সবচেয়ে কঠিন কাজের কাজি

বিজ্ঞাপন
default-image

গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট ইনকরপোরেশনের প্রধান ল্যারি পেজ ও প্রেসিডেন্ট সের্গেই ব্রিন দায়িত্ব ছেড়ে সে ভার তুলে দিয়েছেন সুন্দর পিচাইয়ের কাঁধে। গত মঙ্গলবার নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) দায়িত্ব নিয়েছেন সুন্দর পিচাই। গুগলের পাশাপাশি এখন থেকে অ্যালফাবেটের দায়িত্বও পালন করছেন তিনি। প্রযুক্তি জগতের সবচেয়ে জটিল দায়িত্ব সামলানোর ভারও এখন তাঁর কাঁধেই পড়েছে। গুগলের পাশাপাশি আরও ৮টি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিতে হবে তাঁকে।

নতুন দায়িত্ব সুন্দর পিচাইকে যেমন সম্মান এনে দিয়েছে তেমনি তাঁর সামনে দাঁড় করিয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ। সিলিকন ভ্যালির সবচেয়ে কঠিন চাকরিটাই এখন তাঁর।

সুন্দর পিচাইয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ গুগল নিয়েই। গত এক বছরে গুগলে বেশ কয়েকবার কর্মী অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এত দিন তিনি গুগলের নেতৃত্বে থাকলেও কর্মী অসন্তোষ তিনি ঠেকাতে পারেননি। গত মাসে গুগলের নিয়মনীতি নিয়ে প্রতিবাদ করায় চার কর্মীর চাকরি চলে গেছে। তবে গুগলের পক্ষ থেকে নিয়মনীতির প্রতিবাদ করায় চাকরি যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করা হয়নি।

দেড় বছর ধরে গুগলের নির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সরাসরি কথা বলেছেন কর্মীরা। এর মধ্যে ছিল চীনে গুগলের একটি প্রকল্পের কাজ শুরু করা। এর বাইরে পেন্টাগনের ড্রোন প্রকল্পে কাজ করতে না চেয়ে বেশ কিছু কর্মী প্রতিবাদ জানান। সুন্দর পিচাইয়ের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কর্মীদের ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। তা না হলে এত বড় প্রতিষ্ঠান চালাতে তাঁকে হিমশিম খেতে হবে।

প্রতিবছর গুগল কর্মীদের নিয়ে গুগলজাইস্ট সমীক্ষা হয়। কাজ করে কর্মীরা কতটা সন্তুষ্ট, শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর আস্থা রয়েছে কি না, সংস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী কি না, জানতে চাওয়া হয় ওই সমীক্ষায়। এ বছরের শুরুতে তেমনই একটি সমীক্ষা হয়েছিল। ওই সমীক্ষায় দেখা যায়, সুন্দর পিচাইয়ের জনপ্রিয়তা, তাঁর নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেছে গুগলের অন্দরেই।

মোট ৮৯ শতাংশ কর্মী এই সমীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। পিচাইয়ের নেতৃত্ব, রণকৌশল ও সিদ্ধান্তে কর্মীদের আস্থা প্রদর্শনের পাল্লা ভারী থাকলেও একটা সংখ্যক কর্মীদের মধ্যে পিচাই সম্পর্কে কোথাও একটা ‘শূন্যতা’ তৈরি হচ্ছে। আর এই ‘শূন্যতা’কে কিন্তু একটা উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গুগল তার কর্মীদের সব ধরনের সুবিধা দেখে। তা সে বিলাসবহুল কাজের পরিবেশ হোক, বেতন বা কর্মীদের স্বাচ্ছন্দ্য। বিশেষজ্ঞরা তাই বলছেন, সমীক্ষায় যে উদ্বেগজনক রিপোর্ট উঠে এসেছে, এ রকম চলতে থাকলে বহু প্রতিভাবান ও উজ্জ্বল কর্মীকে হারাবে গুগল এবং সেই ফায়দা নেবে অন্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের নৈতিক ব্যবহার এবং চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সংস্থার সঙ্গে একটা টানাপোড়েন শুরু হয় গত বছরে। সেই সংঘাত প্রকাশ্যে চলে আসে। যৌন হেনস্তায় অভিযুক্ত আধিকারিকদের মোটা টাকা দিয়ে সংস্থা থেকে বিদায় দেওয়া হচ্ছে, এমনই একটি প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসার পর কয়েক হাজার কর্মী প্রতিবাদে নামেন।

গুগলের মাথার ওপর আরেকটি বড় কাঁটা হয়ে ঝুলছে অ্যান্টি ট্রাস্ট মামলা। গুগলের একক আধিপত্যের বিষয়ে তদন্ত হচ্ছে। গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ জন অ্যাটর্নি জেনারেল একত্রে গুগলের বিরুদ্ধে অ্যান্টি ট্রাস্ট ভঙ্গের বিষয়টি তদন্তে সম্মত হয়েছেন। ব্যবহারকারীর তথ্য ও বিজ্ঞাপন বাজারে একক আধিপত্য ঘিরে গুগলকে নিয়ে তদন্ত করা শুরু হলে পিচাইয়ের জন্য তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠবে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যালফাবেটের অধীনে অনেকগুলো মুনশট প্রকল্প বা পরীক্ষামূলক প্রকল্প নিয়ে কাজ করা হয়। এসব প্রকল্প সরাসরি পিচাইয়ের অধীনে চলে এসেছে। এসব প্রকল্পগুলো থেকে সফল প্রকল্প বের করে আনা পিচাইয়ের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

২০১৫ সালে অ্যালফাবেট ইনকরপোরেশন নামে মূল প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন গুগলের দুই প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিন। গুগল থাকে অ্যালফাবেটের অধীনে। সে সময় অ্যালফাবেটের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন ল্যারি, প্রেসিডেন্ট হন সের্গেই ব্রিন। অ্যালফাবেটের আওতায় থাকে অ্যান্ড্রয়েড, সার্চ, অ্যাড (বিজ্ঞাপন), ইউটিউব, ম্যাপের মতো ব্যবসা। অন্যদিকে নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে ভারতীয় বংশোদ্ভূত সুন্দর পিচাই পান গুগলের দায়িত্ব।

২০১৫ সালে গুগলের প্রধান নির্বাহী হওয়ার আগে গুগলের পণ্য বিভাগের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করছিলেন পিচাই। সুন্দর পিচাইয়ের জন্ম ভারতের তামিলনাড়ুতে। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) খড়গপুর থেকে প্রযুক্তিতে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। পরে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করার পর তিনি পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার্টন স্কুল থেকে এমবিএ করেন।

বরাবরই সমস্যা সমাধানে অভিনব কিছু করার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন পিচাই। সিলিকন ভ্যালির সবচেয়ে কঠিন কাজের দায়িত্ব নিয়ে কতটা চমক দেখাতে পারেন, সে প্রতীক্ষায় রয়েছে প্রযুক্তি বিশ্ব।

তবে তাঁর ওপর পূর্ণ আস্থা রয়েছে ল্যারি ও ব্রিনের। গুগলের ব্লগ পোস্টে পেজ ও ব্রিন বলেন, গুগল ও অ্যালফাবেটের কাছে আমাদের দায়বদ্ধতা দীর্ঘ সময়ের। এখন থেকে আমরা পরিচালনা পর্ষদ সদস্য হিসেবে থাকব। তবে নিত্য কাজগুলোতে আর আমরা থাকছি না।

নিজেদের ভালো লাগার বিষয় নিয়ে নিয়মিতই সুন্দর পিচাইয়ের সঙ্গে আলোচনায় থাকবেন বলেও জানান গুগলের দুই সহপ্রতিষ্ঠাতা।

নতুন দায়িত্ব পেয়ে গুগলের সব কর্মীর উদ্দেশে চিঠি লিখেছেন সুন্দর পিচাই। এতে তিনি বলেন, ‘গুগলের দুই সহপ্রতিষ্ঠাতার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত গুগলের দৈনন্দিন কাজের ওপর প্রভাব ফেলবে না। গুগলের প্রতি আমার মনোযোগ আগের মতোই থাকবে। একই সঙ্গে অ্যালফাবেট নিয়ে কাজ করব আমি।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন