default-image

সিনেমা তখন শেষ। টাইটেল কার্ড চলতে শুরু হয়েছে। হঠাৎ হই হই রই রই পড়ে গেল হলের ভেতর। এক মুহূর্তের জন্য দর্শক বিভ্রান্ত হলো। কোন দিকে দেখবে, বড় পর্দায়, না হলের ভেতর কী হচ্ছে। দেখা গেল, হুড়মুড় করে হলভর্তি দর্শক পর্দার কথা ভুলে এক জায়গায় জটলা পাকাচ্ছেন। চিৎকার, চেঁচামেচি। কী হয়েছে?

বড় পর্দায় যিনি কথা বলছেন, রক্তমাংসের সেই আরেফিন শুভ তো হলের ভেতরে। কথা বলছেন দর্শকদের সঙ্গে। দর্শক তাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন নায়কের সঙ্গে সেলফি তুলবেন বলে। আর একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে মজা দেখছেন এই আয়োজনের মূল কুশীলব ‘সাপলুডু’র পরিচালক গোলাম সোহরাব দোদুল। গতকাল শুক্রবার সকালে এই নায়ক, পরিচালক আর নায়িকা বিদ্যা সিনহা মিম বলাকায়ও ঘুরেছেন।

রাজধানীর বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে ৩ নম্বর হল। বিকেল পাঁচটার শো দেখার জন্য সোয়া চারটায় যখন টিকিট কাটছি, বক্স অফিস থেকে তখনই বলে দেওয়া হলো, সিট কর্নারে। আর টিকিট নেই। শুনে যতটা না দুঃখ পেলাম, তার চেয়ে বেশি খুশিই হলাম।

default-image


শুরু হলো সাপলুডু
শুরুতেই উৎসবের দিন গ্রামে আগুন। বনের ভেতর গাছের ডালে একটা গোখরো সাপ। জীবন বাঁচাতে দৌড়ে পালাচ্ছেন অক্সফোর্ড পড়ুয়া আলোকচিত্রী সাকলাইন মোর্শেদ ওরফে ইন্তেখাব দিনার। সব রহস্যের উত্তর তাঁর ক্যামেরার মেমোরি কার্ড। কিন্তু মেমোরি কার্ড কই? এ তো একটা আপেল। অন্যদিকে আরমান অর্থাৎ আরেফিন শুভ প্রথমেই দেখালেন ঢিশুম, ঢিশুম। নায়িকা মিম আর একটা ছোট্ট মেয়েকে বাঁচিয়ে নিয়ে এলেন গুন্ডাদের হাত থেকে। অন্যদিকে জাহিদ হাসানকে দেখা গেল আদিবাসীদের সঙ্গে পাহাড়ি গানে নাচছেন। জাহিদ হাসানের দীর্ঘ অভিনয় জীবনে এমন ‘এন্ট্রি’ বোধ হয় আর নেই।

default-image


জমতে না জমতেই কেটে গেল সুর
প্রথম দিকে দ্রুত একের পর এক ঘটনা ঘটেছে। এলাকার এমপি আহসানউল্লাহ তথা তারিক আনাম খানের ফোনে কিছুক্ষণ পর পর ফোন করেন মন্ত্রী। এর মধ্যে একদিন জাহিদ হাসানের জন্মদিন উদযাপন করা হয়। মূলত একটা জন্মদিনের রঙিন গান উপহার দেওয়া। আর সেই উপহার পছন্দ করেছেন দর্শক। সিনেমা শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যে তৃতীয় গানটিও শুরু হয়। হৃদয় খান আর পড়শীর গাওয়া এই গানের কোনো গুরুত্ব বা যৌক্তিকতা নেই এই ছবিতে।

উপমহাদেশের ছবি নাকি ‘গান ছাড়া চলেই না’। গান ব্যবসার অন্যতম উপাদান। সেই হিসেবে নায়ক আর নায়িকাকে নিয়ে একটা গান না থাকলেই নয়। এরপর অনেক লাশ। ১০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল উড়িয়েও দর্শককে যেন ঠিক আটকে রাখতে পারছিলেন না পরিচালক। এমন সময় এডিসি সিআইডি নজরুল ইসলাম রূপে হাজির হন সালাহউদ্দিন লাভলু। এসেই তিনি পরপর কয়েক দান ছক্কা হাঁকিয়ে একাই গল্প বেশ খানিকটা এগিয়ে নিয়ে যান।

default-image


কী হচ্ছে?
‘সাপলুডু’ একটা পলিটিক্যাল ক্রাইম থ্রিলার। আর এ ধরনের ছবিতে গল্পে টান টান উত্তেজনা থাকতেই হবে। আর পুরোটা থাকতে হবে এক টোনে। কিন্তু মাঝে মাঝেই কেটে গেছে সেই সুর। একের পর এক পর্দায় অতিথি চরিত্রে বিভিন্ন রূপে হাজির হন ছোট ও বড় পর্দার জনপ্রিয় সব মুখ। কিন্তু তাঁদের সবাইকে নিয়ে খেলতে পারেননি পরিচালক। এই যেমন, মৌসুমী হামিদের ভূমিকা কী? সালাহউদ্দিন লাভলু যখন কিছুতেই রহস্যের কোনো কিনারা করতে পারছিলেন না, তখন মৌসুমী হামিদ আকাশ থেকে টুপ করে পড়ে মেমোরি কার্ডের কথা মনে করিয়ে দেন।

মারজুক রাসেল বা শতাব্দী ওয়াদুদকে দেখে দর্শক হলের ভেতর আওয়াজ দিয়েছেন। কিন্তু দিন শেষে তাঁদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। মনে হয়, জোর করে তাঁদের দেখানোর জন্য এক একটা চরিত্র বের করে গল্পের ডালপালার সঙ্গে আলগাভাবে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন শতাব্দী ওয়াদুদ পাঞ্জা লড়তে লড়তে ঘুমিয়ে পড়েন। তারপর দেখা যায় আংটিতে রাখা সায়ানাইড খেয়ে মারা যান। কেন?

default-image


আলাদা করে বলতে হবে রুনা খানের কথা
এই ছবিতে বেশ কয়েকটা চরিত্র দেখা যায়। কিন্তু বাজিমাত করেছেন রুনা খান। কয়েক মিনিট পর্দায় ছিলেন। সেটুকুই দর্শক মনে রাখতে বাধ্য। তাঁর তাকানো, সংলাপ বলা—সবকিছু দিয়ে তিনি এই সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী নারী চরিত্র। হুমায়ূন সাধুকে তিনি বললেন, ‘দুই ইঞ্চি সাইজ হলেও চার ইঞ্চি চুমা’। সংলাপটি দর্শক পছন্দ করেছেন। তাই চিৎকার করে, শিস বাজিয়ে, তালি দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে রায় জানিয়ে দিয়েছেন। কে বলবে তিনিই ‘ছিটকিনি’র মায়মুনা, ‘হালদা’র জুঁই বা ‘গহীন বালুচর’ ছবির শামীমা ভাবি!

কে জিতল এই খেলায়?
পর্দায় মূল খেলাটা খেলেছেন জাহিদ হাসান। নাচতে না জানলে কী হবে, নাচানোতে যে তিনি দারুণ পারদর্শী। বিশেষ করে পারফরম্যান্সের সঙ্গে কণ্ঠের স্বর যেভাবে বদলিয়েছেন, সে জন্য তাঁকে বাহবা দিতেই হবে। অনেকেই বলেছেন, সালাহউদ্দিন লাভলুকে এই ছবিতে যুক্ত করার সিদ্ধান্তটি একেবারেই সঠিক ছিল। মূল খেলা দেখিয়েছেন এই দুজনই। আরেফিন শুভও তাঁর কাজটুকু ঠিকভাবে করেছেন। তাঁর সরল চরিত্রকে শরীরী ভাষায় ধারণ করতে পেরেছেন। বদলে যাওয়া শুভর শরীরী ভাষাও বদলে গেছে। সেটা চোখে পড়ে। কোথাও অতিরিক্ত মনে হয়নি। আর বিদ্যা সিনহা মিমের চরিত্র খুবই সাধারণ, সরলরৈখিক। সেখানে অভিনয় করে দেখানোর সুযোগ খুব কম ছিল। তাই তিনি কেমন অভিনয় করেছেন, সেই প্রশ্ন অনেকটাই অবান্তর।

default-image


‘সাপলুডু’ নামের রহস্য
সাপলুডু খেলায় যেমন মই আর সাপ আছে, এই ছবিতেও তাই। চরিত্ররা এই মই বেয়ে উঠল তো এই সাপে কাটল। শেষমেশ কে জিতল, তা জানতে সবাইকে শেষ পর্যন্ত দেখতে (পড়ুন খেলতে) হবে। ভালোই খেলেছেন পরিচালক। নাম খুঁজেই পাচ্ছিলেন না। জার্মান রসায়নবিদ ফ্রেডরিখ আগস্ট কেকুল যেমন স্বপ্নে বেনজীনের ষড়ভুজীয় কাঠামো দেখেছিলেন, এই পরিচালকের ক্ষেত্রেও নাকি তেমনই ঘটেছিল।

তখন এই সিনেমার কাজ চলছে। এক রাতে ঘুম আসছিল না তাঁর। ছবির কী নাম দেবেন, এই চিন্তা করছিলেন। ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়েন। আর স্বপ্নে দেখেন, একটা সাদা কাগজের ওপর লেখা, সাপলুডু। তারপর এই খেলার আদি ইতিহাস পড়তে গিয়ে দেখেন, চীনে নাকি শত্রুকে ঘায়েল করার জন্য সাপলুডুর মতো ছক আঁকা হতো। যেমনটি তিনি এই ছবিতে দেখিয়েছেন। ব্যস, পেয়ে যান নাম। ‘সাপলুডু’ এই ছবির নাম হিসেবে মান রেখেছে।

যা কিছু ভালো লাগেনি
কাহিনি অনেক জায়গায় খেই হারিয়েছে। মিম আর শুভর প্রেম কেন হলো, কখন হলো, কীভাবে হলো—এসব কিছুই বলা হয়নি। শুধু বলা হলো, প্রেমটা হলো। জোর করে যেন তাঁদের প্রেম হয়েছে। বোধ হয় ম্যাকাও পাখিকে যখন মিম ‘আই লাভ ইউ’ বলল, আর ম্যাকাও পাখির পক্ষ থেকে শুভ বলল, ‘আই লাভ ইউ টু’, তখন। আদ্যিকালের বাংলা ছবির মতো, নায়ক গুন্ডা, বদমাশদের পিটিয়ে নায়িকাকে বাঁচাবে, নায়িকার কাজ শুধু গান গাওয়া, নাচা—এখান থেকে বেরোতে পারেনি এই ছবি।

‘ময়না ধুম ধুম ধুম’ গানে নারীর মুখ দিয়ে বলা হয়, ‘শীত বুঝি না, বসন্ত বুঝি না, বুঝি সোনার গয়না’। সময় এসেছে, নারীর প্রতি এ ধরনের অবমাননাকর শব্দ, বাক্য থেকে বের হওয়ার। মৌসুমী হামিদকে প্রথম যেভাবে দেখানো হলো, সেটা একেবারেই অযথা, অযৌক্তিক। সিসিটিভির ফুটেজগুলো এত পরিষ্কার ও স্পষ্ট, সেটা আর যা-ই হোক, অন্তত বাংলাদেশের কোনো সিসিটিভি না। প্রতিটা খণ্ড খণ্ড গল্পকে পুরো গল্পের অপরিহার্য অংশ মনে হয়নি। অনেক বেহুদা চরিত্র আর ঘটনা আছে। অনেকটা টেনে জোর করে লম্বা করার মতো। যেগুলো না থাকলেও মূল গল্পের প্রবাহে তেমন কোনো আঁচড় লাগত না। চিত্রনাট্য আরও শক্তিশালী হতে পারত।

default-image


যে জন্য বাহবা পাবে ‘সাপলুডু’
পলিটিক্যাল থ্রিলার ধারার ছবি আমাদের দেশে হয়েছে খুব কম। আর চলচ্চিত্রও খুব ভালো অবস্থার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে না। এমন সময় এই ছবি খরার দিনে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে নেমেছে। ছবির মূল নায়ক গল্প। গল্প ভালোই ফেঁদেছেন। পুরোটা জানতে আপনাকে শেষ পর্যন্ত দেখতেই হবে। শেষ পর্যন্ত মানে একেবারে শেষ পর্যন্ত। একপাশে ক্রেডিট লাইন যাচ্ছে। অন্যপাশে তখনো চলছে সিনেমা। হলিউডে যাকে বলে ‘পোস্ট ক্রেডিট সিন’। মানে এর সিকুয়েলের একটা ‘ক্লু’ ধরিয়ে দেওয়া। আর সেখানেও একেবারে শেষে গিয়ে আপনার অজান্তেই মুখ ফুটে বেরিয়ে আসবে, ‘হোয়াট!’

default-image

লোকেশনকে ভালো নম্বর দিতেই হবে। পুরোটা বাংলাদেশে শুটিং করা হয়েছে। তিনটা গানই বড় আয়োজনের। এত স্টারকাস্ট জোগাড় করার জন্যও ‘সাপলুডু’র দলকে একটা ধন্যবাদ দিতে হবে। কালার গ্রেডিং কোথাও চোখে লাগেনি। সাসপেন্সে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানেও সাউন্ড সেই পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছে। কিছু কিছু সংলাপ দর্শক মনে রাখবে। সিনেমাটোগ্রাফিকেও ভালো নম্বর দিতে হবে।

থ্রিলার ছবিতে সবচেয়ে বেশি যা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা রক্ষা করতে পেরেছে এই ছবি। কে সাপ সেটি জানতে হলে একেবারে শেষ পর্যন্ত দেখতে হবে। সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে না। মোট কথা, পরিচালকের প্রথম ছবি হিসেবে এত বড় আয়োজন করে বানানো বৃথা যায়নি। প্রথম থেকেই এই ছবি গল্প, লুক, চরিত্র—সব দিক দিয়ে গোপনীয়তা রক্ষা করেছে। এই যুগে, এই দেশে সেটি সহজ কথা নয়। সব মিলিয়ে বিনোদনের জন্য ছবিটি দেখা যেতে পারে। ছবি শেষে দর্শক বিনোদিত হয়ে হল থেকে বের হবেন। টাকা জলে যাবে না।

বিজ্ঞাপন
বিনোদন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন