সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়নাসির আলী মামুন/ফটোজিয়াম
প্রায় ছয় দশক ধরে অভিনয় করেছেন চলচ্চিত্র ও মঞ্চে। পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন, লিখেছেন। খ্যাতিমান আবৃত্তিকার ও শৌখিন চিত্রশিল্পীও। ২০১৩ সালের ১২ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর কলকাতার অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্যালারিতে হয়েছিল তাঁর প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী। প্রদর্শনী চলাকালে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়–এর মুখোমুখি হয়েছিলেন আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন। তাঁর প্রয়াণে আবার প্রকাশিত হলো সাক্ষাৎকারটি।

নাসির আলী মামুন: আপনি যদি অভিনেতা না হতেন, তাহলে কি আপনার পরিচয় প্রধানত চিত্রশিল্পী হতো?

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: কী করে বলি, জীবনের এই পড়ন্তবেলায় এখন যদি কেউ এমনটা জিজ্ঞেস করে, তাহলে তো বলব, আমি চিত্রশিল্পী নই। আসলে আমার পরিচয়টা কী হতে পারত, তা কি ভেবেটেবে দেখেছি? তা তো নয়!

default-image

নাসির আলী মামুন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন ছবি আঁকতেন, তখন অনেক শিল্প সমালোচক বলেছিলেন, তাঁর ছবি কোনো ব্যাকরণের মধ্যে পড়ে না। পরে তাঁর ছবি কেউ উপেক্ষা করতে পারেননি। আপনার ক্ষেত্রেও কি এমন হতে পারে?

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: এই ছবি আমি তো লোকেদের দেখানোর জন্য আঁকিনি। এটা আমার একেবারেই নিজস্ব জীবন। আমার কিছু শিল্পী বন্ধুবান্ধব আছে, তাদের সঙ্গে আমার মেলামেশা ছোটবেলা থেকেই। সেই ছোটবেলা থেকে আমার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছিল ছবি আঁকার। আমি যে বিশেষভাবে ড্রয়িং করতে শিখেছি, তা নয়। ইংরেজিতে যাকে বলে ডুডলস, হিজিবিজি আঁকিবুঁকি কাটতে কাটতে তার থেকে একটা আকৃতি আমার চোখের ওপর ভাসতে শুরু করে। সেগুলো আমি রূপ দেওয়ার চেষ্টা করি সব সময়।


এর মধ্যে আমার থিয়েটারের কাজের জন্য আমাকে অনেক সময় মঞ্চ পরিকল্পনা করতে হয়। অভিনয়ের জন্য মেকআপের পরিকল্পনা করতে হয়। সেই থেকে ওই আকার-আকৃতি তৈরি হতে থাকে। আমার ছবি ওইটুকুই, তার বেশি কিছু নয়।
রবীন্দ্রনাথের যে সমালোচনা হয়েছিল, সেটা নেহাত, কী বলব, আমাদের দেশে রক্ষণশীল মানসিকতা খানিকটা। রবীন্দ্রনাথের ভয়ানক বড় এই পদক্ষেপ কেউ বুঝতে পারেননি। আমি তো বলব, রবীন্দ্রনাথের ছবি আর গান—দুটো বস্তুতে তিনি কোনো দিন পুরোনো হবেন বলে মনে হয় না। তিনি কালোত্তীর্ণ একেবারেই।

default-image
বিজ্ঞাপন
default-image

নাসির আলী মামুন: কখনো মনে হয়েছে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব আপনার ছবিতে এসে গেছে?

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: ইনফ্লুয়েন্সটা আমার ভেতরে জড়িয়ে রয়েছে।

নাসির আলী মামুন: আমি দেখলাম, আপনার ছবি প্রদর্শনীতে বেশ কিছু বিখ্যাত মানুষের পোর্ট্রেট রয়েছে, যেমন রবীন্দ্রনাথ, শেকসপিয়ার, ভ্যান গঘ এবং আরও অনেকের। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের কোনো ছবি দেখলাম না। আপনার সঙ্গে তাঁর ঈর্ষণীয় সখ্য, তাঁর কি কোনো ছবি আঁকেননি?

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: প্রতিকৃতি...খেয়ালখুশিমতো তো করি। বই পড়ার সুবিধার জন্য বুকমার্ক হিসেবে শেকসপিয়ার, রবীন্দ্রনাথ ছোট লম্বা কাগজে এঁকেছিলাম, সেটাই এখানে প্রদর্শিত হচ্ছে। পরিকল্পনা করে সেভাবে কারও ছবি আমি আঁকিনি। সত্যজিৎ, আর কী বলব, তিনি তো আমার মাথার ওপর এখনো ছায়া দিয়ে যাচ্ছেন।

নাসির আলী মামুন: সমসাময়িক কালের ছবি আপনি দেখেন? কাদের কাজ ভালো লাগে?

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: বলা খুব কঠিন। পুরোনো অনেকের ছবি ভালো লাগে। আজকাল অনেক ছবি দেখা হয়ে ওঠে না। তাঁরা আধুনিক পেইন্টার। দেখছি তাঁদের ছবি, ভালো লাগে। বিশেষ কোনো নাম বলা আমার জন্য মুশকিল।

default-image

নাসির আলী মামুন: সত্যজিৎ রায় কি জানতেন আপনি ছবি আঁকেন?

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: তিনি জানতেন আমি আঁকিবুঁকি করি।

নাসির আলী মামুন: তাঁকে কোন ছবি দেখিয়েছিলেন?

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: এসব ছবি আমি কাউকে দেখাইনি। তিনি আমার চিত্রকর্ম দেখেননি। গত চার দশকে নিজের খেয়ালখুশিতে এঁকে এঁকে সব রেখে দিয়েছি। কী হবে জানতাম না। কেউ এসে দেখবে বা কাউকে দেখাব, প্রদর্শনী হবে—এটা মনে হয়নি।

বিজ্ঞাপন

নাসির আলী মামুন: আপনি তো সেলিব্রিটি। দর্শক অন্যের ছবি দেখবে এক ভাবে আর সৌমিত্রর ছবি দেখবে আরেক ভাবে।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: শুনুন, কোনো সৃষ্টিশীল কাজ উচ্চতায় না গেলে দর্শক গ্রহণ করে না, সে যে-ই হোক। আমি সৌমিত্র বলে আমাকে কেউ আলাদাভাবে দেখবে না।

নাসির আলী মামুন: ছবির মাধ্যম ও রং সম্পর্কে আপনার বিশেষ কোনো চাহিদা আছে?

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: যখন যা হাতের কাছে পেয়েছি, লাগিয়ে দিয়েছি। পছন্দের কোনো রং আমার নেই। রবিঠাকুরকে একবার এক বিদেশি ম্যাগাজিন অনেক প্রশ্ন করেছিল। একটা প্রশ্ন ছিল, কোন ফ্লাওয়ারটা তাঁর প্রিয়। তখন উনি বলেছিলেন, কোন ফ্লাওয়ারটা নয়, ফ্লাওয়ার মাত্রই আমার প্রিয়। সে রকম আমারও।

নাসির আলী মামুন: আপনার মুখে কম্পোজিশন তৈরি করেছেন পরিচালক। এখন আপনি কম্পোজিশন করছেন নিজের ছবি আঁকায়...

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: মাধ্যম দুটি কিন্তু সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। ফিল্ম ও ছবি আঁকা তো এক হতে পারে না। দুটোর কম্পোজিশনও ভিন্ন। ফিল্মে পরিচালকের নির্দেশে কাজ করতে হয়, আর ছবি আঁকায় একজন শিল্পী সম্পূর্ণ স্বাধীন। এখানে তিনি নিজেই পরিচালক।

নাসির আলী মামুন: বাংলাদেশে আপনার একটি ছবির প্রদর্শনী হওয়া দরকার। আপনার অনেক ভক্ত আছেন সেখানে।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: বাংলাদেশের মানুষ আমাকে ভালোবাসে, এটা আমার জন্য গৌরবের। আসলে নতুন অনেক কাজ হচ্ছে বাংলাদেশে। কলকাতার অতীত আছে, কিন্তু নতুন কাজ হচ্ছে আপনাদের ওখানেই। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে আপনারা বাঁচিয়ে রেখেছেন। আমন্ত্রণ করলে নিশ্চয় বাংলাদেশে আমার চিত্রকর্মের একটি প্রদর্শনী হতে পারে। বাংলাদেশে আমার বন্ধু, ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীদের শুভেচ্ছা জানাই।

মন্তব্য পড়ুন 0