বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

একসময় কলকাতার রাজনীতিসহ নানা পারিপার্শ্বিক কারণে ব্যবসায় ধাক্কা খেল বিশ্বাস পরিবার। তাঁরা বিডন স্ট্রিটের বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন মোহনবাগান লেনে। ১৯৩৮ সালের কথা। সে সময় ছবি বিশ্বাসকে মিনার্ভা থিয়েটারে ডেকে নিয়ে গেলেন নাট্য পরিচালক সতু সেন। কিছুদিনের মধ্যে নাট্যনিকেতন মঞ্চে ‘সমাজ’ নাটকে পেশাদার শিল্পী হিসেবে ছবি বিশ্বাসের আত্মপ্রকাশ। সে বছরের ডিসেম্বরে নাট্যকার মন্মথ রায়ের ‘মীরকাশেম’ করলেন। একে একে করেন ‘পথের দাবী’, ‘পরিণীতা’ ও ‘ভারতবর্ষ’।

default-image

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দুই পুরুষ’ নাটকে নুটুবিহারীর চরিত্র করে সাড়া ফেলে দেন ছবি বিশ্বাস। ‘দেবদাস’, ‘ধাত্রীপান্না’, ‘কাশীনাথ’, ‘চাঁদ সদাগর’, ‘চন্দ্রনাথ’, ‘গৈরিক পতাকা’, ‘বিজয়া’, ‘পরমারাধ্য শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ’, ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘ডাকবাংলো’সহ ৩৯টি নাটকে অভিনয় করেছিলেন তিনি।

এই সময় অভিনেতা ও পরিচালক তিনকড়ি চক্রবর্তীর সঙ্গে পরিচয়। সেখানে তাঁকে নিয়ে যান নামকরা পরিবেশক রিতেন অ্যান্ড কোম্পানির খগেন্দ্রলাল চট্টোপাধ্যায়। চলচ্চিত্রে যোগাযোগটা শুরুতেই শক্তভাবে হয়ে যায়। লম্বা, সুদর্শন ছবি বিশ্বাস চলচ্চিত্রজগতে প্রথম পা রাখলেন ১৯৩৬-এ বিশু চরিত্রে ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’ ছবিতে। একে একে ‘নদের নিমাই’, ‘হাত বাড়ালেই বন্ধু’, ‘সখের চোর’, ‘দেবী’, ‘শিউলিবাড়ি’, ‘রাজা সাজা’, ‘আম্রপালি’, ‘বিচারক’, ‘সপ্তপদী’, ‘নীলাচলে মহাপ্রভু’সহ প্রায় ২৫৬টি বাংলা ও ৩টি হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি।

গিরিশ-যুগের অভিনয়ের ধারাটি শিশির ভাদুড়ী বা অহীন্দ্র চৌধুরীর সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন ছবি বিশ্বাস। ‘দাদাঠাকুর’ থেকে ‘জলসাঘর’, ‘কাবুলিওয়ালা’ থেকে ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’—বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমার জগতে একের পর এক অমর সিনেমা ও চরিত্র উপহার দিয়েছেন তিনি।

default-image

সেই সাদাকালো যুগেও চলচ্চিত্রমাধ্যমে পোশাকে-চলনে-বলনে একটা পরিবর্তন এনেছিলেন তিনি। রহমতের আলখাল্লা থেকে বিশ্বম্ভরের বেনিয়ান, সাহেবি হ্যাট-কোট-স্যুট বা জোব্বা, নাইট গাউন তাঁকে মানিয়ে যেত। মানিয়ে যেত চুরুট। তাঁর বাচিক অভিনয় এমনই অনন্য ছিল যে নানা সময়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, আড্ডায় অনেকেই তাঁর কথা বলার ধরন মিমিক্রি করতেন। অবশ্য ছবি বিশ্বাসের এমন করে কথা বলার অন্য একটি কারণ ছিল। প্রচণ্ড অ্যাজমার সমস্যায় ভুগতেন। সে জন্যই একটু থেমে থেমে কথা বলতেন। আর এটাই যেন তাঁর ‘স্টাইল’ হয়ে যায়।

default-image

রাজকীয় অভিনেতা
মঞ্চ থেকে ছবি, ছবি থেকে আবার মঞ্চ—দাপটে অভিনয় চালিয়ে গেছেন ছবি বিশ্বাস। অভিনেতা হিসেবে যেমন, মানুষ হিসেবেও তেমনি ‘বড়’ মনের ছিলেন ছবি বিশ্বাস। অন্যদের অভিনয়ক্ষমতাকে সব সময় বড় করে দেখতেন। উত্তমকুমার তো তাঁর কাছে স্নেহের ‘বড়ো হনুমান’। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক সাক্ষাৎকারে জানা যায়, উত্তমকুমার বলেছিলেন, ‘ওঁর চোখের দিকে তাকিয়ে ডায়ালগ বলতে গেলেই সব ভুলে যাই। যেন বাজপাখির চোখ।’

‘আনন্দবাজার’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘অভিনয় শেখার জন্য যখন তাঁর কাছে সাহায্য চেয়েছি, দুহাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। বাইরের বহু লোকের ধারণা ছিল তিনি দাম্ভিক। কিন্তু এ কথা ঠিক নয়। হয়তো উনি কোনো ব্যাপারে সাহায্য করেছেন, তাঁকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলে তিনি খুব আন্তরিকভাবে জানাতেন, এখন শেখার বয়স, এখন শেখার সময়, শিখে নাও।’

default-image

অভিনেতা বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায় মনে করতেন, হলিউডের তারকার সঙ্গে তুলনীয় ছিলেন ছবি বিশ্বাস। যিনি অভিনয়ের একটি ইনস্টিটিউশন। আর সত্যজিৎ রায় ঠিক এমনটাই লিখেছিলেন, ‘ছবিবাবু না থাকলে “জলসাঘর”-এর চিত্ররূপ দেওয়া সম্ভব হতো কি না, জানি না। বোধ হয় না। একদিকে বিশ্বম্ভর রায়ের দম্ভ ও অবিমৃষ্যকারিতা, অন্যদিকে তাঁর পুত্রবাৎসল্য ও সঙ্গীতপ্রিয়তা এবং সব শেষে তাঁর পতনের ট্র্যাজেডি—একাধারে সবগুলির অভিব্যক্তি একমাত্র তাঁর পক্ষেই সম্ভব ছিল।’ অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় এক স্মৃতিচারণায় আক্ষেপ করেছিলেন, ‘ছবিদার মতো হাঁটা-চলা-কথা বলার এমন বুদ্ধিদীপ্ত অভিব্যক্তি আর তো পেলাম না।’

রান্নায় সিদ্ধহস্ত, খেতেন পান
বৈঠকি মেজাজের মানুষ ছিলেন। অতিথিপরায়ণ ছবি বিশ্বাসের বাড়ির আঙিনায় একটি গেস্টহাউস করেছিলেন। অবসরে বাগানবিলাসে মেতে থাকতেন। প্রায়ই দেখা যেত, ফুলের তোড়া সাজিয়ে উপহার দিতেন অতিথিকে। শোনা যায়, তাঁর বাগানে ৬০ রকমের জবা ও ৩০ রকমের গোলাপের গাছ ছিল।

পানের নেশা ছিল খুব। বাড়ি হোক বা শুটিং, রিহার্সাল—মুখে একটা পান থাকা চাই-ই চাই। সঙ্গে সব সময় থাকত একটি রুপার বাটি। ভেতরে সাজানো থাকত পান আর জর্দা। আলো জ্বললেই তিনি মুখ থেকে পান ফেলে অন্য মানুষ হয়ে যেতেন।
ছিল রান্নার শখ। ভোজনবিলাসী ছিলেন। মাংস থেকে ঝিঙে-পোস্ত, মাছ—অনেক পদের রান্নায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। টেবিল টেনিস খেলতেন ছবি বিশ্বাস। ক্রিকেটেও দারুণ আগ্রহ ছিল। জমিরুদ্দীন খানের কাছে গানের তালিম নিয়েছিলেন কিছুদিন। নানা ধরনের হাতের কাজেও পারদর্শী ছিলেন। মাটির বা প্লাস্টিকের নানা পাত্রে রং দিয়ে আঁকতেন। বুটিকের কাজ করার পাশাপাশি শাড়িতে এমব্রয়ডারির কাজও করতেন।

default-image

ব্যারিস্টারের চরিত্রগুলো কে করবেন
১৯৬২ সালের ১১ জুন। গাড়িতে স্ত্রী ও নাতিকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ছোট জাগুলিয়ায় যাচ্ছিলেন ছবি বিশ্বাস। হঠাৎই ড্রাইভারকে সরিয়ে নিজেই চালকের আসনে বসলেন ছবি বিশ্বাস। তরুণকাল থেকেই মানুষটা গাড়ি চালনায় সিদ্ধহস্ত। একটা মালবাহী গাড়ি এসে সোজা ধাক্কা মারল গাড়িতে। গাড়ির স্টিয়ারিং সজোরে লাগল ছবি বিশ্বাসের বুকে। সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল হৃৎস্পন্দন।

default-image

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর মৃত্যুর পর মন্তব্য করেছিলেন, ‘ছবিদা চলে গেলেন। এবার থেকে ব্যারিস্টারের চরিত্রগুলো কেটে মোক্তারের চরিত্র করতে হবে।’
সূত্র: উইকিপিডিয়া, আনন্দবাজার, চ্যানেল হিন্দুস্থান, ইউটিউব

বিনোদন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন