৬ ডিসেম্বর তারেক মাসুদের জন্মদিন। প্রয়াত এই চলচ্চিত্রকারকে শ্রদ্ধা জানাতে আয়োজন করা হয়েছে ‘দ্বিতীয় তারেক মাসুদ মাস্টার্স ক্লাস’। পরিচালনা করবেন ক্লেয়ার ডেনি। কানে পাম দ’র জন্য মনোনীত এবং লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসবে ‘গোল্ডেন লেপার্ড’ জয় করেছিলেন ফরাসি এই নির্মাতা। আয়োজনটি নিয়ে লিখেছেন কামার আহমাদ সাইমন

default-image

ঢাকায় একটা সময় ছিল, যখন একটা উৎসব চললে সব চলচ্চিত্রপিপাসুদের পাওয়া যেত এক ঠিকানায়। আড্ডা আর চায়ের গুলতানিতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিস্তৃত হতো শিকড়, বৃত্তের বাইরেই বেশি বিস্তৃত হতো পরিধি। সবার মিলনমেলায় অদৃশ্য অনুলিখনে চলত এক অসম্পাদিত বাহাস। আমাদের প্রজন্মে সেটা গিয়ে বাধা পড়ল নির্দিষ্ট কিছু চত্বরে, মুক্তবাজারের দমকা হাওয়ায় কিছু দলছুট ছাড়া বাকি সব ইঁদুর-দৌড়, ভোঁ-দৌড় আর ট্রাফিক জ্যামে হলো বন্দী। অনেক দিন বাদে যখন তারেক মাসুদের মতো চলচ্চিত্রকার এলেন, সিনেমার বাজারমূল্যের চেয়ে সমাজবোধের প্রশ্ন আবার সামনে চলে আসে। আমাদের মতো কিছু তরুণ ছুটে গেলাম। আরও ছিলেন এ সময়ের সফল নির্মাতাদের থেকে শুরু করে নবীনতম স্বপ্নবাজ পর্যন্ত সবাই। বাক্যে, বিতণ্ডায় খুঁজেছিলাম নিজেদের অবস্থান, পরিচয়। হায়, তারেক মাসুদ চলে গেলেন।
সেই শূন্যতা থেকে ফিল্মি-বাহাসের অনুভব, তারেক মাসুদকে শ্রদ্ধা জানাতেই বিশ্ব সিনেমার শ্রেষ্ঠ নির্মাতাদের নিয়ে ‘তারেক মাসুদ মাস্টার্স ক্লাস’ আয়োজনের পরিকল্পনা করি।
কাব্যময় বাস্তবতার জন্য আন্তর্জাতিক উৎসব অঙ্গনে পরিচিত নাম ভিক্টর কসাকভস্কি। বার্লিন নিবাসী এই রুশ নির্মাতা ঢাকায় এসেছিলেন ‘তারেক মাসুদ মাস্টার্স ক্লাস’ আয়োজনের প্রথমটিতে। সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের ডিন নীলোৎপল মজুমদারের সঞ্চালনায় দিনব্যাপী ছিল ভিক্টরের ছবির প্রদর্শনী, তাঁর সঙ্গে আড্ডা আর আলোচনা। শতাধিক অংশগ্রহণকারীর সঙ্গে কেটেছিল অন্য রকম একটা দিন।
এবার ‘তারেক মাসুদ মাস্টার্স ক্লাস’ আয়োজন করা হচ্ছে ৮ ও ৯ ডিসেম্বর। আসছেন ফরাসি সিনেমার চ্যালেঞ্জিং নির্মাতা হিসেবে স্বীকৃত ক্লেয়ার ডেনি। দুদিনের আয়োজনে ডেনির ছবি আর তাঁর সঙ্গে টানা আড্ডা হবে ছায়ানট প্রাঙ্গণে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত।
অনেক দিন থেকে শুনছি আমাদের চলচ্চিত্র এগোচ্ছে, কিন্তু তার কোনো আলামত দেখতে পাচ্ছি না। চলচ্চিত্রশিল্পের নীতিমালাহীন ব্যবস্থাপনা, দূরদৃষ্টিশূন্য প্রযোজক-পরিবেশকের ক্ষুদ্র স্বার্থের দ্বন্দ্ব, ভারতীয় ছবির কাছে হারানো বাজার, আর মাল্টিপ্লেক্সে হলিউডি ছবির একচেটিয়া দোকানদারি অসম্ভবকে সম্ভব করার সার্কাসকেই উসকে দিচ্ছে। বাঁদর নাচের আদর এখানে সব সময়ই ছিল, কিন্তু সেটা বড়জোর দশ মিনিটের। রাতভর কবির লড়াই বা বাউল গানের জায়গা সেটা কখনোই নিতে পারেনি। ডিজিটাল প্রযুক্তিতে তামিল ছবির রিমেকের কী হাল হয়, তা এবার ঈদের ছবিতে দেখা গেছে। আবার লাতিন-ইরানিয়ান-কোরিয়ান ছবির অনুকরণ করলে সেটাও অনুকরণই হয়। বিপণন কৌশল আর মিডিয়ার উপর্যুপরি ব্যবহারে কৃত্রিম উত্তেজনা হয়তো তৈরি করা যায়, কিন্তু ইন্ডাস্ট্রি তাতে এক ইঞ্চিও এগোয় না, বরং আরও পিছিয়ে যায়।
তাহলে প্রশ্ন হলো, আমাদের চলচ্চিত্র এগোবে কীভাবে? আমি বলি এগোবে। এগোবে সেসব তরুণের হাতে, যারা কপালের অদৃশ্য পাট্টায় এখনো লিখে বেড়ায়, ‘মানি না!’ কারণ মানাটা তারুণ্যের স্বভাব না। বদলে দেব বলে শুধু চিৎকার দিলেই হবে না, তার জন্য ফর্মুলার বাইরে আসতে হবে, ভাঙতে হবে। কিন্তু ভাঙার আগে গড়াটাও জানতে হবে। কারণ আকাশের গভীরেই স্বপ্নের বাসা, গণ্ডির বাইরেই নতুনের চারণভূমি, বৃত্তের বাইরেই পরিধি অধিক বিস্তৃত।

বিজ্ঞাপন
বিনোদন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন