default-image

পদ্মার চরে আকাশ কালো হয়ে এসেছিল। ১৯৬০ সালের কথা। সত্যজিৎ রায় বানাচ্ছিলেন তথ্যচিত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তখনই তাঁর মনে হয়, এখানকার কালবৈশাখী নিয়ে একটা প্রামাণ্যচিত্র করা দরকার! যদিও সেটা হয়ে ওঠেনি। হয়ে ওঠেনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছবি বানানো। দাদা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর জন্মস্থান, এই ভূখণ্ড, জনপদ, বাংলা ভাষা নিয়ে তাঁর ছিল প্রবল আগ্রহ।

default-image

সত্যজিৎ রায়ের জন্মের ছয় বছর আগে মারা যান উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। আড়াই বছর বয়সে হারান বাবা সুকুমার রায়কে। মামাবাড়ি ছিল ঢাকার ওয়ারীর র‍্যাঙ্কিন স্ট্রিটে। ছোটবেলায় দু-তিন দিন সেখানে ছিলেন কিশোর সত্যজিৎ, সেবারই প্রথম ঢাকায় আসা। পরে এসেছিলেন ১৯৭২ সালে। তখন তিনি খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক, গুণী কথাসাহিত্যিক। বাংলাদেশ তখন স্বাধীন রাষ্ট্র। স্বাধীন দেশে সে বছর প্রথম পালিত হয় শহীদ দিবস। সত্যজিৎ রায়সহ ভারতের বেশ কজন শিল্পী, সাহিত্যিক, পরিচালক ঢাকায় এসেছিলেন। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের আমন্ত্রণে পল্টন ময়দানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন তিনি। বক্তব্যটি রেকর্ড করেছিলেন সম্প্রতি প্রয়াত নাট্যজন তবিবুল ইসলাম বাবু।

বিজ্ঞাপন

এ জাতি ভাষার জন্য জীবন দিয়েছিল বলে গর্ব করতেন সত্যজিৎ রায়। পল্টনে তিনি বলেছিলেন, ‘২০ বছর ধরে বাংলা ছবি করছি। বহুবার বহু জায়গা থেকে অনুরোধ এসেছে যেন বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা পরিত্যাগ করে অন্য দেশে, অন্য ভাষায় চিত্র রচনা করি। কিন্তু আমি সেই অনুরোধ বারবার প্রত্যাখ্যান করেছি। কারণ, আমি জানি, আমার রক্তে যে ভাষা বইছে, সে হলো বাংলা ভাষা। সেই ভাষাকে বাদ দিয়ে অন্য ভাষায় কিছু করতে গেলে আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাবে, আমি কূলকিনারা পাব না, শিল্পী হিসেবে মনের জোর হারাব।’

default-image

আগন্তুক ছবির সংলাপে মায়ের ভাষা বাংলা নিয়ে সেই অনুভূতির ছটা টের পাওয়া গিয়েছিল। তাঁর সিনেমা নিয়ে এই বঙ্গের মানুষের আগ্রহ স্পর্শ করেছিল সত্যজিৎকে। তখন দৈনিক সংবাদ-এ তাঁর সিনেমা নিয়ে খবর ও আলোচনা ছাপা হতো। খোলা ডাকে তাঁকে সেসব পাঠানো হতো কলকাতায়। ঢাকায় এসে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে সেটা স্মরণ করেছিলেন তিনি। সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে চিঠিতে যোগাযোগ হলে তাঁকে শুটিং দেখার আমন্ত্রণ করেছিলেন পরিচালক। জহুর যেদিন সশরীর দৈনিক সংবাদ নিয়ে হাজির হলেন, তখন চলছিল তিন কন্যার শুটিং।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পাংশের শুটিং চলছে। সেখানে নানা দিক থেকে আসা চিঠিতে পোস্টমাস্টারের সিলমোহর সাঁটার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করা হচ্ছে। শুটিংয়ের দৃশ্যের মধ্যেই সংবাদ পত্রিকাটি ছুড়ে দেওয়া হয় পোস্টমাস্টারের কাছে।

default-image

দৈনিক সংবাদ অংশ হয়ে গিয়েছিল সেদিনের শুটিংয়ের। গল্পটি জানা যায় আরেক সাংবাদিক সত্যজিৎ গবেষক আনোয়ার হোসেন পিন্টুর কাছে। তিনি আরও বলেন, ‘১৯৮৫ সালে সত্যজিতের গুপী গাইন বাঘা বাইন ছবিটা নিয়ে একটা দীর্ঘ আলোচনা লিখেছিলাম। কয়েক পর্বে সেটা ছাপা হয় সংবাদ–এ। সেটা পাঠানো হয়েছিল সত্যজিতের কাছে। তাঁর মৃত্যুর পর যখন কলকাতা যাই, দেখি তাঁর পড়ার ঘরে সেই পত্রিকাটি পড়ে আছে। সেখানে মার্কারে সত্যজিৎ রায় কিছু জায়গা দাগ দিয়ে রেখেছেন।’
সত্যজিৎ রায়ের ইচ্ছা ছিল সেলিনা হোসেনের হাঙর নদী গ্রেনেড উপন্যাস অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন। লেখককে চিঠি দিয়ে সে ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেনও। ঠিক সেই সময় কয়েকটি ঘটনার কারণে পরিকল্পনাটি আর বাস্তবায়িত হয়নি।

বিজ্ঞাপন

সত্যজিতের হাতে আর নির্মিত হয়নি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা। সে সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবার নিহত হওয়ায় মন ভেঙে যায় তাঁর। তারপর তিনি শুরু করেন শতরঞ্জ কি খিলাড়ি ছবির কাজ।
আনোয়ার হোসেন পিন্টু জানান, কথাসাহিত্যিক শাহেদ আলীর গল্প ‘জিবরাইলের ডানা’ নিয়েও ছবি বানাতে চেয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। সেন্সর বোর্ডের অনাপত্তি পাওয়া যাবে কি না ভেবে চিন্তাটি বাদ দিয়েছিলেন তিনি।

default-image

আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে সত্যজিৎ রায়ের এক পরম বন্ধু আলোকচিত্রী আমানুল হক। সত্যজিৎ যখন সিনেমা শুরু করেননি, তখন কলকাতায় তাঁর এক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে দুজনের পরিচয়। সেই থেকে পারিবারিক বন্ধুত্ব। সত্যজিৎ রায়ের যত আলোকচিত্র মানুষ দেখে, সেগুলোর বহু ছবি তাঁর তোলা।’ সত্যজিতের মৃত্যুর দিন পুলিশ ঘিরে রেখেছিল বাড়িটা। সেখানে নির্দেশনা দেওয়া ছিল কাউকে যেন ঢুকতে দেওয়া না হয়। কেবল হ্যাংলা-পাতলা একজন মানুষ আসবেন বাংলাদেশ থেকে, নাম আমানুল হক, শুধু যেন তাঁকেই ঢুকতে দেওয়া হয়।

বিনোদন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন