default-image

ভাবতেই পারিনি, ঢুকতেই দেখা হয়ে যাবে স্যারের সঙ্গে!

মাথায় সেই গোলগাল ফেদোরা হ্যাট। পরনে রংবাহারি চেক শার্ট। স্যার উজ্জ্বল রঙের প্রিন্টের শার্ট খুব ভালোবাসেন জানি। উজ্জ্বল জামা পরলে নাকি মন ভালো থাকে। স্যারকে জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল, এও কি তাঁর মন ভালো রাখার কৌশল?
শার্টের ওপরে একটা ব্লেজার চাপানো। তখন ক্যালেন্ডারেই কেবল শীতকাল। সূর্যটা কেমন রাগী রাগী হেডমাস্টারের মতো তেজ নিয়ে হাজির। দিনটা পয়লা ফাল্গুন (১৩ ফেব্রুয়ারি) বলেই হয়তো বাতাসে মাতাল মাতাল একটা গন্ধও। বসন্তেরই মাতাল সমীরণে...
এক তোড়া দৈনিক পত্রিকা ঠেসে চেপে ধরে আছেন বুকে। আনমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন হুমায়ূন আহমেদ। চৌকো ফ্রেমের ভারী কাচের আড়াল থেকে মায়াবী চোখ জোড়া স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
এমন মায়াবী চোখ দিয়ে দেখেছেন বলেই খুব সাধারণ একটা ঘটনার মধ্যেও কেমন মায়া আবিষ্কার করেছেন। সেই মায়ার জগতে আমাদের নিয়ে গেছেন। ইনফ্রারেডের মতো মায়ারও বুঝি আলাদা তরঙ্গ আছে, বিশেষ ধরনের চশমা লাগালেই কেবল দেখা যায়। আমাদের দেওয়া স্যারের সবচেয়ে বড় উপহারের নাম সেই বিশেষ অদৃশ্য চশমা। যেটি দিয়ে আমরা অরু-মুহিবদের জগৎটা দেখতে পাই।
কেমন মায়াবী ছেলে মুহিব? তাঁর খুব শখ অরুর কণ্ঠটা একবার শুনবে। পকেটে মোবাইল তো দূরের কথা, টাকাই নেই। তাহলে উপায়?
হুমায়ূন আহমেদের তৈরি সেই জগৎটায় গ্রিন ফার্মেসি নামের একটা ওষুধের দোকান কোথাও না কোথাও থাকবেই, যেখানে আছে সেই অলৌকিক ল্যান্ডফোন। কিন্তু ফার্মেসিতে শুধু ল্যান্ডফোন থাকে না, থাকে পাষাণহৃদয়ের কর্মচারীও। ‘ভাই, আমার বউয়ের খুব অসুখ, এক্ষুনি একটা ফোন করতে না পারলে...।’ কাঁদো কাঁদো গলায় কাজ হয়। মুহিব অরুর বাসার ল্যান্ডফোনে ডায়াল করে।
এই মুঠোফোনের যুগে বহুকালের শীতনিন্দ্রা থেকে ল্যান্ডফোনগুলো এখনো অকস্মাৎ জেগে ওঠে, মুহিবরা সেখানে ফোন করে অরুদের খোঁজে বলেই। ল্যান্ডফোনে কথা বলার সময় অরুরা যে কেমন সংশয়, দ্বিধা নিয়ে কী মিষ্টি করে ‘হ্যালো, কে’ বলে। কণ্ঠস্বর শোনার আগেই ওপাশের মানুষটাকে চিনে ফেলার এই মোবাইল ফোনের যুগেও মুহিবরা এখনো এই সাসপেন্সটাকেই ভালোবাসে।
কিন্তু অরু-মুহিবদের জগতে সবাই কি এমন মায়াবী? না! সেখানে কিছু কিছু মানুষ আছে, যাঁদের বুকে বসানো থাকে ক্যালকুলেটর। যেমন মুহিবের দুলাভাই। খাঁচায় বন্দী পাখিদের গান শোনাচ্ছে দেখে স্ত্রীকে যিনি তিরস্কার করেন, ‘এত টাকা খরচ করে গান শিখিয়েছি পাখিদের শোনানোর জন্য?’ যেমন অরুর বাবা। সুপাত্রের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে যিনি বলেন, ‘গাধা টাইপের ছেলের সঙ্গে মহাসুখে সংসার করার চেয়ে ব্রাইট ছেলের সঙ্গে মোটামুটি জীবন কাটানো ভালো।’
কিন্তু অরুরা মুহিবকেই বেছে নেয়, যাদের বুকে ক্যালকুলেটরে ঠকঠক নেই, আছে হৃদয়ের ঢিপঢিপ। ‘বাসররাতে তুমি কিন্তু একটুও ঘুমাতে পারবে না বলে দিচ্ছি। আমরা সারা রাত গল্প করব। তোমাকে শোনানোর জন্য সাতটা গল্প ঠিক করে রেখেছি।’ হুমকি দেওয়া মুহিবই ঘুমিয়ে পড়ে সবার আগে। ক্যাটক্যাটে হলুদ রঙের পাঞ্জাবিটা পোড়ানোর পরিকল্পনাও তাই কল্পনাতেই থেকে যায়।
অরু তখনো জানত না, এত দিন ধরে ভালোবাসার মিহি সুতোয় সংসার নিয়ে যত পরিকল্পনা সে বুনেছে, এর কিছুই হয়তো সত্যি হবে না। অরুর দুঃস্বপ্নে হাতের আঙুলে যখন সুই বেঁধে, তখনই যেন অনাগত কোনো দুর্ঘটনার শঙ্কায় আমাদের বুক কেঁপে ওঠে। বিয়ের পরদিনই মুহিবের মারাত্মক দুর্ঘটনা। সেখান থেকে আইসিইউতে। মুহিব তখন কোমায়। অনেক দেরিতে খবর পায় অরু। ডাক্তাররা ততক্ষণে ছেড়ে দিয়েছে হাল। বিছানার পাশে রাখা ছোট্ট কার্ডিওগ্রাফ মনিটরে চলমান রেখাটি স্থির সরলরেখায় চলে আসতে পারে যেকোনো মুহূর্তে।
খবর পেয়ে ছুটে আসে অরু। এভাবে মুহিব পালিয়ে যাবে, এত সহজ? সাতটি গল্প শোনা তখনো বাকি। হলুদ পাঞ্জাবি পোড়ানো তখনো যে বাকি!
পর্দায় কখন ‘সমাপ্ত’ লেখা ভেসে উঠেছে, বুঝতে দেরিই হয়ে যায়। গল্পের ঘোর তখনো কাটেনি বলে বলাকার হলভর্তি দর্শকদের হাততালিও যেন বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির মতো শোনায়। মাত্র দুই সারি সামনে বসে থাকা মেহের আফরোজ শাওনের মুখটা দেখতে ইচ্ছে করছিল খুব। প্রথম ছবি, আরও একবার ‘প্রথম মা’ হওয়ার অনুভূতিতে আচ্ছন্ন তিনি তখন।
সবাই এসে অভিনন্দন জানিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদও করছেন। তবু যেন শাওনের মন ভরছে না। এত এত মানুষের ভিড়েও তিনি যেন কাউকে খুঁজছেন। মনে হলো শাওন যেন সেই কথা শুনতে ব্যাকুল, ‘ভালোই বানাইছো, কুসুম!’
কিন্তু তিনি, আমাদের প্রিয় স্যার, তখনো সেই হ্যাট, রংবাহারি চেক শার্ট পরনে, চোখে চশমা, বলাকা সিনেমা হলের নিচতলায় প্যাসেজে স্থির দাঁড়িয়ে। কাটআউট বোর্ডের ছবিতে। শাওনই যে অরু, বুঝতে আমাদের একটু দেরি হয়ে যায়। অরুর শেষ সংলাপ যে শাওনেরই সংলাপ, নতুন করে উপলব্ধি হয়, ‘এভাবে তুমি চলে যেতে পারো না। আমাদের যে এখনো সাতটি গল্প বলা বাকি!’

কাহিনি: হুমায়ূন আহমেদ
চিত্রনাট্য ও পরিচালনা: মেহের আফরোজ শাওন
সংলাপ: লুৎফর রহমান
সুর ও সংগীত: এস আই টুটুল
আবহ সংগীত: ইমন সাহা
প্রযোজনা: ইমপ্রেস টেলিফিল্ম
অভিনয়ে: রিয়াজ, মাহি, ফেরদৌস, আজাদ আবুল কালাম, তানিয়া আহমেদ, মৌটুসী বিশ্বাস, কায়েস চৌধুরী, ওয়াহিদা মল্লিক জলি, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, পূজা চেরি
প্রিমিয়ার: ১৩ ফেব্রুয়ারি, বলাকা সিনেওয়ার্ল্ড
শুভমুক্তি: ২৬ ফেব্রুয়ারি, সারা দেশে

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0