default-image

কিশোর কুমারের গুণের শেষ ছিল না। নিজের জীবনটাকে পুরোপুরি উপভোগ করে গেছেন তিনি। এমন সব নাটকীয় ঘটনার জন্ম দিয়েছেন, যা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে—জীবন সত্যিই এক রঙ্গমঞ্চ। তবে তাতে একক অভিনয় করছেন কিশোর কুমার।

‘হ্যালো, কিশোর কুমার আছেন?’
‘না। তিনি মুম্বাইতে নেই। তিনি এখন ব্যাঙ্গালোরে।’
‘মানে! তিনিই তো আমাদের কথা দিয়েছিলেন, এখানে থাকবেন। আমরা কলকাতা থেকে তাঁর সঙ্গেই দেখা করতে এসেছি!’
‘না, তিনি ব্যাঙ্গালোরে গেছেন। ১৫ দিন বাদে ফিরবেন।’

কলকাতা থেকে কিশোর কুমারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আসা গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় ফোন করে যাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁর নাম আবদুল। আবদুল কিশোর কুমারের ডান হাত। গানের চুক্তি হওয়ার সময় টাকাপয়সার ব্যাপারটা তিনিই দেখেন। ছেলেবেলায় কিশোর কুমারের হাতে টাকা আসত না। তাই কাজ শুরু করার পর টাকার প্রতি তাঁর এক ধরনের আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল। গান করার আগেই কড়ায়-গন্ডায় আদায় করে নিতেন সম্মানী। কেউ যদি অর্ধেক টাকা দিতেন, তবে অর্ধেক গান করে স্টুডিও থেকে বেরিয়ে আসতেন। শত অনুরোধেও ফিরতেন না। পুরো পেমেন্টই ছিল পুরো গান করার পূর্বশর্ত।

কিন্তু এত ব্যস্ততার মধ্যে কী করে কে টাকা দিল, কে দিল না, সেটা কী করে মনে রাখতেন কিশোর কুমার? আসলে তিনি মনে রাখতেন না। রাখতেন ওই আবদুল।

কে আগেভাগে টাকা দিয়েছে, তা বোঝার একটা ফন্দি বের করেছিলেন কিশোর কুমার। স্টুডিওতে যাওয়ার পর তৈরি হয়ে তিনি আবদুলের দিকে তাকাতেন। আবদুল তাঁর বুড়ো আঙুলটা তুলে ধরতেন। থামস আপ! এটাই ছিল সংকেত। আবদুল যদি পুরো আঙুল তুলে ধরতেন, তাহলে বোঝা যেত, পুরো সম্মানী শোধ করা হয়েছে। আঙুল অর্ধেক তুললে অর্ধেক টাকা আর অল্প একটু তুললে বোঝা যেত খুব কম টাকা দেওয়া হয়েছে। তখন দেখা যেত কিশোর কুমারের খেল। পুরো সম্মানী পাওয়া গানটা পুরোটাই করতেন তিনি। অর্ধেক সম্মানীর গানটির অর্ধেক করে চলে যেতেন স্টুডিও ছেড়ে। আর অল্প টাকা যেখানে পেয়েছেন, সেখানে গাইতেন শুধু মুখটা।

একবার এক ব্যক্তি অশোক কুমার অর্থাৎ কিশোর কুমারের দাদামণিকে ধরলেন, কিশোর যেন তাঁর জন্য একটা গান করে দেন। তখন কিশোরের ক্যারিয়ার রমরমা। শিডিউলই পাওয়া যায় না। কিন্তু অশোক কুমারের অনুরোধ ফেলতে পারতেন না কিশোর। ভদ্রলোক অশোক কুমারকে অনুরোধ করলেন, কিশোর যেন অর্ধেক সম্মানীতে কাজটা করে দেন।

default-image

নির্দিষ্ট দিনে কিশোর কুমার গেছেন গান গাইতে। আবদুল বুড়ো আঙুলটা অর্ধেক নামিয়ে নিলেন। ব্যস! যা বোঝার বুঝে নিলেন কিশোর। গানের অর্ধেকটা গেয়ে চলে যাওয়ার জন্য তৈরি হলেন। ভদ্রলোকের তো মাথায় হাত! ‘কী করেন, কী করেন, গানটা অর্ধেক হলো কেবল। পুরোটা গেয়ে যান!’
যেতে যেতে কিশোর বললেন, ‘বাকিটা গাইবেন দাদামণি।’

এমনই ছিলেন কিশোর কুমার।
শুরুর কথায় ফিরে যাই আবার।

পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কথা দিয়েছিলেন কিশোর, ‘প্রতিশোধ’ ছবির জন্য গাইবেন গান। সে কারণেই প্রযোজক রত্না চট্টোপাধ্যায় ও পরিবেশক প্রণব বসুও পুলকের সঙ্গে মুম্বাই এলেন। ছবিতে ছিল চারটি গান। একটি মান্না দের কণ্ঠে ‘কি বিষের ছোবল দিলি’, একটি ‘অরুন্ধুতী ‘ভায়ের কপালে দিলাম ফোঁটা’। বাকি দুটো কিশোর কুমারের কণ্ঠে ধারণ করা হবে। সে বিষয়েই কথা বলতে আসা। কিশোরের জন্য লেখা হয়েছিল ‘হয়তো আমাকে কারো মনে নেই’ আর ‘আজ মিলনতিথির পূর্ণিমা চাঁদ।’

কিশোর কুমারের বাড়ি থেকে আবদুল যখন বললেন, কিশোর কুমার ব্যাঙ্গালোরে গেছেন, তখন পুলকের মনে হলো, জনশ্রুতি আছে, কিশোর অনেক সময়ই ব্যাঙ্গালোরে যাওয়ার ভান করেন। এবারও ঘটনাটা সে রকম নয়তো!

হঠাৎ পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাথায় এল এক বুদ্ধি। তিনি রত্না চট্টোপাধ্যায়কে বললেন ফোন করতে। নারীকণ্ঠে যদি মন ভজে আবদুলের, সেই চেষ্টা। কাজে লাগল। আবদুলকে ডিনারে ডাকা হলো সেদিনই। ডিনারে আবদুলকে জানানো হলো, ডেট নিয়েই তো কলকাতা থেকে আসা, এর মধ্যে ব্যাঙ্গালোর এল কী করে? আবদুল বললেন, কিশোর কুমারের ব্যাঙ্গালোর আর লতা মঙ্গেশকরের কোলাপুর মুম্বাইতে যখন-তখন ঢুকে পড়েন। মানে হলো, কারও সঙ্গে দেখা করতে না চাইলে তাঁরা এভাবেই গা ঢাকা দেন।

এরপর আবদুল বলল, ‘ধরে নিন কিশোরদা ব্যাঙ্গালোর গেছেন। তবে ১৫ দিন না করে আমি তাঁর ফেরাটা দুদিনে করে দেব।’
কিশোর কুমার চকচকে কাগজের নোট পছন্দ করেন, এটা জানা ছিল পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। আবদুলও জানিয়েছিলেন অ্যাডভান্স নয়, গানের পুরো টাকা নিয়েই আসতে হবে কিশোর কুমারের কাছে। পরদিনই মুম্বাইয়ে সব ধরনের সোর্স কাজে লাগিয়ে চকচকে নোট জোগাড় করা হলো। কিশোরের বাড়ি গৌরীকুঞ্জে সে টাকা

নিয়ে গেলেন পুলক, রত্না আর প্রণব।

কিশোরের মুখোমুখি হয়ে পুলক বললেন, ‘কিশোরদা, ব্যাঙ্গালোর থেকে ফিরলেন কবে?’

কিশোরের দিকে চোখের ইশারা করে চলেছেন আবদুল। কিন্তু সেদিকে না তাকিয়ে কিশোর বললেন, ‘ব্যাঙ্গালোর? ব্যাঙ্গালোরে তো গিয়েছিলাম মাসখানেক আগে!’

তাঁর সামনে টাকা তুলে দেওয়া হলো। কিশোর কুমার গুনলেন না। শুধু নোটগুলো নাকের সামনে ধরে বললেন, ‘নতুন কারেন্সি নোটের গন্ধটা আমার কাছে এক্সিলেন্ট লাগে!’
টোকা:
১. যে রত্না চট্টোপাধ্যায়ের কথা বলা হচ্ছে, তাঁর অপরূপ চোখ দেখেই পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন ‘ওগো কাজলনয়না হরিণী’ গানটি। মন নিয়ে ছবিতে গানটি করেছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
২. মাকে কথা দিয়েছিলেন, তাই কিশোর কুমার ধূমপান ও মদ্যপান করেননি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0