৫০০ নিখোঁজ, করুণ দশায় ১০০

জনগণের করের টাকায় সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ যে ৬০০ মুঠোফোন অ্যাপ্লিকেশন (সংক্ষেপে অ্যাপ) তৈরি করেছিল, সেগুলো এখন করুণ দশায় রয়েছে। ৫০০টি অ্যাপ গুগলের প্লে স্টোরে নেই। সেগুলো যে ওয়েবসাইটে আছে, সেখানে ঢুকতে গেলে ‘নিরাপত্তা ঝুঁকির’ সংকেত আসে।

বাকি ১০০টি অ্যাপ অবশ্য গুগল প্লে স্টোরে (অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের মুঠোফোনের অ্যাপস্টোর) আছে। তবে ব্যবহার সামান্য। যেমন ১৮টি অ্যাপ ডাউনলোড হয়েছে মাত্র ১০০ বারের কিছু বেশি। বাকিদের ডাউনলোডের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। ৮২টি অ্যাপ ২০১৬ সালের পর হালনাগাদ হয়নি।

২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ (আইসিটি) প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ের দুই কর্মসূচির অধীনে এসব অ্যাপ তৈরি করে। এর মধ্যে শুধু অ্যাপ তৈরিতে ৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়। বাকি টাকা খরচ করা হয় প্রশিক্ষণ, কর্মশালাসহ অন্যান্য কাজে।

বিজ্ঞাপন

তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদ প্রথম আলোকে বলেন, অ্যাপগুলো তৈরির কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল তিনি দায়িত্ব পাওয়ার আগে। দেশে অ্যাপের বাজার তৈরি এবং অ্যাপ ডেভেলপার তৈরির উদ্দেশ্য নিয়ে কর্মসূচি দুটি নেওয়া হয়েছিল। ৬০০ অ্যাপ যে কাজে আসেনি, তা স্বীকার করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অ্যাপগুলো মানসম্মত হয়নি। তাই এগুলোর পেছনে ২০১৫ সালের পর আর কোনো অর্থ ব্যয় করা হয়নি। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, মানুষ এসব অ্যাপ ব্যবহার করে ৬০০ রকমের সেবা নেবে, সেটাও যৌক্তিক মনে হয়নি। যেসব মন্ত্রণালয়ের জন্য অ্যাপ করা হয়েছিল, তারা হালনাগাদও করেনি।

তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ এই সব অ্যাপের পেছনে নতুন করে আর কিছু করবে না জানিয়ে জুনাইদ আহ্‌মেদ বলেন, এখন এটুআই প্রকল্পের অধীনে ‘মাইগভ’ নামে নতুন সেবার কাজ চলছে। এতে এক প্ল্যাটফর্মে সরকারের সব সেবা একসঙ্গে পাওয়া যাবে।

৫০০ অ্যাপের খোঁজে

৬০০টির মধ্যে ৫০০ অ্যাপ তৈরি হয় জাতীয় পর্যায়ে মোবাইল অ্যাপস প্রশিক্ষক ও সৃজনশীল অ্যাপস উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে। কর্মসূচির মোট বাজেট ছিল ৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। আর শুধু অ্যাপ বানাতে ব্যয় হয় ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

২০১৫ সালের ২৬ জুলাই এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এসব অ্যাপ উদ্বোধন করা হয়। তখন জানানো হয়েছিল, এসব অ্যাপের মধ্যে ৩০০টি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থার তথ্য ও সেবার অ্যাপ। বাকি ২০০টি বিভিন্ন সৃজনশীল বিষয়ের ওপর তৈরি। এসব অ্যাপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ডেসকো, ডিপিডিসির বিল চেক, রেল সেবা, বিআরটিসি, বাংলাদেশ বিমান ইত্যাদি।

বিজ্ঞাপন

অ্যাপগুলোর তালিকা পেতে চলতি মাসের শুরুর দিকে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ ও তৈরির কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠান এথিকস অ্যাডভান্স টেকনোলজি লিমিটেডের (ইএটিএল) সঙ্গে কয়েক দফা যোগাযোগ করা হয়। ১৭ নভেম্বর ইএটিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ মুবিন খান প্রথম আলোকে একটি ওয়েবসাইটের লিংক পাঠান, যেখানে অ্যাপগুলোর তালিকা রয়েছে। ওই লিংক ধরে মুঠোফোন ও কম্পিউটারের মাধ্যমে ঢুকতে গেলে ‘পটেনশিয়াল ফিশিং অ্যাটেম্পট’ লেখা আসে। একই লিংক তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ওয়েবসাইটেও রয়েছে। সেখান দিয়ে প্রবেশ করার ক্ষেত্রেও একই ঝুঁকির কথা বলা হয়।

কেন এ ধরনের ঝুঁকির কথা বলা হচ্ছে, তা জানতে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এখন ব্রাউজারগুলো সংবেদনশীল (সেনসিটিভ)। কোনো সাইটে যদি নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকে, তাহলে ব্রাউজার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্ক করবে। এ সাইটের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। তিনি আরও বলেন, ‘প্লে স্টোরের বাইরে অন্য কোনো বিশ্বাসযোগ্য উৎস থেকে অ্যাপ ইনস্টল করলে সমস্যা নেই। কিন্তু সেটার মধ্যে যদি কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকে এবং উৎস পরিচিত না হয়, তাহলে ডিভাইসের ক্ষতি হতে পারে। কারণ ম্যালওয়্যার বা ভাইরাসজাতীয় কিছু ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে।

লিংক ধরে ঢুকতে না পারার পর ৫০০ অ্যাপের তালিকা চাইতে ১০ ও ১১ নভেম্বর এই প্রতিবেদক যান তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে। বিভাগের কর্মকর্তারা কী কী জিজ্ঞাসা, তা লিখিতভাবে জানতে চান। লিখিতভাবে জানানোর দুদিন পর তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের উপসচিব (পরিকল্পনা অধিশাখা) আসপিয়া আকতারকে ফোন করা হলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের কাছেও অ্যাপের তালিকা নেই।

অবশ্য এর আগে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের মোবাইল গেম ও অ্যাপ্লিকেশনের দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক আনোয়ারুল ইসলামের কাছে গেলে তিনি তাঁর বিভাগের অন্য কর্মকর্তাদের কাছে পাঠান। এক কর্মকর্তা এই প্রতিবেদকের সামনেই ৫০০ অ্যাপসের সাইটে ঢুকতে পারেননি। তাঁর কম্পিউটারে ‘অ্যাকসেস ডিনাইড’লেখা দেখাচ্ছিল।

তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের কাছে তালিকা না পেয়ে যোগাযোগ করা হলে ইএটিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ মুবিন খান প্রথম আলোকে বলেন, অ্যাপগুলো তৈরি করে ২০১৫ সালের জুনে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগকে হস্তান্তর করা হয়। অ্যাপ বানানোর পরে রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত কোনো চুক্তি ছিল না। তিনি আরও বলেন, অ্যাপগুলোকে কাজে লাগাতে পারলে ভালো হতো।

তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ৫০০ অ্যাপের একটি সিডি বিভাগটির ‘মোবাইল গেম ও অ্যাপ্লিকেশনের দক্ষতা উন্নয়ন’ নামে একটি প্রকল্পকে দেওয়া হয়েছিল। তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ ২০১৬ সালে এ প্রকল্প নেয়। ২০১৭ সালের শুরুর দিকে ৫০০ অ্যাপকে প্রকল্পের অধীনে নেওয়া হয়। তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অ্যাপগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। কর্মকর্তারা ২০১৯ সালের মার্চে এসব জানিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেন। তবে কোনো সাড়া পাননি।

আগে প্রয়োজন বুঝতে হবে। তারপর অ্যাপ তৈরি করতে হবে। সেটা না বুঝেই যদি অ্যাপ তৈরি করা হয়, তাহলে মানুষ তা ব্যবহার করবে না।
মইনুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে সুমন আহমেদ বলেন, ‘সফটওয়্যার অথবা হার্ডওয়্যার, যেটাই হোক না কেন, তা রক্ষণাবেক্ষণের একটা বিষয় রয়েছে। সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে আপডেট (হালনাগাদ) করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি নিয়মিত বদলাচ্ছে। তিনি বলেন, দেশে প্রকল্পের মাধ্যমে কোনো কিছু তৈরি করার পর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলাদা কোনো পরিকল্পনা বা বাজেট রাখা হয় না। ফলে তা অপ্রয়োজনীয় ও অকার্যকর হয়ে যায়।

১০০ অ্যাপ আছে, ব্যবহার সামান্য

তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ ১০০টি অ্যাপ তৈরি করেছিল জাতীয় পর্যায়ে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন উন্নয়নে সচেতনতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি কর্মসূচির আওতায়। ২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে বাস্তবায়িত এ কর্মসূচির বাজেট ছিল ৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। অ্যাপগুলো তৈরি করেছিল মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট অ্যান্ড কমিউনিকেশনস লিমিটেড (এমসিসি)। তারা জানায়, শুধু অ্যাপ বানানোর খরচ ছিল প্রায় ১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।

১০০টির তালিকা থেকে গুগল প্লে স্টোরে ৯৫টি অ্যাপ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে ৯৩টির ব্যবহার ও সর্বশেষ পরিস্থিতি (১ থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত) পর্যালোচনা করা হয়। দেখা যায়, ১০০ বারের কিছু বেশি ডাউনলোড করা হয়েছে ১৮টি অ্যাপ। এ ছাড়া ৫০০ বারের বেশি ডাউনলোড হয়েছে ১৩টি, এক হাজার বারের বেশি ৩৩টি, পাঁচ হাজার ও ১০ হাজারের আশপাশে ডাউনলোড হয়েছে ২৪টি অ্যাপ। এর মানে হলো, ৮৮টি অ্যাপের তেমন কোনো ব্যবহার নেই। দুটি অ্যাপ ৫০ হাজার ও তিনটি অ্যাপ ১ লাখ বারের বেশি ডাউনলোড হয়েছে। তুলনামূলক বেশি ডাউনলোড হওয়া অ্যাপের মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধু, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও টেক্সট বুক নামের অ্যাপ তিনটি।

এসব অ্যাপের উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান এমসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফ আবির প্রথম আলোকে বলেন, ২০১৫ সালে কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর তাঁরা নিজেদের দায়িত্বেই অ্যাপগুলো প্রায় দুই বছর রক্ষণাবেক্ষণ করেন। পরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগগুলোর উপস্থিতিতে হস্তান্তর করা হয়। অ্যাপগুলো রক্ষণাবেক্ষণের কোনো বাজেট বা চুক্তি এমসিসির সঙ্গে হয়নি। তিনি আরও বলেন, হস্তান্তর করা হয়ে গেলেও গুগল প্লে স্টোরে রাখার জন্য হোস্টিং সার্ভারের বার্ষিক খরচ এখনো এমসিসিকে বহন করতে হচ্ছে। অ্যাপ বানানোর পর অ্যান্ড্রয়েডের অনেকগুলো সংস্করণ বা ভার্সন এসেছে। তাই আপডেট করা জরুরি।

৯৩টি অ্যাপের পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (বিএইচবিএফসি) ও কোস্টগার্ড শিরোনামের তিনটি অ্যাপ ২০২০ সাল পর্যন্ত আপডেট করা। বাকিগুলো ২০১৭ সালের পর আর আপডেট করা হয়নি। গুগল প্লে স্টোরে দেখা যায়, প্রায় সব কটি অ্যাপের ক্ষেত্রেই হালনাগাদ সংস্করণ প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ তৈরি করে দেওয়ার পরও কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেরা টাকা ব্যয় করে অ্যাপ তৈরি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ বিমান। তাদের নিজেদের তৈরি অ্যাপটি ২০১৯ সালে গুগল প্লে স্টোরে দেওয়া হয়। এটি ২২ নভেম্বর পর্যন্ত ১ লাখের বেশি ডাউনলোড হয়েছে।

‘আগে প্রয়োজন দেখা জরুরি’

সরকারের উদ্যোগে তৈরি এসব অ্যাপ সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মইনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, অ্যাপ বানানোর দুটি দিক থাকে। একটি হলো প্রযুক্তিগত ডিজাইন ঠিকমতো করা। অন্যটি হলো এর কার্যকারিতা ও মানুষ এটি কেন আর কীভাবে ব্যবহার করবে, তা সঠিকভাবে জানা। তিনি বলেন, আগে প্রয়োজন বুঝতে হবে। তারপর অ্যাপ তৈরি করতে হবে। সেটা না বুঝেই যদি অ্যাপ তৈরি করা হয়, তাহলে মানুষ তা ব্যবহার করবে না।

মন্তব্য করুন