনেক ঘাটের জল খেয়ে আমার ব্রাউজারের ডেটা রিকোয়েস্ট যাবে ফেসবুকের সার্ভারে, তারপর সেখান থেকে আবারও একইভাবে নানা পথ ঘুরে ফেসবুকের তথ্য, ছবি, ওয়েবপেজ—এগুলো আমার ব্রাউজারে আসবে। এই যে ফেসবুকে যেতে হলে কোনো রাউটারে ডেটা পাঠাতে হবে, ব্যাপারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় বিজিপির মাধ্যমে। কিন্তু ৪ অক্টোবর যখন ফেসবুকের সার্ভার সবাইকে ভুল করে জানিয়ে দিল, ফেসবুকের ডেটা সেন্টারে যাওয়ার উপায় নেই, তখন সবাই তাদের রাউটার থেকে ফেসবুকে যাওয়ার রাস্তার তথ্য মুছে ফেলল। ফলে আমরা যতই ব্রাউজার বা অ্যাপে ফেসবুকে যাওয়ার চেষ্টা করি না কেন, রাউটাররা জবাব দিতে লাগল, এ ঠিকানার কোনো সার্ভারে যাওয়ার পথ তো আমাদের জানা নেই। ব্যাপারটা অনেকটা এমন, বন্ধুর বাড়িটা ঠিকই আছে, কিন্তু সেটা সব ম্যাপ থেকে মুছে গেছে। ফলে যাওয়ার উপায় বন্ধ। ফেসবুকেও তা–ই হয়েছে।

default-image

আমরা ফেসবুকের সেবা বিঘ্নের খবর দেওয়ার সময় দেখেছি, অনেক পাঠক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এ ফাঁকে হয়তো তাদের তথ্য হ্যাক হয়েছে। ব্যাপারটা কি তেমন কিছু?

রাগিব হাসান: এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী হ্যাক হয়নি। পুরো ব্যাপারটাই দুর্ঘটনাবশত ফেসবুকের নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ফলে হয়েছে। এ রকম ঘটনা আসলে খুব বিরলও নয়। ২০১৯ সালে একবার প্রায় ২৪ ঘণ্টার জন্য ফেসবুক ডাউন ছিল। আবার আমাজনের একটি ক্লাউড ডেটা সেন্টারও নেটওয়ার্ক কনফিগারেশনের ত্রুটির জন্য চার ঘণ্টার জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল ২০১৭ সালে। সেবার অনেক প্রতিষ্ঠানের সেবা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আবার ২০০৮ সালে পাকিস্তানের একটি আইএসপি ইউটিউবকে নিষিদ্ধ করতে গিয়ে বিজিপি ভুল মেসেজ দিয়ে পুরো ইন্টারনেট থেকেই ইউটিউবকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল প্রায়। ফেসবুকের তথ্যগুলো তাদের সার্ভারে নিরাপদেই আছে। শুরুতে গুজব রটলেও আসলে হ্যাক হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি।

সমস্যা যত বড়ই হোক, তাৎক্ষণিকভাবে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা কি ফেসবুক নিতে পারত না?

রাগিব হাসান: আসলে ফেসবুকের প্রকৌশলীরা দ্রুতই কাজ করেছেন। কাজটা বেশ জটিল ছিল। কারণ, এ সমস্যা পুরো ব্যাকবোন নেটওয়ার্ককে বিকল করে দিয়েছিল। এমনকি ফেসবুকের প্রকৌশলীরা নিজেদের প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কে অথবা প্রতিষ্ঠানের ভবনে ঢুকতে পারছিলেন না। পুরো জিনিসটি মেরামত করতে প্রকৌশলীদের ফেসবুকের ডেটা সেন্টারে গিয়ে পুরো সিস্টেমটি রিস্টার্ট করতে হয়েছে। আবার একসঙ্গে পুরো সিস্টেম রিস্টার্ট করলে সমস্যা সমাধানের বদলে আরও বাড়তে পারত। তাই পর্যায়ক্রমে করতে হয়েছে। সময়টা সে জন্যই লেগেছে।

ফেসবুকের এ সেবা বিঘ্ন নতুন করে দেখাল, আমরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর কতটা নির্ভরশীল। আবার ‘অলওয়েজ অন, অলওয়েজ কানেক্টেড’ বলেও একটা কথা আমরা শুনে থাকি। প্রযুক্তিগত দিক থেকে মানুষের জীবনকে এগিয়ে নিতে এই নির্ভরশীলতা কি জরুরি?

রাগিব হাসান: আমরা চাই বা না চাই, আমাদের জীবনটা ডিজিটাল সব প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে। তবে সমস্যাটা অন্যখানে। ইন্টারনেটের জন্মই হয়েছিল কোনো যুদ্ধে যদি যোগাযোগের নেটওয়ার্কের একাংশ ধ্বংস হয়ে যায়, তবু যেন যোগাযোগব্যবস্থা অচল না হয়ে যায়। কিন্তু বর্তমানে ইন্টারনেটের অনেক কিছুই গুটিকয়েক প্ল্যাটফর্মে কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে। মানুষ ইন্টারনেট বলতে এখন গুগল, ফেসবুক, টিকটক—এগুলোকেই বোঝে। এই একাধিপত্য ভাঙতে হবে, আর প্রতিটি সেবার বিকল্প যাতে থাকে, সেটার কথাও ভাবতে হবে। গল্পের সেই এক ঝুড়িতে সব ডিম রাখা বোকা মানুষটির মতোই আসলে আমরা গুটিকয়েক বড় প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আছি। তার বদলে ইন্টারনেটের প্রাথমিক যুগের মতো যদি একাধিক বিকল্প থাকত প্রতিটি প্ল্যাটফর্মেরই, তাহলে একটা প্ল্যাটফর্ম বিকল হয়ে গেলে এত বড় মাপের সমস্যা হতো না। আশা করি, বিশ্বের নানা দেশের নীতিনির্ধারকেরা এই ব্যাপারগুলো ভাববেন। কোনো একটি প্ল্যাটফর্ম বা প্রতিষ্ঠান যেন একাধিপত্য পেয়ে না যায়। তথ্যের জ্ঞানের মুক্তিই ছিল ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠার কারণ। আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই মুক্ত বিশ্বের দিকে।

প্রযুক্তি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন