রাতারাতি টিকার সাফল্য দাবি রাশিয়ার

বিজ্ঞাপন
default-image

টিকা তৈরি ও পরীক্ষা করতে যেখানে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়, সেখানে অনেকটা রাতারাতিই শতভাগ সফল টিকা তৈরি করে ফেলার দাবি করেছে রাশিয়া। এ নিয়ে তাই শুরু হয়েছে বিতর্ক। জুলাই মাসেই টিকার প্রথম ধাপের পরীক্ষার কথা বলেছিল দেশটি। আগস্ট মাসে এসে টিকার তৃতীয় ধাপের সফলতার কথা বলছে তারা।

নিউইয়র্ক পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মস্কোতে কিছু স্বাস্থ্যকর্মী ও সরকারি কর্মকর্তাকে টিকা নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। রাশিয়ার দাবি, এটা বিশ্বের প্রথম কোভিড-১৯ টিকা। ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় এটি নিরাপদ প্রমাণিত হওয়ার পর তা গ্রহণে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। মস্কোভিত্তিক গামেলিয়া ইনস্টিটিউটের তৈরি টিকাটি গ্রহণের জন্য একটি হাসপাতাল স্বাস্থ্যকর্মীদের তালিকা করেছে। স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে সরকারি কর্মকর্তারাও টিকা গ্রহণের চিঠি পাওয়ার কথা বলেছেন।

রাশিয়ান ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের সঙ্গে গামেলিয়া ইনস্টিটিউটের যৌথভাবে তৈরি টিকাটি শর্ত সাপেক্ষে এ মাসেই নিবন্ধন পাচ্ছে। তবে শর্তটি হচ্ছে, এটি আরও ১ হাজার ৬০০ জনের ওপর পরীক্ষা করা লাগবে। সেপ্টেম্বর মাস থেকে এ টিকার উৎপাদন শুরু হবে বলে গত ২৯ জুলাই প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে জানিয়েছেন ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী তাতিয়ানা গোলিকোভা।

অবশ্য এ টিকার পরীক্ষার ফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তা ছাড়া রাশিয়া যেভাবে তাড়াহুড়া করে টিকা অনুমোদন দিয়েছে, এতে অন্য দেশগুলো এ টিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে।

ভারতীয় গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, বিশ্বের অগ্রগামী প্রথম ছয়টি টিকার মধ্যে রয়েছে রাশিয়ারই দুই প্রতিযোগী। ‘গাম-কোভিড-ভ্যাক-লিও’ নামে টিকাটি তৈরিতে সরাসরি যুক্ত রয়েছে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। রাশিয়ার দ্বিতীয় প্রতিযোগীটি হচ্ছে গামেলিয়ার টিকাটি। রুশ সংবাদ সংস্থা তাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘গাম-কোভিড-ভ্যাক-লিও’–এর তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা শেষ। আগামী বুধবার এর নিবন্ধন হয়ে যাবে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, আগামী অক্টোবরে জনগণের বড় অংশের মধ্যে টিকা প্রয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে রাশিয়া। দেশটির সরকার এমন তথ্য জানিয়েছে। রাশিয়ার শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী ডেনিস মানতুরভ দেশটির তাস সংবাদ সংস্থাকে জানান, ২০২১ সালের মধ্যে প্রতি মাসে তাঁরা কয়েক লাখ টিকার ডোজ তৈরি করবেন বলে আশা করছেন।

এএফপি ও সিএনবিসির খবরে জানা যায়, দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী মিখাইল মুরাসকো বলেন, মস্কোভিত্তিক গামেলিয়া ইনস্টিটিউটে করোনাভাইরাসের টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ হয়েছে। রুশ সরকারি সংবাদ সংস্থা আরআইএর গত শনিবারের খবরে জানানো হয়, মস্কোর দাবি, পরীক্ষায় কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই আশানুরূপ সাড়া মিলেছে। রাশিয়ার ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (আরডিআইএফ) এই টিকার ট্রায়ালে অর্থায়ন করছে।

রাশিয়া তাদের টিকার সফলতার দাবি করলেও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। রাশিয়ার দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তথ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকাভুক্ত হয়নি।

রাশিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী মুরাসকো বলেন, ভ্যাকসিনটি ব্যবহারের আগে নিয়মিত অনুমোদনের প্রয়োজন। প্রথমে চিকিৎসক ও শিক্ষকদের ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। অক্টোবর মাসে গণপর্যায়ে ভ্যাকসিন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ফান্ডের প্রধান কিরিল দমিত্রিয়েভ বলেন, তিনি আশা করছেন, ১০ দিনের মধ্যে টিকার আনুষ্ঠানিক নিবন্ধনের কাজ শেষ হবে। যদি ১০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ হয়, তাহলে এটাই প্রথম নিবন্ধিত করোনার টিকা হবে।

আরডিআইএফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কিরিল দমিত্রিয়েভ গত সপ্তাহে বলেন, যাঁরা ভাবতেও পারেননি টিকার দৌড়ে রাশিয়া প্রথম হবে, তাঁদের জন্য এটি একটি স্মরণীয় মুহূর্ত।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, চলতি মাসেই রাশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই ভ্যাকসিনের অনুমোদন দেবে। করোনাভাইরাস ঠেকাতে বিভিন্ন দেশে ভ্যাকসিন তৈরির প্রক্রিয়া চলছে। এর মধ্যে ২০টির বেশি ভ্যাকসিন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে রয়েছে।

বিবিসির খবরে বলা হয়, রুশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী মিখাইল মুরাসখো জানিয়েছেন, প্রথমে চিকিৎসক ও শিক্ষকদের এই ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। এখন অনুমোদন পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরির কাজ চলছে।

কিছু বিশেষজ্ঞ অবশ্য ভ্যাকসিন নিয়ে রাশিয়ার দ্রুতগতির এই উদ্যোগ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ ড. অ্যান্থনি ফাউসি আশা প্রকাশ করেন, রাশিয়া ও চীন মানবদেহে প্রয়োগের আগে ‘ভ্যাকসিন সত্যিকার অর্থেই পরীক্ষা’ করবে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ভ্যাকসিন ‘নিরাপদ ও কার্যকর’ হবে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ এই ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে। ফাউসি বলেন, ‘আমি এটা বিশ্বাস করি না যে ভ্যাকসিন তৈরির দিক থেকে কোনো দেশ আমাদের চেয়ে এগিয়ে আছে। কিংবা এই ভ্যাকসিনের জন্য অন্য কোনো দেশের ওপর আমাদের নির্ভর করতে হবে।’

নিজস্ব টিকা পরীক্ষায় সফল হলেও রাশিয়ার বিরুদ্ধে টিকা হ্যাক করার অভিযোগও উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডা তাদের গবেষণাসংক্রান্ত তথ্য হ্যাক করার অভিযোগ তুলেছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। গত মাসে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাদের টিকা পরীক্ষার প্রথম ধাপের ফল প্রকাশ করে। তারা জানায়, কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধী সক্ষমতা দেখিয়েছে তাদের টিকা। এ ফল ঘোষণার কিছু সময় পরই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা জানায়, এপিটি ২৯ নামের একটি দল ব্রিটিশ পরীক্ষাগারগুলোয় সাইবার হামলা শুরু করে এবং গবেষণা তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালায়। তারা প্রায় নিশ্চিত যে এটি রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার অংশবিশেষের কাজ।

তবে এ ধরনের অভিযোগ মস্কো অস্বীকার করেছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, ‘এ হামলার সঙ্গে রাশিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন