default-image
>প্রেক্ষাগৃহের বড় পর্দার আবরণ সরে না অনেক দিন। দর্শকের আসনগুলোতে জমেছে ধুলো। করোনাভাইরাসের বিস্তার কমাতে দেশের প্রেক্ষাগৃহগুলোর দরজা বন্ধ হয় ১৮ মার্চ থেকে। ঈদুল ফিতর তো গেলই, ঈদুল আজহাতেও এই স্থবিরতা হয়তো কাটবে না। বেশ কয়েকটি তারকাবহুল ছবি সেই কবে থেকেই মুক্তির মিছিলে, কিন্তু করোনার কারণে এগুলোর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। তেমনই কয়েকটি আটকে থাকা ছবি নিয়ে এই প্রতিবেদন। লিখেছেন শফিক আল মামুন

ঊনপঞ্চাশ বাতাস
বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আশাবাদী নির্মাতা
মাসুদ হাসান উজ্জ্বল পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র উনপঞ্চাশ বাতাস নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ ছিল আগে থেকেই। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি মাসে যখন ট্রেলার ছাড়া হয়, তখন থেকেই ছবিটি নিয়ে আলোচনা বেড়ে যায়। কথা ছিল ১৩ মার্চ ছবিটি মুক্তি পাবে দেশজুড়ে। কিন্তু মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে দেশে প্রথম করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়, ছড়িয়ে পড়তে থাকে আতঙ্ক। প্রেক্ষাগৃহে দর্শক কমতে থাকে। আর এই চিত্র দেখে নির্ধারিত তারিখে উনপঞ্চাশ বাতাস ছবির মুক্তি নিয়ে দ্বিধায় পড়েন নির্মাতা। শেষ অবধি ছবিটির মুক্তি স্থগিত করা হয়। এর কিছুদিন পরই ঘোষণা আসে অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশের সব প্রেক্ষাগৃহ বন্ধের।
মাসুদ হাসান উজ্জ্বল বললেন, ‘মুক্তির সব আয়োজনই ছিল। কিন্তু ওই সময় দেখলাম করোনার আতঙ্কের প্রভাব পড়েছে হলগুলোতে। চিন্তা করলাম, এখন মুক্তি দেওয়া ঠিক হবে না। দর্শক পাওয়া যাবে না। এত কষ্ট করলাম ছবিটি নিয়ে, আরেকটু অপেক্ষা করি।’
উনপঞ্চাশ বাতাস নির্মাণে সময় লেগেছে প্রায় দুই বছর। মাঝে আরেক বছর চলে যাচ্ছে করোনা থেকে মুক্তির অপেক্ষায়। অপেক্ষার এই সময়ে ছবি–সংশ্লিষ্টদের জীবন থেমে নেই। নির্মাতা উজ্জ্বল রাত–দিন চেষ্টা করছেন মহামারির সময়েও সিনেমা মুক্তির বিকল্প উপায় বের করার। এই পরিচালক বললেন, ‘ইন্টারনেটে একটি স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম আমাকে ডেকেছিল। ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। ছবিটি তাদের দেওয়ার ব্যাপারে আমি এখনো কিছুই বলিনি। মনে হয়েছে প্রেক্ষাগৃহে চলার পর কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে দিলে ছবির খরচটা পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ হতো।’ আরও দুই জায়গায় কথা বলেছেন উজ্জ্বল। তবে সবই আছে প্রাথমিক পর্যায়ে। উজ্জ্বল বলেন, ‘যদি ঠিকঠাক কাজ হয়, তাহলে এটি একা আমার না, বাংলাদেশের সিনেমার জন্য আশাজাগানিয়া একটি ব্যাপার হবে।’
সিনেমা মুক্তির অপেক্ষায় থাকতেই ছবির অভিনেতা ইমতিয়াজ বর্ষণ হারিয়েছেন তাঁর বাবাকে। অভিনেত্রী শার্লিন ফারজানা হয়ে গেছেন উদ্যোক্তা, ফেসবুক পেজ খুলে সেখান থেকে নিজের হাতে রান্না করা খাবার সরবরাহ করছেন।
সিনেমা হল কবে খুলবে, তার নিশ্চয়তা নেই। এদিকে কোটি টাকা বাজেটের এই সিনেমার বয়স বেড়ে যাচ্ছে, আটকে আছে পুঁজি। তাই মাসের পর মাস আর প্রেক্ষাগৃহ খোলার ভরসায় বসে থাকবেন না উজ্জ্বল। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, একটু চোখ-কান খোলা রেখে এগোলে প্রেক্ষাগৃহ ছাড়াই একটি ভালো ছবি থেকে এক-দুই কোটি টাকা তুলে আনা সম্ভব।’

শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ ২
অপেক্ষা সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের
ছবিটি সেন্সর বোর্ডের সনদ পেয়েছে গত ১৪ জানুয়ারি। ১৪ ফেব্রয়ারি ভালোবাসা দিবসে ছবিটি মুক্তির কথা ছিল। পরে পিছিয়ে ২০ মার্চ মুক্তির দিন চূড়ান্ত হয়। কিন্তু করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে থাকলে ১৮ মার্চ থেকে সিনেমা হল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। আটকে যায় শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ ২ ছবির মুক্তি।
ছবির প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আরটিভির অনুষ্ঠান প্রধান দেওয়ান শামসুর রাকিবের কথায়, ‘করোনার আতঙ্ক মানুষের মন থেকে যেতে সময় লাগবে। প্রেক্ষাগৃহে এর প্রভাব ভালোভাবেই পড়বে। তাই লাভের কথা ভাবছি না, এই পরিস্থিতিতে পুঁজি নিয়েই ভাবতে হচ্ছে।’
সিনেমা হল খুলবে, দর্শকেরা সিনেমা হলে ভিড় জমাবেন, সেই প্রত্যাশায় রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। রাকিব জানান, যদি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় এবং প্রেক্ষাগৃহ খুলে দেওয়া হয়, তাহলে সেপ্টেম্বর–অক্টোবর মাসে মুক্তি পেতে পারে শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ ২। যদি সে পর্যন্তও পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হয়, তাহলে অপু বিশ্বাস ও বাপ্পী অভিনীত এই ছবি নিয়ে বিকল্প পরিকল্পনা আছে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের।
শামসুর রাকিব বলেন, ‘পরিস্থিতি ভালো না হলে ছবিটি আর মাসের পর মাস ফেলে রাখা যাবে না। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত দেখব। নাহলে বিকল্প ব্যবস্থায় ছবি মুক্তি দেব।’ শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ ২ ছবিটি পরিচালনা করেছেন দেবাশীষ বিশ্বাস।

বিশ্ব সুন্দরী
প্রেক্ষাগৃহেই মুক্তি
চয়নিকা চৌধুরী পরিচালিত, সিয়াম ও পরীমনি অভিনীত বিশ্ব সুন্দরী ছবিটি ৫ মার্চ সেন্সর বোর্ড থেকে ছাড়পত্র পায়। ২৭ মার্চ মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই ছবির ভাগ্যেও লেখা হলো অনিশ্চয়তা। গত ডিসেম্বরে এই ছবির গান মুক্তি পায় ইউটিউবে। বেশ সাড়া ফেলে ‘তুই কি আমার হবি রে’ ও ‘সুন্দর মানুষ’ গান দুটি। কিন্তু এখন আর নতুন কোনো আলোচনা নেই ছবি ঘিরে। যদিও ছবির এই আটকে থাকা নিয়ে ততটা উদ্বিগ্ন নন বিশ্ব সুন্দরীর নির্বাহী প্রযোজক অজয় কুন্ডু। তিনি বললেন, ‘বিনিয়োগ আটকে আছে, এটা ঠিক। তবে এটা শুধু আমাদের ছবির সমস্যা নয়। সারা দুনিয়াতেই নতুন ছবিগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। সবাই ভুক্তভোগী।’
প্রযোজক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষা করবেন। সময় লাগলেও প্রেক্ষাগৃহেই মুক্তি দেবেন বিশ্ব সুন্দরী। তাই আপাতত বিকল্প কোনো পথ খুঁজছেন না।

বিদ্রোহী
ঈদ ছাড়া উপায় নেই
প্রায় আড়াই বছর আগে শুরু হয়েছিল বিদ্রোহী ছবির কাজ। শাকিব খান ও বুবলী অভিনীত এই ছবির পরিচালক শাহিন সুমন। মার্চ মাসে সেন্সর সনদ পায় প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে এই ছবি। প্রযোজক ও নির্মাতার লক্ষ্য ছিল ঈদ উৎসবের বাজার ধরার। করোনা ভেস্তে দেয় সেই পরিকল্পনা। তাই এখন অপেক্ষা ঈদুল আজহার। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান শাপলা মিডিয়ার প্রধান সেলিম খান বলেন, ‘এখন তো সিনেমার অবস্থা আরও খারাপ। তাই উৎসব ছাড়া এই ছবি মুক্তির কোনো বিকল্প পথ দেখছি না। বড় বাজেটের ছবি বিদ্রোহী। অপেক্ষা ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই। দীর্ঘ সময় ধরে ছবিটিতে পুঁজি আটকে থাকার কারণে ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু কিছু তো করার নেই।’

সিদ্ধান্ত হবে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে
মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল
হল প্রশাসক (উপসচিব), বাণিজ্য মন্ত্রণালয়
প্রেক্ষাগৃহ খুলে দেওয়ার আবেদন করে প্রযোজক সমিতির পাঠানো চিঠি পেয়েছি। কিন্তু হুট করে এই সিদ্ধান্ত আমরা দিতে পারি না। সিদ্ধান্ত হবে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে। হলমালিক ও চলচ্চিত্র প্রযোজকদের ক্ষতির বিষয়গুলো তুলে ধরে বাণিজ্যসচিবের কাছে প্রেক্ষাগৃহ খোলার সুপারিশ করে চিঠি দিয়েছি। সচিব মহোদয় চিঠিটি কেবিনেটে পাঠাবেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে মন্ত্রিপরিষদ। যদি মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে হল খোলার অনুমতি দেয়, তাহলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে লিখিত একটি দিকনির্দেশনা দিয়ে চলচ্চিত্র প্রদর্শন করার চিঠি দেওয়া হবে প্রেক্ষাগৃহের মালিকদের।

বিজ্ঞাপন
বিনোদন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন