রবি ঘোষের চেহারায় কোনো আভিজাত্যের বা নায়কোচিত ছাপ না থাকলেও তাঁর সময়ের সব চলচ্চিত্র পরিচালকের প্রিয়পাত্র ছিলেন তিনি
রবি ঘোষের চেহারায় কোনো আভিজাত্যের বা নায়কোচিত ছাপ না থাকলেও তাঁর সময়ের সব চলচ্চিত্র পরিচালকের প্রিয়পাত্র ছিলেন তিনিকোলাজ: আমিনুল ইসলাম

‘এ আপনি কী বলছেন রাজামশাই? গুপীনাথের মাথায় তো রাজকন্যার চিন্তাই আসেনি। এ চিন্তা তো আমার, এ আমার অনেক দিনের সাধ, ছেলেবেলার সাধ।’
সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত সিনেমা ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর শেষ দিকের দৃশ্যে বাঘার সংলাপ এটি। বাঘার কথা শুনে রাজা বলেন, তার মেয়ে একটাই। সে দীর্ঘাঙ্গী। এবার বাঘার পাল্টা অনুযোগ, আমি কম কিসে? সঙ্গে সঙ্গে গুপী উচ্চতা তুলনা করে বলে, এই যে এতটুক!

‘বাঘা’ রবি ঘোষের চেহারায় কোনো আভিজাত্যের বা নায়কোচিত ছাপ না থাকলেও তাঁর সময়ের সব চলচ্চিত্র পরিচালকের পছন্দের, আস্থার মানুষ ছিলেন তিনি। উত্তম বা সৌমিত্রদের পাশে রবি ছিলেন নিজের আলোয় অনন্য। সাদাকালো যুগের চলচ্চিত্র ভুবনে তিনি নিয়ে এসেছিলেন এক অন্য রকম হাওয়া। বাংলা চলচ্চিত্রের উজ্জ্বল এ নক্ষত্র পর্দায় কখনো হয়েছেন ‘ধনঞ্জয়’, কখনো ‘শেখর’, কখনোবা ‘বাঘা’। চলচ্চিত্র ছাড়াও তিনি বাংলা নাট্যমঞ্চ এবং টেলিভিশনে অভিনয় করেছেন। আজ রবি ঘোষের প্রয়াণদিবস। ১৯৯৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তিনি মারা যান।

default-image

২৪ নভেম্বর ১৯৩১ সালে রবির জন্ম, কোচবিহারে মামাবাড়িতে। পুরো নাম রবীন্দ্রনাথ ঘোষ দস্তিদার। পূর্বপুরুষেরা ছিলেন বাংলাদেশের, বরিশালের।

বিজ্ঞাপন

নানা লেখায় জানা যায় ত্যজিৎ রায় পছন্দ করতেন রবি ঘোষের অভিনয়। ১৯৬৮ সালে সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ ছবিতে রবি ঘোষের অভিনয় চলচ্চিত্রজগতের একটি মাইলফলক। বাঘা চরিত্রে অভিনয় করে অভিনয়শিল্পকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যান তিনি। সত্যজিৎ বলতেন, ‘রবির চোখ দুটোই কথা বলে।’

default-image

সমকালীন অনেক অভিনেতার স্মৃতিচারণা, সাক্ষাৎকারে রবির নামটা এসেছে নানা সময়ে। প্রায় সবাই বলেছেন, রবির জন্মই যেন অভিনয়ের জন্য। রবি ঘোষ মানে একাই এক শ। স্বয়ং উত্তম কুমার বলেছিলেন, ‘রবির পাশে অভিনয় করতে সব সময় ভয় লাগে। আমরা হয়তো জাঁকিয়ে কিছু করার চেষ্টা করছি, আর রবি মাত্র কয়েক সেকেন্ড থেকে এমন একটা কিছু করবে যে, ও গোটা দৃশ্যটা টেনে নিয়ে বেরিয়ে যাবে, লোকে হেসে গড়িয়ে পড়বে।’

পরিচালক তপন সিনহা তাই বলেছিলেন, ‘সারা ভারতবর্ষে রবির মতো অসামান্য ক্ষমতাসম্পন্ন চরিত্রাভিনেতা বাস্তবিকই খুঁজে পাওয়া কঠিন। রবি ঘোষকে আমি সেই অর্থে কখনো কমেডিয়ান হিসেবে দেখিনি।’ অবশ্য রবি ঘোষও কমেডিয়ান বললে মন খারাপ করতেন। বলতেন, ‘কমেডিয়ান বলে আলাদা কোনো সংজ্ঞায় আমার বিশ্বাস নেই, আমি একজন চরিত্রাভিনেতা।’ তিনি মনে করতেন, যেকোনো চরিত্র ফুটিয়ে তোলাই একজন চরিত্রাভিনেতার কাজ।

স্কুলে পড়ার সময় থেকেই নাটকে অভিনয়ের হাতেখড়ি রবির। তারপর যখন কলেজে ভর্তি হলেন, তখন বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তুললেন ‘বন্ধুমন’ নামের একটি নাটকের দল। মহড়া করতেন আশুতোষ কলেজের ছাদে।

default-image

তাঁর জীবনী পড়ে জানা যায়, বাবা জীতেন্দ্রনাথ এসব একেবারেই পছন্দ করতেন না। প্রায়ই রবির মা জ্যোৎস্না রানীকে বলতেন, ‘অভিনয় কইরা সময় নষ্ট করে ক্যান? তোমার পোলারে কয়া দিও, ওই চেহারায় অভিনয় হয় না।’ শেষ পর্যন্ত রবি প্রমাণ করেছিলেন, ওই চেহারাতেও অভিনয় হয়। বাড়ি থেকে তাঁকে বের পর্যন্ত করে দেওয়া হয়েছিল। তবে মায়ের সমর্থন ছিল, তাই ফিরেছিলেন বাড়িতে, চালিয়ে গিয়েছিলেন নাট্যচর্চা। বাবার চাকরির সুবাদে সপরিবার তাঁরা থাকতেন কলকাতার মহিম হালদার স্ট্রিটে। পাঁচ ভাইবোনের দ্বিতীয় ছিলেন রবি। রবি একসময় হতে চেয়েছিলেন বডি বিল্ডার, হয়েছিলেনও।

default-image

কলকাতা পুলিশ-কোর্টে চাকরি শুরু করলেও পরে পুরোদস্তুর অভিনয়কেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। তাঁর অভিনয়জীবন শুরু পঞ্চাশের দশকে ‘সাংবাদিক’ নাটক দিয়ে। পরিচালক ছিলেন উৎপল দত্ত।

বিজ্ঞাপন

নাটকে রবি ঘোষের চরিত্র ছিল একজন সংবাদপত্র বিক্রেতার। মঞ্চের একদিক দিয়ে ঢুকে অন্য প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া ছিল তাঁর কাজ। একদিন নাটক দেখতে উপস্থিত হয়েছিলেন বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেন। পরে নিজের ছবির জন্য তিনি রবি ঘোষকে বেছে নেন।

default-image

রবির জীবনের মোড় ঘুরেছিল মূলত তপন সিনহার ‘গল্প হলেও সত্যি’তে অভিনয়ের পর। ছবিতে এক ভৃত্যের ভূমিকায় অভিনয় করলেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন মূল চরিত্র। তারপর একে একে ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘বসন্ত বিলাপ’, ‘কাপুরুষ ও মহাপুরুষ’ সিনেমাগুলোতে অভিনয় করে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন।

কমেডি চরিত্রে রবিকে প্রথম দেখা যায় সত্যজিৎ রায়ের ‘অভিযান’ ছবিতে। সেটাই তাঁর অভিনয়ের স্বাক্ষর হয়ে আছে। বসার ঘরে রাখতেন চার্লি চ্যাপলিনের ছবি। চলচ্চিত্রে বা মঞ্চে বেশির ভাগই কৌতুকনির্ভর চরিত্রে অভিনয় করতে হয়েছে রবি ঘোষকে। সিরিয়াস চরিত্রে তাঁকে তেমন দেখা যায়নি। ব্যতিক্রম বিজয় বসুর ‘বাঘিনী’। রবি ঘোষকে খল অভিনেতার চরিত্র দিয়েছিলেন বিজয়। চরিত্রটিকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন তিনি, সে ক্ষমতাও তাঁর সাবলীল।

এক সাক্ষাৎকারে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘রবি ঘোষ অত্যন্ত ডিসিপ্লিনড অভিনেতা, অনায়াসে চরিত্রের মধ্যে ঢুকে সেই মানুষটি হয়ে যান।’ ‘প্রথম দর্শনেই ওকে আমার ভালো লেগে গিয়েছিল। চেহারাটা সত্যিই চোখে পড়ার মতো ছিল। ব্যায়ামে মজবুত ওর চমৎকার শরীরে একটা লাবণ্য ছিল। মুখটা ছিল অত্যন্ত অভিব্যক্তিময়। আর চোখ দুটো এত উজ্জ্বল যে তা লোককে আকর্ষণ করবেই। ওর গলার আওয়াজটাও আমার প্রথম দিন থেকেই খুবই ভালো লেগেছিল। সব মিলিয়ে একটা জ্যান্ত মানুষ’, বলেছিলেন সমকালীন অভিনেতা সৌমিত্র।

default-image

এই উজ্জ্বল চোখের জ্যান্ত মানুষটি বাস্তব জীবনে ছিলেন ব্যতিক্রম। নেহাত গুরুগম্ভীর। ধর্মচর্চা করতেন। আর পড়তেন প্রবন্ধ-নাটকের নানা বই। শারীরিক বাস্তবতা (তুলনামূলক বেঁটে) অভিনয় জীবনে কখনো বাধা না দিলেও বাস্তব জীবনে দু–একবার মুশকিলে পড়েছিলেন।

default-image

বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হবে ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’। সত্যজিৎ রায়, তপন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে গেছেন রবি ঘোষও। শপিং করতে গিয়ে বেশ বিড়ম্বনায় পড়লেন তিনি। জার্মানদের জামা রবির গায়ে কিছুতেই আঁটছিল না। শেষে এক জার্মান নারী তাঁকে নিয়ে গেলেন শিশু কর্নারে। শেষে ছোটদের জামা গায়ে পরে বেরিয়ে এসেছিলেন রবি ঘোষ, চোখেমুখে মহা আনন্দ নিয়ে।

বিনোদন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন