‘খবরদার! আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না, ওদের পুলিশের হাতে ছেড়ে দিন।’ বছরের পর বছর ঢাকাই চলচ্চিত্রে পুলিশের উপস্থিতি ছিল এমনই। মার খেতে খেতে ভিলেনের প্রাণ যায় যায় অবস্থা, তখন পুলিশের আগমন। এসব ভুলে যেতে বলছে নতুন ছবি ঢাকা অ্যাটাক। আগামীকাল ৬ অক্টোবর মুক্তি পাচ্ছে ঢাকা অ্যাটাক। সেখানে অন্য রকমের পুলিশ দেখবেন দর্শক। কি পুলিশ, কি জনগণ, কতটা অ্যাটাক? ছবি দেখার আগে সেসব জানার চেষ্টা করেছেন

default-image

একটা নতুন ছবির সাত সতেরো জানার তাগিদে মিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ের সামনে! শুনতে যেমন বেখাপ্পা লাগছে, তেমনি প্রতিবেদকের অভিজ্ঞতাও অভূতপূর্ব। সোমবার দুপুরে এখানেই এসে জানা গেল ঢাকা অ্যাটাক-এর বিস্তারিত।

ঢাকা অ্যাটাক কী, কেন—এসব হয়তো বেশির ভাগ মানুষের জানা হয়েছে। অন্তর্জাল দুনিয়ায় এটা নিয়ে যথেষ্ট আলাপ হচ্ছে। নির্মাতা, প্রযোজক এমনকি গল্পের কাহিনিকারও ছোটপর্দায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের অর্থাৎ ঢাকা অ্যাটাক-এর আপডেট জানাচ্ছেন ক্লান্তিহীনভাবে।

ছবির সামনের, পেছনের সবাই এখনো মুক্তি না পাওয়া ছবিটাকে দারুণ ভালোবেসে ফেলেছেন এই কদিনে। কবে থেকে এই ভালো বাসাবাসি শুরু? প্রশ্নটা ছিল যিনি গল্পের আবিষ্কারক, তাঁর প্রতি—সানী সানোয়ার। তিনি জানালেন, গল্পটি লেখার উৎসাহ দিয়েছে পরিচালক বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনের বন্ধু দীপংকর দীপন। দীপন মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে বসে নিত্যদিনের কার্যক্রম দেখে অবাক হয়, আরে এ তো অন্য রকম পুলিশ! পর্দায় এত দিন যে পুলিশকে দেখে আসছিল, বর্তমানে দেশে পুলিশের কার্যক্রম সেখানে নেই। অনেক পরিপাটি। এমনটা পর্দায় উপস্থাপন হয় না। বাস্তবতা দেখে দীপন অনুরোধ করল একটা গল্প লেখার। যেটা দিয়ে একটা সুন্দর সিনেমা হতে পারে। সেখান থেকে ভাবনার শুরু, লেখা হয়ে গেল পুলিশ বাহিনীর দৈনন্দিন জীবনের কিছু ক্লাইমেক্স নিয়ে একটি গল্প।

প্রথমে গল্পটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘থ্রিল পয়েন্ট’, যেটা পরে ঢাকা অ্যাটাক নামে দর্শক দেখতে পাবেন। দেড় বছর সময় নিয়ে ঢাকা, কলকাতার ১০ জন মিলে ভেবেছেন, কাজ করেছেন গল্পের বিন্যাস ও পাণ্ডুলিপি চূড়ান্ত করতে। ১২টি পাণ্ডুলিপি থেকে একটি চূড়ান্ত হয়েছে। যেখানে প্রতি ১০ মিনিট পরপর মূল গল্প ঠিক রেখে নতুন নতুন ঘটনা দেখবেন দর্শক। গল্পকার নিজেই যেহেতু পুলিশ, তাই গল্পে আকাশকুসুম বিষয় কিংবা অতিনাটকীয়তা কিছু থাকবে না। অপরাধীর এবং তদন্তকারীদের মধ্যে যে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিযোগিতা হয়, সেটা দেখা যাবে ছবিতে। এমনকি এখন পর্যন্ত ছবির মূল খলনায়ক কে, সেটা কোথাও বলা হয়নি। এসব থ্রিলের কারণে দর্শক শেষ পর্যন্ত চোখের ক্লান্তি ছাড়াই পর্দার সামনে বসে থাকবেন বলে দাবি করেন পরিচালক দীপংকর দীপন।

ছবিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন আরিফিন শুভ। ছোটপর্দায় ক্যারিয়ার শুরু করা শুভ ইতিমধ্যে বড় পর্দায় বেশ পরিচিতি পেয়েছেন। তাঁর আশা, ঢাকা অ্যাটাক তাঁর ক্যারিয়ারে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। ছবিটিতে তিনি গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি আবিদ) এবং বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। আপাতদৃষ্টিতে এই কেন্দ্রীয় চরিত্রটি গল্প এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হলেও পরিচালক একটু রহস্যের ইঙ্গিত দিলেন, ছবির শেষ দিকে এসে বোঝা যাবে আসলে গল্পের মূল হোতা কারা। হয়তো অন্য একাধিক চরিত্র তখন দর্শকের কাছে গুরুত্বের সঙ্গে জায়গা করে নেবে।

অভিনেতা আরিফিন শুভ বলেন, ‘পরিচালকের ফ্রেমে আমাকে দেখা গেলেও এ চরিত্রটির জন্য তৈরি হতে দারুণ সহযোগিতা করেছেন গল্পকার সানী। পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে হাঁটাচলা, মাঠে লড়াই করার সময় শরীরের ভাষা, অস্ত্র ধরাসহ যাবতীয় বিষয় শিখিয়েছেন তিনি।’ সানোয়ার বলেন, ‘তেমন কিছু নয়। শুধু আমার অভিজ্ঞতাটাই কাজে লাগিয়েছি।’

অভিনেত্রী মাহিয়া মাহি জানালেন, তাঁকে দেখা যাবে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক হিসেবে। সাংবাদিকতার পেশাদারি এবং তাঁদের সামর্থ্য ও ঝুঁকিগুলো এখানে নিখুঁতভাবে এসেছে। ছবিতে আরও অভিনয় করেছেন জ্যেষ্ঠ অভিনেতা হাসান ইমাম, আলমগীর, আফজাল হোসেন, এ বি এম সুমন, শতাব্দী ওয়াদুদ, নওশাবা, শিপন মিত্র প্রমুখ। এতে বাংলাদেশ পুলিশের সঙ্গে রয়েল মালয়েশিয়ান পুলিশের বিশেষ টিমকে যৌথভাবে কাজ করতে দেখা যাবে। ছবির কিছু অংশের শুটিং হয়েছে মালয়েশিয়ায়। গল্পের প্রয়োজনেই এই দুই নায়ক-নায়িকাসহ মালয়েশিয়ার একডজন শিল্পীকে নেওয়া হয়েছে। তাঁরাও দারুণ অভিনয় করেছেন বলে জানালেন পরিচালক দীপংকর।

প্রত্যয়ী পরিচালক বলেন, ‘দেশীয় সিনেমাকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যেতে লাখ-কোটি দর্শকের সংকল্পের যোগফলই হচ্ছে এই ঢাকা অ্যাটাক। ছবিটি নিয়ে আলাদা কিছু করতে চেয়েছি। শব্দ ও যান্ত্রিক দিকসহ প্রতিটি বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রেখেছি। এ ধরনের অ্যাকশন থ্রিলার বাংলাদেশে হয়নি। অ্যাকশন থ্রিলার ছবিতে স্মার্টনেস গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই মিউজিক, গ্রাফিকস, দৃশ্যায়নসহ সব বিষয়ে প্রাধান্য দিয়ে উপস্থাপনের প্রাণপণ চেষ্টা করছি। জোর দিয়ে বলতে পারি, দর্শক এই ছবিতে ভিন্ন কিছু পাবেন।’

পোস্টারে, ফেস্টুনে, ট্রেলারে ছবিটিকে বলা হচ্ছে পুলিশের অ্যাকশন থ্রিলার। পরিচালকও এমনটা বলছেন। জানতে ইচ্ছে হয়, ‘অ্যাকশন থ্রিলার’ কেন ব্যবহার করছেন পরিচালক? তা ছাড়া ছবির বেশ কিছু গানও শোনা যাচ্ছে, সমুদ্রের কাছে গিয়ে শিল্পীদের রোমান্টিক গানের সঙ্গে অভিনয় করতে দেখা গেছে। অ্যাকশন থ্রিলারের সঙ্গে কি গান সাংঘর্ষিক নয়?

প্রশ্নটা শুনে পরিচালক বলেন, সিনেমায় পুলিশ দেখানো আর পুলিশ-অ্যাকশন-থ্রিলার এক জিনিস নয়। এখানে একটা নির্দিষ্ট সময়ের একটা সংক্ষিপ্ত প্রেক্ষাপট দেখানো হয়েছে; যেখানে পুলিশ কী করে, তাদের পেশাগত এবং ব্যক্তিগত জীবনের কিছু পরিস্থিতি জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের ভেতর দিয়ে চলে এসেছে। ছবির গল্পে পুলিশের বিশেষ বাহিনীর কিছু ঝুঁকিপূর্ণ এবং বাস্তবভিত্তিক বিষয়কে চমকপ্রদ করে উপস্থাপন করা হয়েছে, তাই এটি চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিন্যাস অনুসারে অ্যাকশন থ্রিলার। আর যেহেতু অ্যাকশন ও থ্রিলের মধ্যে পুলিশই প্রাধান্য পেয়েছে, তাই পুলিশ-অ্যাকশন-থ্রিলার। অবশ্য ছবিটি তিন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ থাকছে—পুলিশ, সাংবাদিক ও জনগণ। আর গানটা এসেছে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে, অবশ্যই যৌক্তিকভাবে। সেটা চমক হিসেবেই থাক। আসলে ঢাকা অ্যাটাক-এ সবই মিলবে।

default-image

প্রসঙ্গক্রমে জেনে রাখা ভালো, প্রথম ছবি হলেও পরিচালক হিসেবে ছোটপর্দার জনপ্রিয় ও অভিজ্ঞ পরিচালক দীপংকর দীপন। প্রায় এক যুগ ধরে তিনি একক নাটক, টেলিছবি আর ধারাবাহিক নাটক নির্মাণ করে আসছেন। এর মধ্যে মেটামরফোসিস, ফেরারি এক দিন, টকিং কার, রুপার মুদ্রা, চার দেয়াল, মায়ের দোয়া পরিবহন, গ্র্যান্ড মাস্টার ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ২০০৭ সালে তাঁর সিনেমা প্রজেক্ট জননী নামে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ইউরোপিয়ান ছবির বাজারে নির্বাচিত হয়। সেই সুবাদে বলিউডের খ্যাতনামা পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপের সঙ্গে ৩ বছর কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি।

 ঢাকা অ্যাটাক প্রযোজনা করেছে স্প্ল্যাশ মাল্টিমিডিয়া, ঢাকা পুলিশ পরিবার কল্যাণ সমিতি লিমিটেড ও থ্রি-হুইলারস লিমিটেড। পরিচালক ও গল্পকারের দাবি, এটি শুধু পুলিশের নয়, গণমানুষের ছবি। তাঁরা বলছেন, দর্শক হিসেবে সিনেমা হলের ভেতর পর্দায় বাংলা ভাষায় যা দেখতে চাইতেন, সেটা বানানোর একটা প্রচেষ্টার নাম ঢাকা অ্যাটাক

জেনে রাখা ভালো, থানা কিংবা পুলিশ ফাঁড়িতে মিলবে না এটি। কাল থেকে ঢাকাসহ সারা দেশের ১১০টি হলে মিলবে ঢাকা অ্যাটাক। পর্যায়ক্রমে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাইসহ বিভিন্ন দেশের ২১টি শহরে বড় পর্দায় দেখা যাবে ছবিটি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0