default-image

শিগগির অফিসে ফেরার তাড়া নেই জর্জিনার। জেনেভার একটি আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মী জর্জিনার বয়স ৩৭। গত বছর থেকে পুরোদমে বাড়িতে বসেই অফিসের কাজ করছেন তিনি। এতে তাঁকে অফিসে যাতায়াতের বাড়তি ঝক্কি পোহাতে হচ্ছে না। অফিসের নির্ধারিত পোশাক পরা বা গর্ভধারণ নিয়ে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে না। তাঁর মাতৃত্বকালীন ছুটিতে অন্য সহকর্মীরা ইতিমধ্যে অফিসে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে অফিসের নিয়মিত সভাগুলো এখনো জুম সফটওয়্যারেই সম্পন্ন হচ্ছে। তাঁর সহকর্মীরা এখনো নিজের ডেস্ক থেকেই জুমে যোগাযোগ রাখছেন। ফলে যাঁরা বাড়ি বসে কাজ করছেন, তাঁদের আর একাকিত্ববোধ হচ্ছে না। ঘরে বসেই অফিসের পরিবেশ পাচ্ছেন। তবে জর্জিনার চিন্তা হচ্ছে যখন বিধিনিষেধ থাকবে না, তখন কি মানুষ আবার মহামারির আগের অবস্থায় ফিরে যাবে? একসময় অফিস চালু থাকতে বাড়িতে বসে অনলাইনে কাজ করার বিষয়টিকে ব্যতিক্রম হিসেবেই মনে করা হতো। আবার সেই ব্যতিক্রমী পথেই তাঁকে হাঁটতে হবে কি না, তা নিয়ে চিন্তিত জর্জিনা।

প্রভাবশালী ব্রিটিশ সাময়িকী ‘ইকোনমিস্ট’–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভিডিও কনফারেন্সিং প্ল্যাটফর্ম যেমন মাইক্রোসফট টিমস, জুম, গুগল মিট এখন কোভিড-১৯ বিস্তার ও বিভিন্ন দেশে লকডাউনের সময় দূরে বসে কাজ করার বিষয়টিকে সম্ভব করে তুলেছে। আগে যখন কোনো কর্মীকে বাড়িতে বসে কাজ করার জন্য বিশেষ অনুমতি নিতে হতো, তাঁদের এখন অফিসে যেতেই অনুমতি নিতে হয়। আগে যেসব কাজের জন্য শারীরিকভাবে উপস্থিত হতে হতো, যেমন যোগব্যায়ামের ক্লাস ও চিকিৎসকের সাক্ষাৎকার এখন সব অনলাইননির্ভর হয়ে গেছে। জুম মিটিংয়ের দৈনিক অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ছিল মাত্র এক কোটির মতো। কিন্তু তা চার মাসের ব্যবধানে বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ৩০ কোটিতে।

আগে একজন মানুষের দুধরনের ব্যক্তিত্ব থাকত। একটি বাড়ির, অন্যটি অফিসের। কিন্তু মহামারির সময়টাকে ওই দুই ব্যক্তিত্ব একটিতেই পরিণত হয়েছে।
ক্রিস রামাক্রিসনান, ব্লুজিন্সের কর্মকর্তা

অবশ্য অনলাইনে কাজের ক্ষেত্রটিতে যে রূপান্তর ঘটেছে, তা বিশ্বের জন্য ভালো দিক। ভিডিও কনফারেন্সিংয়ে শারীরিকভাবে উপস্থিত হয়ে মিটিংয়ের চেয়ে ১০ ভাগের ১ ভাগ শক্তি খরচের প্রয়োজন পড়ে। যাতায়াত ও অন্যান্য বিষয় মিলিয়ে মিটিংয়ে যে শক্তি বাঁচে, তার সুফল পায় মানুষ। তবে এ ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ও সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে এর ভূমিকার বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়।

বিজ্ঞাপন

কেউ কেউ স্ক্রিনে যোগাযোগের বিষয়টি উপভোগ করে। তবে কেউ কেউ আবার সহকর্মীদের তথ্যপ্রযুক্তির অনভিজ্ঞতায় অস্বস্তিতেও পড়েন। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের গবেষক সেডাল নিলি বলেন, ‘পরিস্থিতি যা–ই হোক না কেন ভার্চ্যুয়াল কাজের বিষয়টি স্থায়ী হতে চলেছে।’ তাঁর যুক্তি, এ কৌশলের ভালো দিকটি রাখতে এবং খারাপ দিকটি বন্ধের খোঁজ করা হবে।

মানুষ বাস্তবে যে স্বরে কথা বলে, ভিডিও কলে তার চেয়ে ১৫ শতাংশ জোরে কথা বলে। এটি ক্লান্তিকর।

অনলাইনে যোগাযোগের কিছু ভিন্ন দিকও আছে। গত এক বছরের মহামারিতে অনেকেই জুম ব্যবহারের ফলে বিষণ্নতায় ভুগছেন। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এ নিয়ে নতুন একটি গবেষণা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ভিডিও কলে প্রথম সমস্যা হচ্ছে এটি ব্যবহারকারীকে তাঁর সহকর্মীদের কাছাকাছি থাকার জন্য ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য করে। চেহারা অনেক সময় এত বড় দেখায় যে মনে হয় দূরত্ব কমে গেছে। দীর্ঘক্ষণ একনাগাড়ে স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার ফলে মানসিক চাপ বাড়ে। মানুষ যখন সরাসরি কথা বলে, তখন এত দীর্ঘ সময় পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না।

সরাসরি উপস্থিত হয়ে কথা বলার চেয়ে ভিডিও কলে আলোচনায় অনেক পার্থক্য রয়েছে। বাস্তব সহকর্মীদের সামনে কোনো বিষয় উপস্থাপন করা হলে তাঁদের প্রতিক্রিয়া বোঝা যায়। এটি অনলাইনে স্পষ্ট ধরা যায় না। মানুষ বাস্তবে যে স্বরে কথা বলে, ভিডিও কলে তার চেয়ে ১৫ শতাংশ জোরে কথা বলে। এটি ক্লান্তিকর। এ ছাড়া ভিডিও কলের কথা স্থানান্তরে কিছুটা সময় লাগে। ইন্টারনেট সংযোগ দুর্বল হলে যোগাযোগ কঠিন হয়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ভিডিও কলে কথা বলার সময় ১ দশমিক ২ সেকেন্ড প্রতিক্রিয়া পেতে দেরি হলে তা মনোযোগ হারায়। এ ছাড়া অনলাইনে প্রতিক্রিয়ায় দেরি হলে তা বন্ধুত্বপূর্ণ এবং আন্তরিক মনে হয় না।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পল ফিশার বলেন, ‘অনলাইনে সামাজিক বন্ধনগুলো ছাড়া আস্থা তৈরি কঠিন। ই–মেইলের জবাব দেরি করে দেওয়া বা ভিডিও কলের প্রতিক্রিয়ায় দেরি হওয়া সন্দেহপ্রবণতার দিকে ঠেলে দেয়। এতে ভার্চ্যুয়াল আলোচনায় অচলাবস্থায় পৌঁছার ঝুঁকি বাড়ে। অনলাইন যোগাযোগে দেরি হলে পারস্পরিক আবেগ বোঝা যায় না বলে মানুষ দ্রুত হতাশ হয়ে পড়ে।’

default-image

‘ইকোনমিস্ট’ বলছে, ভিডিও কলে নিজের ছবি একটানা দেখাটাও ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ভিডিও কল করার বেলায় ৪০ শতাংশ সময় নিজের চেহারা দেখে মানুষ। কিন্তু নিজের চেহারার দিকে ক্রমাগত তাকিয়ে থাকার বিষয়টি আত্মোদ্দীপনার জন্য ভালো নয়।

ভার্চ্যুয়াল কাজের অসুবিধার দিক যেমন আছে, তেমনি ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগের সুবিধাও ব্যাপক। ভিডিও কলে সবাইকে সমান দেখায় বলে এটি গণতান্ত্রিক বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কেউ অফিসের প্রধান ব্যক্তির পাশে বসল, নাকি সামনে বসল এ বিষয়গুলো ভার্চ্যুয়াল সভায় গুরুত্বপূর্ণ থাকে না। কর্মীরা বিশ্বের যেখানেই থাক না কেন, অফিসের প্রধান কর্মকর্তার কণ্ঠস্বর তিনি সরাসরি শুনতে পান। চাইলে দূরের সহকর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবেও কাজ সারতে পারেন।

বিজ্ঞাপন

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অনেকেই বাড়ির ও অফিসের জীবনের পার্থক্য ঘুচিয়ে ফেলতে অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তবে মাইক্রোসফটের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভার্চ্যুয়াল মিটিং সহকর্মীদের পরস্পরকে আরও ভালোভাবে জানতে সাহায্য করে। মহামারির সময়ে প্রতি পাঁচজনে অন্তত একজন ভিডিও কলে সহকর্মীদের পরিবারের কারও সঙ্গে কথা বলেছেন। ছয়জনে একজন লকডাউনে আটকে থেকে সহকর্মীদের দুঃখে ব্যথিত হয়েছেন।

default-image

ভিডিও কনফারেন্সিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ব্লুজিন্সের কর্মকর্তা ক্রিস রামাক্রিসনান বলেন, আগে একজন মানুষের দুধরনের ব্যক্তিত্ব থাকত। একটি বাড়ির, অন্যটি অফিসের। কিন্তু মহামারির সময়টাকে ওই দুই ব্যক্তিত্ব একটিতেই পরিণত হয়েছে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভালো বা মন্দ যা–ই হোক না কেন, অনলাইন ও সরাসরি মিটিংয়ের হাইব্রিড মডেল মহামারির পরের সময়টাতেও স্থায়ী হবে।

সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৮০ শতাংশ দূরে বসে কাজ করা কর্মীরা তাঁদের কাজে সফল হয়েছেন। তাই ৭০ শতাংশ নির্বাহী কর্মকর্তা ভার্চুয়াল একত্রীকরণ টুলের ওপর বিনিয়োগ বাড়াবেন। ভার্চ্যুয়াল কর্মীদের ব্যবস্থাপনায় কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যাপারেও ৬৫ শতাংশ কর্মকর্তা পরিকল্পনা করছেন। তাই সামনে ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগের সুদিন আসছে বলা যায়।

প্রযুক্তি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন