default-image

চলচ্চিত্রব্যক্তিত্ব দিলীপ বিশ্বাস নেই এক যুগের বেশি সময় হয়ে গেল। তাঁকে দেখা যায় না কোনো আয়োজনে। কিন্তু কিছু কিছু মানুষের দেহান্তর মানেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া নয়, গুণী এই নির্মাতা সেই দলের অগ্রজন। তাঁকে নিকটজন, ভক্ত, শিষ্যরা বারবার স্মরণ করেন। ২০০৬ সালের ১২ জুলাই না–ফেরার দেশে চলে যান দিলীপ বিশ্বাস। আজ ১২ জুলাই তাঁর প্রয়াণ দিবসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনটা দেখা গেল।

default-image

বাবার সঙ্গে পুরোনো একটি ছবি শেয়ার করেছেন দিলীপ বিশ্বাসের ছেলে চলচ্চিত্রনির্মাতা ও উপস্থাপক দেবাশীষ বিশ্বাস। তাঁর মন্তব্য এমন, ‘আজ আমার অনেক নাম হয়েছে, কিন্তু আজও আমি গর্ববোধ করি “দেবাশীষ বিশ্বাস” হিসেবে নয়, “দীলিপ বিশ্বাস”–এর সন্তান হিসেবে।’ দেবাশীষ বলেন, ‘বাবা আর মায়ের ভালোবাসায় পূর্ণ ছিল আমার জীবন। কিন্তু আজ থেকে ১৩ বছর আগে আমি অর্ধেক হয়ে যাই। অর্ধেক হয়ে যায় আমার ভালোবাসাপ্রাপ্তি। কারণ, এই দিনে আমার বাবা পৃথিবীর মায়াকে পাশ কাটিয়ে না–ফেরার দেশে চলে যান! বাবা, কত দিন, কত দিন দেখি না তোমায়, শুধু মনে পড়ে স্মৃতি আর চোখ ভিজে যায়!’

default-image

দিলীপ বিশ্বাস ১৯৪২ সালের ৪ ডিসেম্বর পিরোজপুরের চাঁদকাঠি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। প্রখ্যাত এ নির্মাতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। একটা সময়ে ঢাকাই চলচ্চিত্র অঙ্গনে দিলীপ বিশ্বাস মানেই ছিল সোশ্যাল সিনেমার মাস্টার মেকার। বড় বাজেটে নামীদামি জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে জমজমাট নাটকীয় কাহিনির বাণিজ্যিক ঘরানার ছবি নির্মাণে নিজস্ব একটি ধারার সৃষ্টি করেছিলেন দিলীপ বিশ্বাস। চলচ্চিত্রের অমর এই কারিগরের সৃষ্টি ও তাঁর কীর্তি এখনো সবার কাছে অমলিন।

default-image

সফল এ নির্মাতা শুরু করেছিলেন একজন প্যারোডি গায়ক হিসেবে। এখানে পেয়েছিলেন অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা। ১৯৬৪ সালে বের হলো তাঁর গানের লং প্লে ডিস্ক। কিন্তু মন পড়ে ছিল চলচ্চিত্রে। সুযোগ এল। বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের হাত ধরে ‘বেহুলা’ চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকের মাধ্যমে সিনেমা জগতে ঘটল অনুপ্রবেশ। চলতে থাকল একের পর এক প্লেব্যাক। এরপর বহুসংখ্যক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে পান সুখ্যাতি। যার মধ্যে ‘হাবুর বিয়ে’, ‘দুই ভাই’, ‘মোমের আলো’, ‘সন্তান’, ‘চেনা অচেনা’, ‘আনোয়ারা’, ‘সমাধান’, ‘জোকার’, ‘এখনই’, ‘চাবুক’, ‘আদর্শ ছাপাখানা’, ‘বিনিময়’, ‘সুরুজ মিয়া’, ‘স্বীকৃতি’ ইত্যাদি।

default-image

প্রথম দিকে তিনি প্রধান সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন জহির রায়হান, মুস্তফা মাহমুদ, বাবুল চৌধুরী প্রমুখের সঙ্গে। একসময় পুরোপুরি নির্মাতা হিসেবে কাজ শুরু করেন। সালটা ১৯৭৬, মুক্তি পেল তাঁর পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘সমাধি’। প্রথম ছবিতেই বাজিমাত। ছবি সুপারডুপার হিট। এরপর একে একে নির্মাণ করেন ‘আসামী’, ‘জিঞ্জির’, ‘বন্ধু’, ‘অনুরোধ’, ‘আনারকলি’ ইত্যাদি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র; যার সব কটিই হিট অথবা সুপারহিট।

default-image

নিজের পরিচালিত ছবিগুলোর মধ্যে অধিকাংশের নামের আদ্যক্ষর ‘অ’ হওয়ায় ঢাকার চলচ্চিত্র অঙ্গনে তাঁকে নিয়ে আলোচনা, কৌতূহল ছিল সবার। ‘অ’ কে অনেকে অশুভ, অসফল ইত্যাদি মনে করলেও দিলীপ বিশ্বাস ‘অ’ কে শুভ এবং সাফল্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি, যেমন ‘অনুরোধ’, ‘অংশীদার’, ‘অস্বীকার’, ‘অজান্তে’, ‘অপমান’, ‘অকৃতজ্ঞ’ ইত্যাদি। এ প্রসঙ্গে তিনি সব সময়ই বলতেন, ‘চলচ্চিত্রের “অ” “আ”র বেশি শিখতে পারিনি, তাই এই নামগুলোর বাইরে যেতেও পারি না!’

একসময় তিনি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তাঁর নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা ‘গীতি চিত্রকথা’ থেকে তিনি পরিচালনা করেন ‘দাবী’, ‘অংশীদার’, ‘অপমান’, ‘অস্বীকার’, ‘অপেক্ষা’, ‘অকৃতজ্ঞ’, ‘অজান্তে’, ‘মায়ের মর্যাদা’। এখানেও তিনি ব্যবসাসফল ও দর্শকনন্দিত। এর মধ্যে ‘অপেক্ষা’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার হিসেবে এবং ‘অজান্তে’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা হিসেবে অর্জন করেন দুটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ২০০১ সালে পুত্র দেবাশীষ বিশ্বাসের পরিচালনায় ‘শ্বশুরবাড়ী জিন্দাবাদ’ ছবিটি প্রযোজনা করেছিলেন।

default-image

দিলীপ বিশ্বাস সিদ্ধান্ত নেন পশ্চিমবঙ্গে ছবি নির্মাণের। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন নির্মাণভাবনা, স্টাইল, লগ্নি আর ব্যবসার মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে তিনি নির্মাণ করেন ‘আমার মা’, ‘আমাদের সংসার’ এবং ‘অকৃতজ্ঞ’ নামের তিনটি ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র।

তাঁর সমকালীন শিল্পীরা প্রায়ই বলে থাকেন, শিল্পের বাইরে ব্যক্তিজীবনের দিলীপ বিশ্বাসও ছিলেন অনুসরণীয় একজন মানুষ। তাঁর বিনয় মুগ্ধ করত সবাইকে। তাঁর ভালোবাসার ক্ষমতা ছিল দুর্দান্ত। তিনি মানুষকে মূল্যায়ন করতে জানতেন। সে জন্য সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0