চেনা উত্তম, অচেনা উত্তম

বিজ্ঞাপন
default-image

সিনেমা দেখা ফ্রি! কে ছাড়ে সেই সুযোগ? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি কেবল। প্রথম বর্ষে লেখাপড়ার চাপ কম। টিএসসিতে কত কী হতো। যেন এ জায়গাটা ক্লাসের চেয়ে উত্তম। একদিন দেখলাম সেখানে চলচ্চিত্র উৎসব চলছে।

প্রথম দিনের ছবিটার কথা এখনো স্পষ্ট মনে আছে। ছবির নাম ‘সাড়ে ৭৪’। সে কী হাসাহাসির ব্যাপার পুরো ছবিতে। তুলসী চক্রবর্তী আর মলিনা দেবীর তো আছেই, নায়কও দারুণ, সাবলীল অভিনয়। সেদিনই তাঁর নামটা মনে গেঁথে নিয়েছিলাম, উত্তমকুমার। শুধু কি তা–ই? এক সপ্তাহের ভেতর তাঁর যতগুলো সিনেমা বাজারে পাওয়া গেল, সংগ্রহ করে ফেললাম।

দিনে দিনে উত্তমকুমারকে নানাভাবে অনুবাদ, আবিষ্কার করতে থাকি। দেখি, আমার মতো অগণিত বাঙালির মনে উত্তমকুমার নানা সময়ে নানাভাবে আবিষ্কৃত হন, চর্চিত হন। আমার আবিষ্কার হলো, সাদা-কালো থেকে রঙিন যুগ, অভিনয়ের ক্ষেত্রে ক্যামেরা নামের যন্ত্র কোনোটিকেই পাত্তা দেননি তিনি। এখনকার যেকোনো নায়কের চেয়ে চলায়-বলায় দারুণ স্মার্ট। তাঁর গড়ন আর অনাবিল হাসি কোটি কোটি বাঙালি নারীর মন কেড়ে নিয়েছিল। পুরুষেরও।

উত্তমের জন্ম ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর, কলকাতায়। ১৯৮০ সালের এ রকম এক শ্রাবণ মাসে তিনি মারা যান। সেদিন ২৪ জুলাই ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ ছবির শুটিংয়ের সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। তবে সেখানেই সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। এই মহানায়কের মৃত্যুর ৪০ বছর, এখনো ভক্তদের হৃদয়ের চিরসবুজ পথে হেঁটে চলেছেন বাঙালির এই প্রাণের নায়ক। আজ তাঁর ৪০তম প্রয়াণদিবসে জেনে নেওয়া যাক মহানায়ককে নিয়ে এমন কিছু কথা, যা হয়তো অনেকেরই অজানা।

default-image

ফ্লপ মাস্টার জেনারেল থেকে সুপারহিট

উত্তরকুমার চলে গেছেন চার দশক হলো। আজও কোথাও চলচ্চিত্র উৎসব করলে উত্তম সেখানে হাজির থাকেন। হোক সেটা কলকাতার নন্দন বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মিলনায়তন। এমনকি টিভি পর্দায়ও। এই যে সবখানে তাঁর অস্তিত্ব আজও রয়ে গেছে, এই অর্জন সহজে মুঠোয় ধরা দেয়নি তাঁর।

উত্তমের পারিবারিক নাম ছিল অরুণকুমার। ১৯৪৭ সালে হিন্দি চলচ্চিত্র ‘মায়াডোর’-এ অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। গুরুত্বপূর্ণ কোনো চরিত্র নয়, যাকে বলে ‘এক্সট্রা’। দৈনিক মজুরি পাঁচ সিকি। সেই ‘মায়াডোর’ মুক্তি পেল না। ১৯৪৮ সালে পেলেন আরেকটি সুযোগ, ‘দৃষ্টিদান’ ছবিতে নায়ক অসিতবরণের কম বয়সের চরিত্রে। তাতে কিছুই গেল এল না। পরের ছবি ‘কামনা’ ১৯৪৯ সালে মুক্তি পেল। কিচ্ছু হলো না। পরের দুই ছবি ‘মর্যাদা’ ও ‘ওরে যাত্রী’ও সাড়া ফেলতে পারল না। ধারাবাহিক ব্যর্থতায় দমে যাননি তরুণ অরুণ। হাতে তখনো ‘সহযাত্রী’ ও ‘নষ্টনীড়’ ছবি দুটি। মন-প্রাণ দিয়ে অভিনয় করলেন তিনি। ফল, আগের তিনটির মতোই। একের পর এক ছবি ফ্লপ করছে, তিনি কিন্তু সুযোগ পেয়েই যাচ্ছেন। এটা কোনো কথা! বিষয়টি ভালোভাবে নিলেন না অনেকেই। আড়ালে-আবডালে তাঁকে ফ্লপ মাস্টার জেনারেল বা ‘এফএমজি’ বলে ডাকতে শুরু করলেন তাঁরা। নামটা রটে গেলে সিনেমাপাড়ায়। শুধু তা–ই নয়, শোনা যায়, তখনকার পত্রিকায়ও ফ্লপ মাস্টার জেনারেল তকমায় ফিচার ছাপা হয়েছিল। এর মধ্যে সরোজ মুখোপাধ্যায়ের ‘মর্যাদা’ ছবিতে নায়ক হলেন অরুণ। তবে এবার পরিচালকের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নাম পাল্টে হলেন অরূপকুমার। তাতেও কাজ হলো না। ‘সহযাত্রী’ ছবিতে তাঁর সহশিল্পীদের মধ্যে ছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা পাহাড়ি সান্যাল। শুটিংয়ের ফাঁকে আড্ডায় পাহাড়ি সান্যাল হঠাৎ বলে বসলেন, ‘তুমি অরুণ বা অরূপ নও হে, তুমি যে উত্তম, উত্তমকুমার।’ তাঁর পরামর্শে নাম পাল্টে তিনি হয়ে গেলেন উত্তমকুমার। নাম বদলের পর প্রথম ছবি ‘সহযাত্রী’ও সফল হলো না। ১৯৫১ সালে ‘সঞ্জীবনী’ও ফ্লপ হলো। ‘বসু পরিবার’ ছবিতে তিনি ছিলেন পার্শ্বচরিত্রে। ছবিটি বেশ ভালো চলল, অভিনয়ের জন্য প্রথম প্রশংসিত হলেন উত্তম।

default-image

‘বড় আপু’রা তাঁর নায়িকা

সুচিত্রা সেনের সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয়ের আগ পর্যন্ত উত্তম ছয় বছরে নয়টি ছবিতে অভিনয় করেন। ছবিগুলোর নয় নায়িকার মধ্যে আটজনই বয়সে ছিলেন উত্তমের বড়। ছোট ছিলেন একমাত্র সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। মায়া মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে ছবি রায়, মনীষা দেবী, করবী গুপ্ত, ভারতী দেবী, সনিন্দা দেবী, সন্ধ্যা রানী ও মঞ্জু দে, আটজনকেই উত্তম ‘দিদি’ বলে ডাকতেন। অনেকেই মনে করেন, নিজের চেয়ে বড় নায়িকাদের সঙ্গে অভিনয় করায় উত্তমের ক্যারিয়ারটা অমন হয়ে গিয়েছিল।

টিউশনি, আরও কত কী করেছিলেন তিনি
অনেকেরই হয়তো জানা নেই, প্রথম জীবনে গানের টিউশনি করেছেন উত্তমকুমার। বাবা সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় আর মা চপলা দেবীর অনটনের সংসার। গিরিশ মুখোপাধ্যায় রোডের এক ঘরের সংসার তাঁদের। বাবার সামান্য বেতনে সংসার চলত না। উপায় না দেখে উপার্জনে নেমে পড়লেন বাড়ির বড় ছেলে অরুণ। পড়াশোনার পাশাপাশি গান শেখাতেন। অল্প দিনেই পেয়ে গেলেন লোভনীয় প্রস্তাব। গান শেখাতে হবে গাঙ্গুলী বাড়ির মেয়ে গৌরী দেবীকে। বেতনও ভালো। তখনকার দিনে মাসে ৭৫ টাকা!

জীবনে আরও অনেক কিছু করেছেন উত্তম। ‘বউঠাকুরানীর হাট’ ছবিটি তৈরি হওয়ার আগে যে উদ্যমে নিজের চেষ্টায় এমপি স্টুডিওর ভেতরে ঘোড়ায় চড়া শিখে পরিচালক নরেশ মিত্রকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন উত্তমকুমার। ঘোড়ায় চড়ার মতোই চলচ্চিত্রের প্রয়োজনে তিনি পিয়ানো বাজানো শিখেছিলেন। অসাধারণ হারমোনিয়াম বাজাতে পারতেন। গায়কের ভূমিকায় তাঁর অসামান্য অভিনয়ের স্বাক্ষর রয়েছে সুবীর মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘শাপমোচন’ ‘সুরের পরশে’, ‘দেয়া নেয়া’, ‘সোনার খাঁচা’সহ আরও বেশ কিছু ছবিতে।

default-image

‘অগ্নিপরীক্ষা’, পোস্টারের স্লোগান বিতর্ক

১৯৫৪ সালে মুক্তি পাওয়া উত্তম-সুচিত্রা জুটির ‘অগ্নিপরীক্ষা’ সুপার হিট হয়েছিল। তবে ছবির পোস্টারের স্লোগান নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সেখানে লেখা ছিল, ‘অগ্নিপরীক্ষা: চিরন্তন ভালোবাসার সাক্ষী’। শোনা যায়, এই পোস্টারের ক্যাপশনটি উত্তমকুমারের স্ত্রী গৌরী দেবী এবং সুচিত্রা সেনের স্বামী দিবানাথ সেন মোটেও ভালো চোখে নেননি। এমনকি এ পোস্টারটি উত্তম-সুচিত্রার প্রেম নিয়ে ছড়িয়ে থাকা নানা গুজবের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়।

শ্যামল মিত্র ছিলেন তাঁর ছবির প্রযোজক
১৯৮০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দেয়া নেয়া’ ছবিটি উত্তমকুমারের ক্যারিয়ারে অন্যতম হিট ছবি। এই ছবিতে উত্তম-তনুজা জুটি সবার মন কেড়েছিল। অনেকেই হয়তো জানেন না, ছবিটি প্রযোজনা করেছিলেন খ্যাতিমান গায়ক ও সুরকার শ্যামল মিত্র। প্রযোজক হিসেবে এটিই ছিল তাঁর প্রথম ছবি। এই ছবির সুরকারও ছিলেন শ্যামল মিত্র। ছবির পরিচালক ছিলেন সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়।

default-image

‘সপ্তপদী’ ষড়যন্ত্র 

১৯৬১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত ‘সপ্তপদী’ ছবিটি এখনো বহু সিনেমাপ্রেমীর মনে গেঁথে আছে। বিশেষ করে এই ছবিতে উত্তম–সুচিত্রা বাইকে করে গান গাইতে গাইতে যাওয়ার দৃশ্যটি চিরন্তন রোমান্টিক দৃশ্যে পরিণত হয়েছে। যেখানে এক ব্রাহ্মণ যুবকের সঙ্গে খ্রিষ্টান তরুণীর প্রেম। শোনা যায়, ষড়যন্ত্র করে এই ছবির শুটিং বন্ধ করার চেষ্টা হয়েছিল। অনেকেই নাকি সে সময় সুচিত্রাকে বলে বোঝানোর চেষ্টাও করেছিলেন, এই ছবিতে তিনি উত্তমের বিপরীতে অভিনয় করলে উত্তমকুমারের ছায়ায় তিনি ঢাকা পড়ে যাবেন। সেসবে কাজ হয়নি।

খলনায়ক উত্তমকুমার
শোনা যায়, সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘নায়ক’, ‘চিড়িয়াখানা’র মতো ছবিতে অভিনয় করার পর তাঁর ‘ঘরে-বাইরে’ ছবিতেও উত্তমকুমারকে সন্দীপের চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন পরিচালক। তবে তাঁর চরিত্রটি খলনায়কের চরিত্র হওয়ায় উত্তমকুমার এই ছবির প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। পরে এই চরিত্রে দেখা গিয়েছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে। অবশ্য বিমল মিত্রের উপন্যাস নিয়ে ‘স্ত্রী’ ছবিতে লম্পট অথচ সরলমনা জমিদারের চরিত্রে উত্তম দারুণভাবে মিশে গিয়েছিলেন। তিনি এখানে খলনায়ক হয়েও প্রধান ভূমিকায়। আর নায়কের ভূমিকায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

default-image

শুধু সুচিত্রা নয়

উত্তমের নাম এলে সুচিত্রাও চলে আসেন। যদিও শুধু সুচিত্রায় সীমিত ছিলেন না উত্তম। সুপ্রিয়া চৌধুরী, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, শর্মিলা ঠাকুর, মাধবী মুখোপাধ্যায়সহ জনপ্রিয় নায়িকাদের বিপরীতে অসংখ্য সফল চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছিলেন তিনি। শুধু রোমান্টিক নায়ক নন, ব্যতিক্রমী সব চরিত্রে অভিনয় করেছেন উত্তম, যা তাঁকে অভিনেতা হিসেবে সার্থক প্রমাণ করেছে। নিজেকে প্রতিবারই বদলেছেন উত্তম, বদলেছেন অভিনয়।

বদলে যেতে পছন্দ করতেন তিনি
তাঁকে রোমান্টিক মাস্টারও বলা হয়। শুধুই কি রোমান্টিক? ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ ছবিটা হয়তো অনেকের দেখা। নামভূমিকায় ছিলেন উত্তমকুমার। এখানে তাঁর বিপরীতে ছিলেন তনুজা। একজন কবির আবেগ, হতাশা, যন্ত্রণা, কবির লড়াইয়ে উত্তেজনা—সবই সার্থকভাবে তুলে ধরেছিলেন উত্তম। অন্যদিকে ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ ছবিতে উন্মত্ত এক যুবক তিনি। তাঁর বিপরীতে ছিলেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ অবলম্বনে নির্মিত সিনেমায় বাড়ির কাজের ছেলে রাইচরণের চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেন উত্তম। তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘বিচারক’ অবলম্বনে নির্মিত সিনেমায় নামভূমিকায় ছিলেন উত্তমকুমার। বিচারকের মনোজগতের দ্বন্দ্ব সার্থকভাবে পর্দায় তুলে ধরেন তিনি। সত্যজিৎ রায়ের ‘চিড়িয়াখানা’ ছবিতে গোয়েন্দা ব্যোমকেশ বক্সীর ভূমিকায়ও ছিলেন অসাধারণ।

মঞ্চে, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মাঝে উত্তমকুমার
সফল অভিনেতা হিসেবে উত্তরণের কালে বাংলা গ্রুপ থিয়েটারের যে অদলবদলের যুগ, সেটাকেও উত্তমকুমার নিজের মতো করে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। সিনেমার ব্যস্ততার পাশাপাশি মঞ্চেও অভিনয় করতেন। ‘শ্যামলী’ নাটকে দীর্ঘদিন অভিনয় করেছেন। উত্তমকুমার সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কল্যাণে পরিচালিত বিভিন্ন কর্মোদ্যোগে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

default-image

বরাবরই মনোযোগী ‘ছাত্র’

অভিনেতা উত্তমকুমার যখন সাহিত্যনির্ভর ছবিতে অভিনয় করতেন, তখন দর্শক একই সঙ্গে অভিনয় এবং সাহিত্যের রসাস্বাদনের স্বাদ পেতেন। এর হয়তো একটা বড় কারণ, সাহিত্যনির্ভর ছবি করার আগে সংশ্লিষ্ট সাহিত্যটির সঙ্গে উত্তমকুমার একাত্ম হয়ে যেতেন। সুপ্রিয়া দেবী এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘এত সিনসিয়ার মানুষ আমি দেখিনি। যা করত, গভীরে ঢুকে করত। গানের মাস্টার আসত তার। দেখতাম যতক্ষণ না গলার ভেতর গানটাকে নিতে পারছে, ততক্ষণ ছাড়ছে না। দেড়–দুই ঘণ্টা হয়ে গেছে, তবু ছাড়ছে না। “ছোটি সি মুলাকাত”-এর সময় নাচ শিখত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। টায়ার্ড হয়ে যাচ্ছে, ঘেমে যাচ্ছে, তবু থামছে না। আমি বললাম, এটা কী হচ্ছে, এবার থামো। বলল, না, বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে নাচতে হবে, আমায় পারফেক্ট হতেই হবে।’

