default-image

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় তারকা শাকিব খানের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান এস কে ফিল্মসের ব্যানারে নির্মিত পাসওয়ার্ড চলচ্চিত্রটি নানান কারণেই ঈদের আগে থেকে আলোচনায় ছিল। বিশ্বমানের চলচ্চিত্র, মৌলিক গল্প, নির্মাণে আধুনিকতা, টান টান থ্রিলার, এই প্রথম তুরস্কের মনোরম পরিবেশে চিত্রায়িত বাংলাদেশের সিনেমার গান, পাসওয়ার্ড মৌলিক সিনেমা নয় প্রমাণ করতে পারলে ১০ লাখ টাকা পুরস্কারের ঘোষণা, এমনকি নিজেকে ডক্টরেট ডিগ্রিধারী দাবি করে সুন্দরবনে ছেড়ে দিলেও বিশ্বমানের সিনেমা বানিয়ে আনতে পারবেন বলে শাকিব খানের আত্মবিশ্বাসময় ঘোষণা—সবই ছিল প্রচারণার সহযোগী। ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের মধ্যে সর্বাধিক প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা আর হাই রেন্টাল ফ্যাক্টর মিলিয়ে পাসওয়ার্ড ঘিরে পরিবেশক, প্রেক্ষাগৃহের মালিক আর দর্শকের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো।

পাসওয়ার্ড মূলত একটি ইংরেজি শব্দ। অনলাইনে বা ভার্চ্যুয়াল জগতে যেকোনো ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য নিরাপদে রাখতে বা অন্য ব্যবহারকারীর অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কিংবা সঠিক ব্যবহারকারীকে চিহ্নিত করতে পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা হয়। যখন অন্য কেউ আপনার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করতে আসে কিংবা বিনা অনুমতিতে আপনার ঘরে প্রবেশ করতে চায়, পাসওয়ার্ড নামক এই তালা আপনাকে বাঁচায় সম্ভাব্য আক্রমণকারী থেকে। তাই ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের স্বার্থে যার যার পাসওয়ার্ড তার তার কাছে রাখাই মঙ্গল। কিন্তু জগতে ভিক্টরের (মিশা সওদাগর) মতো লোভী ভিলেনও আছে, যারা অন্যের পাসওয়ার্ড জোর করে জানতে চায়। আর সেই পাসওয়ার্ড যদি হয় সুইস ব্যাংকের, তাহলে এর জন্য খুনোখুনি করতেও ভিক্টরদের বাধে না। ভিলেন ভিক্টর আলাউদ্দিন (শিবা সানু) নামে দেশের একজন মস্তবড় ধনকুবেরের সুইস ব্যাংকে জমা রাখা হাজার হাজার কোটি টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে নিয়ে আসতে চায়। সেই ব্যাংকের সব তথ্য জমা থাকে একটি পেনড্রাইভে। সাবানে পা পিছলে আছাড় খেয়ে আলাউদ্দিনের পেনড্রাইভ ঘটনাচক্রে চলে যায় রুশো (মামুনুন হাসান ইমন) নামের এক তরুণের কাছে। যার ভাই রুদ্র (শাকিব খান)। নিরপরাধ এই দুই তরুণ পেনড্রাইভ ফেরত দিতে গিয়ে দেখতে পায় আলাউদ্দিন প্রায় মারা যাচ্ছে। মৃত্যুর আগে রুদ্রকে সে নিজের পাসওয়ার্ড জানিয়ে দিয়ে তার সব টাকা সরকারকে দিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করে। ভিক্টরের দল এবার রুদ্র ও রুশোর পেছনে লাগে পাসওয়ার্ড উদ্ধারে। এক্সট্রিম ক্লোজআপ শটে ভিক্টরের ‘পেনড্রাইভটি আমার চাই-ই চাই’— আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশে ও চিৎকারে আমরা বুঝতে পারি এ মরণ খেলায় কেউ রেহাই পাবে না। তাই পাসওয়ার্ড ছবির নাম পেনড্রাইভ হলেও কোনো সমস্যা ছিল না।

পাসওয়ার্ড
অভিনয়: শাকিব খান, বুবলী, মিশা সওদাগর, অমিত হাসান, নাদের খান, ইমন, তনামি প্রমুখ।
কাহিনি ও চিত্রনাট্য: আবদুল্লাহ জহির বাবু
পরিচালনা: মালেক আফসারি

ভিক্টরের হাত থেকে রুদ্র-রুশোর বাড়িওয়ালার মেয়েও রেহাই পায় না। রুদ্র গুলি খায়। রুশো ভাইকে বাঁচাতে এক ডাক্তারের (শবনম বুবলী) অন্তঃসত্বা বোনকে অপহরণ করে। চিকিৎসক শবনম বুবলী তার বোনকে বাঁচাতে রুদ্রকে গোয়েন্দা পুলিশের ওসি কবির খানের (অমিত হাসান) দলকে ফাঁকি দিয়ে এবং একজন স্বাস্থ্যবান কর্মকর্তাকে পিটিয়ে হাসপাতাল থেকে বের করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে এবং সে চেষ্টায় সফলও হয়। নারায়ণগঞ্জে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেয় লঞ্চের ডেকে।

ছবির কাহিনি ও সংলাপ লিখেছেন অভিজ্ঞ চিত্রনাট্যকার আবদুল্লাহ জহির বাবু, চিত্রনাট্য সাজিয়েছেন পরিচালক মালেক আফসারী নিজেই। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ছবির ক্ষেত্রে নির্মাণের মান অবশ্যই আগের তুলনায় ভালো হয়েছে। চিত্রগ্রহণ, শব্দ, সংগীতায়োজন, অ্যাকশন দৃশ্যের বৈচিত্র্য—সব মিলিয়ে পাসওয়ার্ড চলচ্চিত্রে বিনোদন দেওয়ার চেষ্টার কমতি ছিল না। তবে গল্পের গাঁথুনিতে এবং নির্মাণশৈলীতে টান টান অনেক ব্যাপার ঘটলেও তাতে উত্তেজনা ছিল কম। দর্শক জানতেনই শেষ পরিণতি কী হবে। চরিত্রের জন্য কখনোই দুশ্চিন্তায় পড়ার মতো অবস্থার তৈরি হয়নি।

বাণিজ্যিক ছবির বিচারে অভিনয়ে অবশ্যই শাকিব খান, ইমন ও বুবলী ভালো করেছেন। মিশা সওদাগর ভিলেন চরিত্রে বিকারগ্রস্ততা ঢোকাতে গিয়ে মাঝেমধ্যেই কিছুটা কৌতুকেরও অবতারণা করেছেন। অমিত হাসান ও শিবা শানুর চরিত্র সময়ের দিক থেকে অনেকক্ষণ ধরে না থাকলেও গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপিত হয়েছে। আবহ সংগীতে ইমন সাহার কাজ গতানুগতিক। তবে গানের কোরিওগ্রাফি, লোকেশন, সেটের কাজ, পোশাক ও সংগীতায়োজন বেশ ভালো। ‘আগুন লাগাইল’, ‘পাগল মন’ এবং ‘ঈদ মোবারক’ গানগুলো দেখতে ও শুনতে ভালো। কোনাল, ইমরান, আকাশ সিং ভালো গেয়েছেন। তবে সিনেমায় গানের জন্য জায়গা করতে গিয়ে গল্প থেকে বেরিয়ে এর সাসপেন্স থ্রিলার ভেঙেচুরে হঠাৎ প্রেম দেখানোয় খানিকটা খাপছাড়া লাগে। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি ‘পাগল মন’ গানটার কথা। ভিলেন ভিক্টরের হাত থেকে বাঁচতে নারায়ণগঞ্জে এক পরিত্যক্ত লঞ্চের ডেকে আশ্রয় নেয় নায়ক রুদ্র ও নায়িকা ডাক্তার শবনম। নায়িকা সেই পরিত্যক্ত লঞ্চে পাওয়া ফাস্টএইড বক্স দিয়েই গুলিবিদ্ধ নায়কের গুলি বের করে, সেলাই করে সেবা–শুশ্রুষা দিয়ে সুস্থ করে তোলে। তারপর লঞ্চের ডেকে তরমুজ ভেঙে খায় দুজন। তরমুজের বিচি ডাক্তার শবনমের মুখ থেকে সরিয়ে চোখাচোখি হতেই দুজনের প্রেম হয়ে যায়! ‘পাগল মন’ গানটি আসে তার পরপরই। গানটি দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল তরমুজ না হয়ে কাঁঠাল হলেও কি ‘পাগল মন’ গানটি এই জায়গায় আসত? সিনেমায় নায়ক-নায়িকার মধ্যকার অনস্ক্রিন প্রেমের মুহূর্তটি নিয়ে আরেকটু যত্ন নিলে ভালো হতো। আর আইটেম গান হিসেবে ‘আগুন লাগাইলো’ যথেষ্ট সুনিপুণ এবং শ্রুতিমধুর। কিন্তু সিনেমার কাহিনির যে পর্যায়ে গানটি আসে তাতে কে, কাকে, কখন এবং কীভাবে আগুন লাগিয়েছে ভাবতে ভাবতেই গল্পের ঘোর কেটে যায়।

সিনেমায় শুরুর দিকে বারান্দা থেকে বাড়ির মালিকের চায়ের কাপে প্রস্রাব করার দৃশ্যটি শাকিব খানের সুপারস্টার ভাবমূর্তির সঙ্গে যায় না। ভবিষ্যতে এই ধরনের সাংস্কৃতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং অপ্রয়োজনীয় দৃশ্য শাকিব খান না করলেই দর্শক খুশি হবেন বলে আমার ধারণা। এই রকম ছোটখাটো অসামঞ্জস্য কাটিয়ে উঠতে পারলে দর্শকের মনে ছবিটি জায়গার পাশাপাশি দাগও কেটে নিতে পারত বলে আমি মনে করি।

বাণিজ্যিক দিক বিবেচনায় হয়তো ঠিকই আছে। কিন্তু এই সময়ে এত এত কনটেন্টের ভিড়ে অসামঞ্জস্যের কাহিনি না বুঝতে পারার মতো বোকা দর্শক আমাদের আর নেই। নব্বইয়ের দশকে অসংখ্য দর্শকনন্দিত চলচ্চিত্রের নির্মাতা মালেক আফসারী পাসওয়ার্ডকে বাণিজ্যিক মসলাদার ছবি হিসেবে উপস্থাপনের যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন সেটা বোঝা যায়। পাসওয়ার্ড ছবির কাহিনির মোড়ে মোড়ে ‘পেনড্রাইভ’জনিত একঘেয়েমি দূর হয়েছে সুন্দর গানে, ডি এইচ চুন্নুর অ্যাকশনে, শাকিব-বুবলীর সুন্দর কোরিওগ্রাফির নাচে কিংবা ছোট ছোট কৌতুকে। কলাকুশলী এবং প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে বাংলাদেশি সিনেমার এই ক্রান্তিকালে এই রকম ছবির দর্শকনন্দিত হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

হলের মালিক, কর্মচারী এবং ইন্ডাস্ট্রির অসংখ্য লোকের রুটি-রুজির ব্যবস্থা হয় সিনেমার বাজার চাঙা হলে। গল্পে কিছুটা গতানুগতিকতা থাকলেও নির্মাণে (বিশ্বমান কিনা জানি না) কারিগরি দিক থেকে ভালো করার প্রচেষ্টা সাধুবাদ পাওয়ার মতো।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0