default-image

মানুষ কি তার শেষ যাত্রার আহ্বান শুনতে পায়? কলকাতার চিত্র পরিচালক শৈবাল মিত্র কয়েক বছর ধরে পরিকল্পনা করছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান দুই অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও নাসিরুদ্দিন শাহকে কীভাবে একই ফ্রেমে এনে বড় একটা কাজ করা যায়। এ নিয়ে দুই অভিনেতাও নাকি মুখিয়ে ছিলেন একটা ভালো গল্প আর পরিচালকের জন্য।

শৈবাল মিত্রের তখন কুয়াশা ছিল ছবিতে অভিনয় করছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। শুটিং চলাকালে জানতে পারলেন, শৈবালের আগামী ছবি আ হোলি কনসপিরেসি জেরোম লরেন্সর বার্ট ই লির লেখা নাটক ইনহেরিট দ্য উইন্ড থেকে অনুপ্রাণিত। আরও জানতে পারলেন, এর দুই প্রধান উকিল চরিত্রের একটিতে অভিনয়ের সম্মতি জানিয়েছেন নাসিরুদ্দিন শাহ।

নাটকটি সৌমিত্রর পড়া ছিল। এ সুযোগ তিনি আর হাতছাড়া করতে চাইলেন না। শৈবালকে জানিয়ে দিলেন, নাসিরউদ্দিনের সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার এ সুযোগ তিনি ছাড়তে চান না। অন্য উকিলের চরিত্র তিনিই করবেন।

বিজ্ঞাপন

আমারও দারুণ সৌভাগ্য। আমাকেও ছবিটির অন্যতম একটি চরিত্রে অভিনয়ের আমন্ত্রণ জানালেন। বারবার শুটিংয়ের সময় বদলাতে থাকল। কখনো নাসিরুদ্দিন শাহ অসুস্থ, কখনো সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি যে ক্যানসারসহ নানা রোগে আক্রান্ত, সেটি কাউকেই বুঝতে দেন না। দারুণ প্রাণবন্ত মানুষ। অভিনয় করেছেন সিনেমা ও নাটকে। পাশাপাশি আবৃত্তি করেছেন, কবিতা লিখেছেন।

২০১৯-এর এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে কলকাতায় পৌঁছালাম। শুটিং শুরু হবে ৯ মে। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার পার্পল মুডি টাউনে আদালত তৈরি করা হয়েছে। পরিচালক ক্যামেরার ট্রলিতে বসে শেষ লুক থ্রু করে নিচ্ছেন। ফ্লোরে প্রবেশ করলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। দেখে কে বলবে বয়স ৮৫, যেন বড়জোর ৬০। তাঁকে শেষ দেখেছিলাম ১০-১৫ বছর আগে। সেই মিষ্টি-সরল হাসি।

default-image

নির্দিষ্ট বেঞ্চিতে বসতে বসতে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, হেরম্ব কোথায়? হেরম্ব? গির্জার পাদরির সেই চরিত্র আমিই করছি। রাজ্যসভার সদস্য ও ভারতের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের রেভারেন্ড হিসেবে গির্জার পক্ষে চরিত্রটি লড়তে এসেছেন দিল্লি থেকে। পরিচালকের বিশেষ সহকারী ও স্ক্রিপ্ট রিডার উৎসব চ্যাটার্জি পাশ দিয়েই যাচ্ছিলেন। ঘুরে আমাকে দেখিয়ে বললেন, ‘এই যে, আপনার পেছনেই বসে আছেন। প্যারিস থেকে এসেছেন।’ মুখ পেছনে ফিরিয়ে হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ক্যাথরিন বার্জকে চেনো? প্যারিস থেকে এসে আমাকে নিয়ে গাছ নামে একটা ডকুমেন্টারি করেছে?’

জানালাম আমরা ভালো বন্ধু। বললাম, ‘ক বছর আগে শাতলে সিনেতে এর উদ্বোধনে আপনি যেতে পারেননি। শর্মিলা ঠাকুর গিয়েছিলেন। আমি দোভাষীর কাজ করেছিলাম।’ শুনে কী মনে করে অনেকক্ষণ হাসলেন। জিজ্ঞাসা করলাম, আমাকে চিনতে পারছেন কি না? তাঁর বাড়িতে বেশ কবার গিয়েছি। লজ্জা পেয়ে বললেন, ‘অনেক দিন দেখিনি তো। হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমার স্ত্রী আর তুমি তো একই শহরের মানুষ, পাবনা।’

নাসিরুদ্দিন শাহ উকিল হয়ে ফ্লোরে ঢুকলেন। চোখ মেঝেতে। বসলেন উল্টো দিকের বিরোধী পক্ষের বেঞ্চে। মিনিট দুই আড় চোখাচোখি করে উঠে এলেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও উঠে দাঁড়ালেন। জড়িয়ে ধরলেন পরস্পরকে। নাসিরুদ্দিন ডাকলেন ‘দাদা’, সৌমিত্র ডাকলেন ‘নাসির’। অসাধারণ দৃশ্য!

১০ দিন ধরে এ দুই বিশাল অভিনেতার লড়াই ছিল শুটিংয়ের প্রধান বিষয়। আমাদের কাজ যেন সামান্য হয়ে গেল। মনে হলো, স্পেনের জগদ্বিখ্যাত ষাঁড়লড়াই দেখছি। চলচ্চিত্রটির বড় অংশজুড়ে ইংরেজিতে তাঁদের যুক্তিতর্ক ও বিশ্লেষণ—আমাদের সমাজ, রাজনীতি, ধর্ম নিয়ে। কোনো কাট ছাড়াই পাতার পর পাতা সংলাপ বলে যাচ্ছেন। সৌমিত্র তাঁর কাব্যিক বাচনে যুক্তি দিচ্ছেন। নাসিরুদ্দিন শাহ গাম্ভীর্যের সঙ্গে, কিন্তু সিংহগর্জনে তাঁর বিশ্লেষণ করছেন।

বিজ্ঞাপন

২৩ মে কলকাতা শহরতলির লিলুয়ার গির্জায় পড়ন্ত বিকেলে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার কিছু কাজ। সেদিন তিনি কেন যেন অসম্ভব অস্থির। বারবার বলছিলেন, ‘আমার ভালো লাগছে না। চলে যাব। শৈবাল আমাদের অংশটা শেষ করল না কেন?’ তাঁকে বললাম, ‘আপনি তো গরমে শান্তিনিকেতনে শুটিং করতে যাচ্ছেন না। আমিও প্যারিসে ফিরে যাব। এই গরমে আপনাকে আর বিরক্ত করব না। পরেরবার আড্ডা হবে।’ আমার কাঁধে হাত রেখে তিনি বললেন, ‘পরেরবার যখন তুমি আসবে, আমায় আর দেখতে পাবে না।’ এরপর বললেন, ‘আমার কিছু আর ভালো লাগে না। অনেক করেছি। এরপরও বাঙালি আমাকে ভুলে গেলে আর কিছু করার নেই।’

আ হোলি কনসপিরেসি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের শেষ ছবি। ছবিটি অভিনেতা সৌমিত্রর আরেক উচ্চতা দেখানোর অপেক্ষায় রইল।

মন্তব্য পড়ুন 0