সুপ্রিয়া দেবীরই স্মৃতিচারণায় জানা যায়, পড়ার প্রতি দারুণ আগ্রহ ছিল উত্তমকুমারের। শেকস্‌পিয়ার পড়তেন। প্রতি রোববার ইংরেজি ভাষা শিখতে যেতেন। ১৯৬৫ থেকে ৮০—এ কয়টা বছর নিয়মিত ইংরেজি রপ্ত করার চেষ্টা করে গেছেন। ভীষণ আক্ষেপ ছিল ইংরেজি মিডিয়ামে না পড়ায় ইংরেজি বলাটা রপ্ত হয়নি বলে। তাড়াতাড়ি জীবন–জীবিকায় ঢুকতে হয়েছিল বলে যথেষ্ট পড়তে পারেননি। এ নিয়ে খুব মন খারাপ করতেন উত্তম। আবৃত্তি করতেন, সংস্কৃত ছিল উত্তমকুমারের প্রিয় বিষয়। প্রতিদিন পুজোর সময় সংস্কৃত পড়তেন।

default-image

উত্তমের মৃত্যুর দুদিন পর ১৯৮০ সালের ২৬ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের দৈনিক ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকায় প্রকাশিত সত্যজিৎ রায়ের ‘অস্তমিত নক্ষত্র’ শিরোনামের একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সত্যজিৎ লিখেছেন, ‘এটা বলতে পারি যে উত্তমের সঙ্গে কাজ করে যে তৃপ্তি পেয়েছিলাম, তেমন তৃপ্তি আমার এই পঁচিশ বছরের ফিল্ম–জীবনে খুব বেশি পাইনি। উত্তম ছিল, যাকে বলে খাঁটি প্রফেশনাল। রোজকার সংলাপ সে সম্পূর্ণভাবে আয়ত্ত করে কাজে নামত। তার অভিনয়ক্ষমতা ছিল সহজাত। অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর দখল ছিল ষোলো আনা। ফলে স্বভাবতই তার অভিনয়ে একটা লালিত্য এসে পড়ত। রোজই দিনের শুরুতে সেদিনকার বিশেষ কাজগুলো সম্পর্কে একটা প্রাথমিক আলোচনার পর আমাকে নির্দেশ দিতে হতো সামান্যই। সবচেয়ে বড় কথা এই যে নিছক নির্দেশের বাইরেও সে মাঝেমধ্যে কিছু সূক্ষ্ম ডিটেল তার অভিনয়ে যোগ করত, যেগুলো সম্পূর্ণ তার নিজস্ব অবদান। এই অলংকরণ কখনোই বাড়াবাড়ির পর্যায়ে পড়ত না। এটা সব সময়ই হতো আমার পক্ষে একটা অপ্রত্যাশিত উপরি প্রাপ্তি। বড় অভিনেতার একটা বড় পরিচয় এখানেই। “নায়ক”-এর পর “চিড়িয়াখানা” ছবিতে উত্তমের সঙ্গে কাজ করেও একই তৃপ্তি পেয়েছি।’

default-image

প্রতিভা, পরিশ্রম, প্রচেষ্টা—এ তিন নিয়ে ‘ফ্লপ মাস্টার’ কিংবা টিউশনি করা এক তরুণ থেকে উত্তমকুমার সৃষ্টি করেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের নতুন যুগ। তিন দশক ধরে দর্শকদের মোহাবিষ্ট করে পৌঁছে গিয়েছিলেন অনন্য উচ্চতায়। ‘এক্সট্রা’ থেকে নায়ক উত্তম থেকে হয়ে গেলেন মহানায়ক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন