লুকিয়ে খেলার শুরু

স্কুলে স্কাউট দলের সদস্য ছিলেন। কলেজপর্যায়ে নাসরিন বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কর্পসের (বিএনসিসি) সদস্য হন শুধু দেশের নানা প্রান্তে বেড়ানোর লোভে। মিরপুর সরকারি বাংলা কলেজে সে সময় বিএনসিসির তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক ফারুক ঢালী। তিনি বাংলাদেশ আর্চারি ফেডারেশনের অন্যতম সদস্য। নাসরিনের আর্চারিতে আসার গল্পটা ফারুকের মুখেই শোনা যাক, ‘যে মেয়েরা বিএনসিসিতে আসে, তাদেরকে আমরা আর্চারি খেলার জন্য উৎসাহ দিই। নাসরিনের উচ্চতা ও শারীরিক গড়ন আর্চারি খেলার উপযুক্ত ছিল। ওকে প্রস্তাব দিতেই ও রাজি হয়ে যায়।’

নাসরিন খেলতে চাইলেও মা শুরুতে তা চাননি। মেয়ে খেলাধুলা করলে আত্মীয়স্বজন কী বলবে! তাই দীর্ঘদিন পর্যন্ত স্বজন-পড়শিদের কাছে মেয়ের খেলাধুলার খবর লুকিয়ে রেখেছিলেন তিনি।

তির-ধনুকের নিশানা ভেদের খেলাটা তত দিনে নাসরিনের মনে ধরেছে। তিনি বলছিলেন, ‘শুরুতে মাকে বলতাম না খেলতে যাচ্ছি। কলেজে ক্লাস করার কথা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে খেলতে চলে যেতাম।’

আর্চারিই আশীর্বাদ

মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে নাসরিনের বাবা নাসির উদ্দিন ছিলেন রুমালের পাইকারি ব্যবসায়ী। পাশাপাশি গাবতলীতে পত্রিকা বিক্রি করতেন। কিন্তু কিডনির রোগে ভুগে ২০০৯ সালে হঠাৎ বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবারে নেমে এসেছিল ঘোর অন্ধকার। মেয়ের পড়ালেখার খরচ জোগাতেও মা হিমশিম খাচ্ছিলেন। নাসরিনের পরিবারের জন্য আর্চারি খেলাটা একরকম আশীর্বাদ হয়েই আসে, ‘ভেবে পাচ্ছিলাম না কীভাবে মাকে সাহায্য করা যায়। আর্চারি খেলার সুবাদে যখন সেনাবাহিনীতে চাকরি হলো, মনে হলো আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছি। বেতনের প্রথম টাকাটা মায়ের হাতে তুলে দেওয়ার পর আমাকে জড়িয়ে ধরে মায়ের সেকি কান্না!’

default-image

বাবার স্বপ্ন ছিল মেয়ে বড় হয়ে শিক্ষক হবে। নাসরিন নিজেও এমন স্বপ্নই দেখছিলেন। কিন্তু চক-ডাস্টারের বদলে তাঁর হাতে এখন তির-ধনুক। আর্চারির প্রেমে এতটাই পড়েছেন যে ক্যাম্প থেকে ছুটি পেয়ে বাড়িতে গেলেও মন টানে টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ্‌ মাস্টার স্টেডিয়াম, ‘টানা অনুশীলন করতে করতে ক্লান্ত হওয়ার পর বাড়িতে যাই। কিন্তু সেখানেও ভালো লাগে না। মনে হয় সময় কাটছে না। বরং গিয়ে অনুশীলন শুরু করলে ভালো হতো। আসলে আর্চারিটা রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে। অসুস্থ থাকলেও রুমের মধ্যে শুয়ে ভালো লাগত না। শুধু মনে হতো, অনুশীলনে গেলে নিশ্চয় ভালো লাগবে।’

এখন তিনি দলের সেরা খেলোয়াড়

আর্চারি ওয়ার্ল্ড কাপ, এশিয়ান আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপ, এশিয়ান গেমস, ইসলামিক সলিডারিটি আর্চারি, এশিয়া কাপসহ সব মিলিয়ে ১০টি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন নাসরিন। এর মধ্যে থাইল্যান্ডের ফুকেটে অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টটিকে সেরা বলে মানেন।

কাঁধের চোটের কারণে এই টুর্নামেন্টে খেলা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। কিন্তু নাসরিন যা করেছেন, দেখে জাতীয় দলের জার্মান কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখও চমকে গেছেন। তিনি বলেন, ‘এই টুর্নামেন্টটা নাসরিনের অবিশ্বাস্য উত্থানের গল্প হয়ে থাকবে। ও কোয়ালিফিকেশন রাউন্ডে রেকর্ড করে সবাইকে চমকে দিয়েছে। ওর পারফরম্যান্সে আমি বিস্মিত।’

২০১৯ সালে নেপালে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ এসএ গেমসে বাংলাদেশ আর্চারি দল দশে দশ পেয়েছিল। আর্চারি খেলায় যেমন বুলস আইয়ে ‘পারফেক্ট টেন’ মারলেই সোনা নিশ্চিত, তেমনি বাংলাদেশের আর্চাররা ১০টি ইভেন্টের মধ্যে ১০টিতেই জেতেন সোনা। অথচ ওই দলের সদস্য হয়ে পোখারায় গিয়েও সেবার আর্চারি খেলা হয়নি নাসরিনের। সেই কষ্ট এখনো পোড়ায় তাঁকে, ‘এসএ গেমসের কষ্টের স্মৃতি কখনোই ভুলব না। ওই সময় রিকার্ভ দলের চার খেলোয়াড়ের মধ্যে আমি ছিলাম চতুর্থ। স্বাভাবিকভাবেই কোচ আমাকে বিবেচনায় রাখেননি। তখন সবাই একে একে সোনা জিতত, আমি চেয়ে চেয়ে দেখতাম। মাঝেমধ্যে কান্না পেত। কিন্তু হতাশ হইনি। আমার মধ্যে জেদ কাজ করত। তখন থেকেই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, যেভাবেই হোক দলের সেরা খেলোয়াড় হব। আমিও একদিন তিনটি ইভেন্টে সোনা জিতব। এবার মনে হয়েছে, একটা কিছু করতে পেরেছি।’

default-image

গত বছরের জুলাইয়ে নাসরিনের বিয়ে হয়েছে। স্বামী সায়েম তালুকদার থেকে শুরু করে শ্বশুরবাড়ির সবাই তাঁকে সমর্থন করেন বলে জানালেন।

একটা সোনার পদক যেন বদলে দিয়েছে সেনাবাহিনীর আর্চার নাসরিনকে। থাইল্যান্ড থেকে ফিরে ২১ মার্চ নিজ বাহিনীর নিয়মকানুনের আনুষ্ঠানিকতা সারতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে গিয়েছিলেন। সন্ধ্যায় ফেরেন সেনাবাহিনীর পোশাক পরে। ক্যাম্পে এসে আনন্দের খবরটা ভাগ করে নেন সবার সঙ্গে, ‘ইউনিটে গিয়ে জেনেছি, সেনাবাহিনী প্রধান স্যার আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন।’

জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হবে বলে ক্যাম্প থেকে এখনো বাড়ি যেতে পারেননি। মায়ের সঙ্গে দেখা করার আকুতি নাসরিনে কণ্ঠে, ‘কখন মায়ের গলায় পদকটা পরিয়ে দেব, সেটাই ভাবছি। আগে মা আমাকে খেলতে দিতেন না। এখন আমি কিছু জিতলে মা-ই বেশি খুশি হন।’

পড়াশোনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন